কঠিন অসুখ নিয়ন্ত্রণে রাখবে যোগব্যায়াম, কয়েকটি নিয়ম মেনে চললেই বদলাবে জীবন

যোগাসন আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেই আদ্যিকাল থেকে। শরীর ঠিক রাখতে নানা ধরনের যোগাসন করতেন মুনি-ঋষিরা। পরবর্তীতে এর স্বাস্থ্য বজায় রাখার গুণাবলির জন্য সমস্ত পৃথিবীই একে গ্রহণ করেছে। বিজ্ঞান একে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছে, শরীরচর্চার একটি বিশেষ পদ্ধতি বলে চিহ্নিতও করেছে।

তবে বর্তমানে এই যোগাসনের গুরুত্ব বেড়েছে অনেকখানি। তার অন্যতম কারণ করোনা অতিমারী। পাটনার অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এইমস)-এর চিকিৎসক ড. অনিল কুমার জানিয়েছেন, কোভিড সংক্রমণে সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফুসফুস। স্বাভাবিকভাবেই ফুসফুসের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবথেকে বেশি। ফলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যায়। শরীরে অক্সিজেন গ্রহণ করে কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করার পরিমাণ কমে। অনিল কুমার জানান, যদি ঠিকঠাক চিকিৎসা না হয়ে থাকে, তবে যাদের হাঁফানি রয়েছে, ফুসফুসের অসুখ রয়েছে, ডায়াবেটিস রয়েছে এবং তাছাড়াও যাঁরা দীর্ঘ সময় ভেন্টিলেশনে ছিলেন করোনা-আক্রান্ত হয়ে– এঁদের প্রত্যেকে সারাজীবন শ্বাসজনিত সমস্যায় ভুগবেন।

তিনি আরও জানান, কোভিডে যারা ভুগেছেন সেসময়, প্রায় প্রত্যেকেরই ফুসফুসের ধমনিতে ব্লকেজ রয়েছে। ফলে রক্ত চলাচলের ব্যাঘাত ঘটছে ফুসফুসে। এছাড়া আরও হাজারও সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন তাঁরা। সম্ভাবনা রয়েছে।

আরও পড়ুন: ছোট্ট তুকেই সারতে পারে এইডস! দিশা দেখাচ্ছে নতুন আবিষ্কার

পদ্মভূষণ স্বামী নিরজানন্দ সরস্বতী বলেন, কোভিডের ফলে জনস্বাস্থ্য প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যই নয়, অতিমারীর কুপ্রভাব পড়েছে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরেও। পৃথিবীজুড়েই এই নিয়ে গবেষণা চলছে। আলাপ-আলোচনা চলছে। কীভাবে এই প্রভাব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব তা নিয়ে চিন্তিত সকলেই। কিন্তু যোগব্যায়াম এই অতিমারীতে অত্যন্ত কার্যকর, প্রমাণিত হয়েছে আবারও। কোভিড-পরবর্তী পরিস্থিতির মোকাবিলায় যোগ ব্যায়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। করোনাকালে সারা পৃথিবীর লোকেই শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য যোগব্যায়াম অভ্যাস করেছে। অবসাদের সঙ্গে লড়তে ব্যবহার করেছে যোগব্যায়াম। করোনায় আক্রান্ত মানুষের সাইকো-সোশ্যাল কেয়ার, অর্থাৎ মানসিক ও সামাজিক যত্ন নেওয়ায় যোগব্যায়ামের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুনরায় জীবনের মূল স্রোতে তাদের ফিরতে সাহায্য করছে এই অভ্যাস। ভয় এবং উদ্বেগ কাটানোর এত বড় ওষুধ আর কিছু নেই।

তিনি আরও বলেন যে, যোগের মূল মন্ত্র হলো, ভারসাম্য বজায় রাখা। যোগাভ্যাসে শরীরে ভারসাম্য তো আসেই, শরীর এবং মনের সম্পর্কও সুস্থ ও সাবলীল হয়, জগতের সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের সম্পর্কেও সুস্থিরতা আসে। যোগব্যায়ামে একাগ্রতা বাড়ে, সংযম ও ধৈর্য বাড়ে, বাড়ে সুশৃঙ্খলা, নিষ্ঠা এবং অধ্যাবসায়। বৃহত্তর সামাজিক ক্ষেত্র থেকে বিচার করলে যোগব্যায়াম জীবনকে সমৃদ্ধ করে।

১৯৬৩ সালেই স্বামী সত্যানন্দ সরস্বতী মুঙ্গেরে ‘বিহার যোগা স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই থেকে একইরকমভাবে যোগাভ্যাসকে মানবিকতার বিকাশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিজ্ঞান বলে প্রচার করে আসছেন তাঁরা। নিরজানন্দ সরস্বতী সত্যানন্দের সার্থক উত্তরসূরি। তিনি মনে করেন, যোগব্যায়াম মানুষের জীবনের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হওয়াটা খুব জরুরি। তিনি আরও জানান, যোগব্যায়ামে স্বাস্থ্য বজায় থাকে, ফলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। আবেগে নিয়ন্ত্রণ আসে, মন সুস্থির হয়। মনকে স্বচ্ছ রাখে এই অভ্যাস। আনন্দ, সাম্য, ধৈর্য, সৃষ্টিশীলতা এবং ইতিবাচক চিন্তাও বাড়িয়ে তোলে এই অভ্যাস। এই বিষয়ে একমত ড. অনিল কুমারও। তিনি জানান, অবসাদের হাত থেকে বাঁচতে, উদ্বেগ এড়াতে, করোনা-পরবর্তী নানারকম অসুবিধার হাত থেকে বাঁচতে যোগ, প্রাণায়াম, অনুলোম-বিলোমই শ্রেষ্ঠ উপায়। আর যাঁদের ফুসফুসের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের অবশ্যই যোগ করা উচিত।

প্রসঙ্গত, যোগের মূল তিনটি স্তম্ভ আসন, প্রাণায়াম এবং ধ্যান। এই তিনটিই মানসিক উদ্বেগ কাটাতে সাহায্য করে। এর অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণাগুণ প্রাকৃতিক মারণ কোষের (এন কে) সংখ্যা কমায়, সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন (সি আর পি) ও টি-সেল সাইটোকাইন (আই এল-১২, আই এল-৬)-এর মাত্রা কমায়, অপরদিকে অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি সাইটোকিন (আই এল-১০)-এর মাত্রা বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যোগের ফলে মেলাটোনিন, হরমোনের ভাইরাসরোধী ক্ষমতা, প্রদাহরোধী গুণ প্রভৃতি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবন থাকে। কোভিডের ফলে শুধু যে রোগীরাই প্রচণ্ড উদ্বেগে ভোগেন— এমন নয়, সঙ্গে রোগীর পরিবার এবং স্বাস্থ্যকর্মীরাও ভুগতে থাকেন চরম উদ্বেগে। কখন কী ঘটে, কে বলতে পারে! মানসিক চাপ শরীরের রোগ বা সংক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমায়, এবং প্রদাহসৃষ্টিকারী নানারকম অসুবিধা বাড়িয়ে তোলে, ফলে টিস্যু নষ্ট হওয়া থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে যেতে পারে।

করোনার ফলেও আই এল-৬, সি আর পি বা ফেরিটিনের মতো ইনফ্লেমেটরি মার্কার বেড়ে যায় শরীরে। যোগাভ্যাস মানসিক চাপমুক্ত করে, উদ্বেগ কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে উপসর্গহীন কোভিগ রোগীদেরও। আইসোলেশনে থাকার সময় এই যোগাভ্যাস অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়া স্বাস্থ্যকর্মীদের বার্নআউট সিনড্রোম কমাতেও যোগাভ্যাস বেশ উপকারী। উপসর্গযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও একে থেরাপি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। একদম অল্প থেকে মোটামুটি মাত্রায় আক্রান্ত অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম (এ আর ডি এস)-এর রোগী, যাঁরা কৃত্রিম অক্সিজেন নিতে বাধ্য হচ্ছেন হাইগ ফ্লো অক্সিজেন ক্যানিউলা বা নন-ইনভেসিভ মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে, তাঁদের ক্ষেত্রেও কার্যকর এই থেরাপি। নানা ধরনের আসন, প্রাণায়াম- এইসব রোগীদের শেখানো সম্ভব কম্পিউটার, মোবাইল বা ট্যাবলেটের পর্দাতেই। বর্তমানে কোভিড পেরিয়ে আসা রোগীদের ক্ষেত্রেও এই যোগাভ্যাস অত্যন্ত কার্যকর- অন্তত তেমনটাই জানাচ্ছে গবেষণা।

 

More Articles

;