শূকরের দেহে সংক্রামক জীবাণু, ভারতে আবার নতুন রোগের আশঙ্কা?
২৯ জুন কেরল সরকারকে সতর্ক করা হয়েছিল ত্রিসুরের আথিরাপিলির বনাঞ্চলে বেশ কয়েকটি বন্য শুকরের মৃতদেহে অ্যানথ্রাক্সের হদিশ পাওয়ার পর। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বীনা জর্জ বলেছেন, "বন্য শুয়োরগুলির মৃত্যুর পর পশুপালন দপ্তর ও বনদপ্তরের পক্ষ থেকে মৃত্যুর কারণ জানতে তদন্ত শুরু করা হয়।"

ফের হদিশ পাওয়া গেল নতুন এক রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার। দক্ষিণ ভারতের কেরলে কয়েকটি বন্য শুকরের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার পর সেগুলো পরীক্ষা করার জন্য পাঠানো হয়। কেরলের স্বাস্থ্য আধিকারিকরা ২৯ জুন নিশ্চিতভাবে জানিয়েছেন যে, মৃত শুকরগুলির দেহে স্পোর বা রেণু সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। এই ব্যাকটেরিয়ার ফলে অ্যানথ্রাক্স, গুরুতর সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়েছে শুয়োরগুলি এবং সেই কারণেই মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বীনা জর্জ বলেছেন যে, রোগের বিস্তার রুখতে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির তুলনায় দক্ষিণে সাধারণত অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত হওয়ার আধিক্য বেশি। তবে বিগত বছরেও অন্ধ্রপ্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীর, তামিলনাড়ু, অসম, উড়িষ্যা এবং কর্নাটকে একাধিক প্রাণীর আক্রান্ত হওয়ার রিপোর্ট সামনে এসেছে। কিন্তু এই অ্যানথ্রাক্সে পশু-ব্যতীত মানুষের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কতখানি তা জেনে নেওয়া যাক।
অ্যানথ্রাক্স কী?
অ্যানথ্রাক্স হলো একটি তীব্র ও গুরুতর সংক্রামক রোগ, যা ব্যাসিলাস অ্যান্থ্রাসিস নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়ে থাকে। সাধারণত মানুষের তুলনায় পশুদের মধ্যে বেশি এই রোগের সংক্রমণ দেখতে পাওয়া যায়। এই জীবাণু প্রতিকূল পরিবেশে রেণু হিসেবে সুপ্ত অবস্থায় শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকতে পারে। অনুকূল পরিবেশে রেণুগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং দ্রুত হারে বংশবৃদ্ধি করে।
অ্যানথ্রাক্স একটি গ্রিক শব্দ, যার অর্থ হলো কয়লা। এমন নামকরণের কারণ হলো অ্যানথ্রাক্স থেকে ত্বকে কালো দাগের সৃষ্টি হয়। এটি একটি জুনোটিক রোগ, যার অর্থ প্রাকৃতিকভাবে প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রামিত হয় এই রোগ। আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে এলে মানুষের মধ্যে এই রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে অ্যানথ্রাক্স মারাত্মক সংক্রামক রোগ নয়। মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার উদাহরণ থাকলেও তা অত্যন্ত বিরল।
অ্যানথ্রাক্স রোগের লক্ষণগুলি কী কী?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রতি বছর শীতের আগমন ঘটলেই দিল্লির বায়ু আরও দূষিত হয়ে যায়। প্রায় বাসের অযোগ্য হয়ে ওঠে দিল্লির বাতাস। প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয় পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশে চাষিদের ফসলের গোড়া পোড়ানো।
গবাদি পশু যেমন ছাগল, ভেড়ার ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষণ হলো ওই গোষ্ঠীর একটি বা দু'টি প্রাণীর আকস্মিক মৃত্যু। মৃত্যুর আগে তাদের দেহে উচ্চমাত্রায় জ্বর লক্ষ করা যায়। আকস্মিক মৃত্যুর পাশাপাশি মুখ, নাক, কান বা মলদ্বার থেকে রক্তাক্ত স্রাব, খোলা ভাব, রক্ত জমাট বাঁধতে অসুবিধার মতো নানা লক্ষণগুলি প্রকাশ পায়।
মানুষের মধ্যে এই রোগের ফলে ত্বকে ছোট ছোট ফোসকার সঙ্গে চুলকানি দেখা যায়। এছাড়াও কালো কেন্দ্রযুক্ত ত্বকের ঘা এবং তার চারপাশে ফুলে যাওয়া সম্ভাবনা থাকে। ইনহেলেশন অ্যানথ্রাক্সের কারণে জ্বর, ঠান্ডা লাগা, শ্বাসকষ্ট এবং বমি বমি ভাব লক্ষ করা যায়। এটি রোগের সবচেয়ে মারাত্মক রূপ এবং দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে এক্ষেত্রে। অন্যদিকে গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টিনাল অ্যানথ্রাক্সের ফলে বমি বমি ভাব এবং রক্ত বমি, ঘাড় ফুলে যাওয়া, পেটে ব্যাথা এবং ডায়ারিয়ার মতো লক্ষণগুলি প্রকাশ পায়।
প্রাণীরা কীভাবে অ্যানথ্রাক্স সংক্রামিত হয়?
গৃহপালিত এবং বন্য পশুরা শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বা মাটি থেকে খাদ্য গ্রহণের সময় এই ব্যাকটেরিয়ার রেণুগুলি শরীরে প্রবেশ করে। হোস্ট প্রাণীর দেহ থেকে মাটিতে সুপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকে এই রেণু। অন্য কোনও প্রাণীর দেহে প্রবেশের পর মাত্রাতিরিক্ত হারে বংশবিস্তার শুরু করে তারা। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে যে, মাছিদের মাধ্যমে এই রোগ মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তৃণভোজী প্রাণীরা মাটিতে থাকা ঘাস বা পাতার থেকে আক্রান্ত হলেও মাংসাশী প্রাণীরা আক্রান্ত প্রাণীর মাংস হাড়-খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলে সংক্রামিত হয়ে পড়ে।
মানুষ কীভাবে আক্রান্ত হয় এই রোগে?
মানুষের শরীরে আক্রান্ত প্রাণীর থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই জীবাণু প্রবেশ করে। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে, খাদ্য গ্রহণের সময় বা দূষিত জল পান করলে বা ত্বকের কোনও কাটা অংশের মধ্য দিয়ে এই রেণু প্রবেশ করে এবং ওই ব্যক্তি অ্যানথ্রাক্স সংক্রামিত হয়ে পড়েন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের বক্তব্য অনুসারে, রেনুগুলি শরীরে প্রবেশ করার পর সক্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যাতেও বৃদ্ধি পায় এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিষাক্ত পদার্থ তৈরি হয়, যা ব্যক্তিকে অসুস্থ করে তোলে।
কীভাবে চিকিৎসা করা হয়?
হু-এর মতে সংক্রমণের প্রথম দিকে অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপির ব্যবহারে যথেষ্ট সুফল পাওয়া যায় বলেই প্রমাণিত হয়েছে গবেষণায়। এক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার জন্য পেনিসিলিন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়ে আসছে। তাছাড়া সাম্প্রতিক কালে সিপ্রোফ্লক্সাসিন এবং ডক্সিসাইক্লিনও বিকল্প ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
প্রাণীদেহে রোগ প্রতিরোধ করতে গবাদি পশুকে টিকা দেওয়া যেতে পারে। এর ফলে রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারবে না। মানুষের জন্য ভ্যাকসিন থাকলেও তা খুবই দুষ্প্রাপ্য। সাধারণত ল্যাব কর্মী এবং প্রাণীর রক্ষণাবেক্ষণের কাজ যাঁরা করেন, তাঁদের এই জাতীয় ভ্যাকসিন দেওয়া হয়।
কেরলে কী ঘটেছে?
২৯ জুন কেরল সরকারকে সতর্ক করা হয়েছিল ত্রিসুরের আথিরাপিলির বনাঞ্চলে বেশ কয়েকটি বন্য শুকরের মৃতদেহে অ্যানথ্রাক্সের হদিশ পাওয়ার পর। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বীনা জর্জ বলেছেন, "বন্য শুয়োরগুলির মৃত্যুর পর পশুপালন দপ্তর ও বনদপ্তরের পক্ষ থেকে মৃত্যুর কারণ জানতে তদন্ত শুরু করা হয়। পরীক্ষার পরই অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণের কথা নিশ্চিভাবে জানা যায়। তবে কেরলের কর্মকর্তারা বলেছেন যে, পরিস্থিতি নিয়ে এখনই মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। গবাদি পশুদের জন্য টিকাদানের অভিযান শুরু হয়েছে। পাশাপাশি যাঁরা মৃতদেহ পরিচালনার কাজ করেছেন, তাঁদের চিকিৎসার ওপরেও নজরদারির কাজ চলছে। তাই মানুষের মধ্যে এই রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা এখনও পর্যন্ত খুবই কম।







