সিপিআইএম মানে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট, কার নামে এই রাস্তা! আসল ইতিহাসটাই ভুলল বাঙালি!

Debabrata Mondal
৪ মিনিট
সিপিআইএম মানে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট, কার নামে এই রাস্তা! আসল ইতিহাসটাই ভুলল বাঙালি!

পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর 'আমার বাংলা' রচনায় কল্লোলিনী তিলোত্তমাকে চিনে নিয়েছিলেন মোনা ঠাকুরের চোখ দিয়ে।কলকাতার সঙ্গে প্রথম মোলাকাতের পর মোনা ঠাকুরের কাছে কলকাতা হয়ে উঠেছিল 'আজব' শহর।কলের শহর কলকাতা।এখানে কল টিপলেই জল আবার কল টিপলেই আলো। ঘাড় গুঁজে অফিস যাওয়া আর বাড়ি ফেরার কলকাতা,দশটা পাঁচটার ব্যস্ত কলকাতা তার বুকে জমিয়ে রাখে হাজারো ইতিহাসের গপ্পো।দিবারাত্র অসংখ্য মানুষের ভিড়ে পদপিষ্ট হয় কল্লোলিনী তিলোত্তমার প্রকৃত ইতিহাস।আমরা কি তার হিসেব রাখি?

জানুয়ারির মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি। না এ বাজনা বাঙালির চিরাচরিত শারদোৎসবের নয়, এ বাজনা গণতন্ত্রের মহোৎসব ভোট উৎসবের। আর কিছুদিনের মধ্যেই নির্ধারিত হয়ে যাবে পুরোভোটের ফল। করোনাসুরকে থোড়ায় কেয়ার করে চলছে মিটিং মিছিল, ছুটছে কুকথার ফুলঝুরি।আর তাতেই গেল গেল রব তুলেছেন বাংলার নাগরিক সমাজ। লাল গেরুয়া অথবা সবুজ সবারই পাখির চোখ চন্দননগর, আসানসোল সহ আরো দুই কেন্দ্রের মসনদ। সবুজ নাকি গেরুয়া? কোন শিবির করবে কিস্তিমাত? নাকি হাল ফেরাতে লালকেই বেছে নেবেন আপামর জনসাধারণ তার উত্তর দেবে ভবিষ্যত।কিন্তু সুদীর্ঘ চৌত্রিশ বছর ধরে যে ৩১ নং আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে বসে বাম নেতারা রাজ্যের আট থেকে আশিকে দেখিয়েছেন দিনবদলের স্বপ্ন, ভোটের মুখে সেই আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের আড়ালে থাকা বিপ্লবী আলিমুদ্দিন সাহেবকে কি মনে রেখেছেন বাংলার ভাগ্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকা নেতা - নেত্রীরা? নাকি মসনদ দখলের লড়াইয়ের কাছে ফিকে হয়ে এসেছে ইতিহাসও?

সালটা ১৯০৫।রণক্লান্ত ভারতবাসী একটা নতুন দিন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে নতুনভাবে ইংরেজদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।ইংরেজ বিরোধী বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের সর্বত্র।সেই সময় ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের ফলে বহু নেতা পুলিশি ধরপাকড়ে জেলে বন্দি।ইংরেজ সরকারের নির্মম অত্যাচারের তালিকা থেকে বাদ যাননি দেশের সাধারণ মানুষও।ইংরেজ সরকার প্রতিমুহূর্তে বুঝিয়ে দিতে চাই তারা শাসক ভারতবাসী শাসিত।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাংলা থেকে বিশ্ব- ইতিহাসের ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা যা আজও ভুলতে পারেনি কেউ

পশ্চিমবঙ্গের গাইসাল ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে ফ্রান্সের সেন্ট-মিশেল-ডি-মরিয়ানের রেল দুর্ঘটনা, বিশ্বের ইতিহাসে এরকম রেল দুর্ঘটনার সংখ্যা নেহাত কম নয়।

এমনই এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে ১৯০৫ সালের ৬ই জুলাই কলকাতা প্রেস থেকে প্রকাশিত হলো একটি খবর - লর্ড কার্জনের চক্রান্তে ভাগ হতে চলেছে বাংলা।এই একটি খবরই তৎকালীন সময়ের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সমস্ত ভারতবাসীর ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালার জন্য যথেষ্ট ছিল।সুরেন্দ্রনাথ তাঁর ' দি বেঙ্গলি ' পত্রিকায় লিখলেন - " এটি একটি ভয়ঙ্কর জাতীয় দুর্যোগ।"রাস্তায় নামলেন রবীন্দ্রনাথের মতো ব্যক্তিত্ব। এমনই এক পরিস্থিতিতে বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ গড়ে তুললেন ' মুক্তিসংঘ ' নামক একটি গুপ্ত সমিতি। উল্লাসকর দত্ত,বারীন ঘোষ প্রমুখের সংস্পর্শে এসে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে উঠলেন হেমচন্দ্র।হেমচন্দ্র কর্তৃক স্থাপিত গুপ্ত সমিতি ' মুক্তিসংঘ ' ১৯০৮ সাল নাগাদ নন্দলাল ব্যানার্জীকে হত্যা করে।এমনকি বিনয় - বাদল দীনেশ কর্তৃক সংঘটিত অলিন্দ যুদ্ধেও এই মুক্তিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে ছিল।

পরবর্তী সময়ে গুপ্ত সমিতিটি 'বেঙ্গল ভলান্টিয়ারস' নামে পরিচিত হয়।হেমচন্দ্র উল্লাসকর দত্ত বারীন ঘোষ বা বিনয় বাদল দীনেশের আড়ালে বারংবার চাপা পড়ে যায় বিপ্লবী সৈয়দ আলিমুদ্দিন আহমেদের নাম। স্মৃতি বড়ো বিশ্বাসঘাতক - বাঙালি মনে রাখেনি সৈয়দ আলিমুদ্দিন আহমেদ ওরফে মাস্টার সাহেবকে।

সালটা ১৮৮৪। ঢাকার আকাশ জমাদার লেনে জন্ম সৈয়দ আলিমুদ্দিন আহমেদের।একরত্তি বয়স থেকে লড়াই ছিল আহমেদের রক্তে।প্রবল দারিদ্র্যকে জয় করতে একসময় বিরামহীন লড়াই করেছেন সংসার সীমান্তে।আহমেদ সাহেবের আর্থিক দৈন্যদশা একসময় এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যে আর্থিক সঙ্কটে এফ.এ পরীক্ষা দেওয়া হয়নি তাঁর।দিন গুজরানের জন্য এরপর তিনি শুরু করলেন টিউশন পড়ানো।জীবনের প্রতিটি বাঁকে এই নীরব লড়াই যেন ধীরে ধীরে তৈরি করে ফেলেছিল ভবিষ্যতের সৈনিককে।ততদিনে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ঢেউ সর্বত্র আছড়ে পড়েছে সমগ্র বঙ্গে।ইংরেজ সরকারের অত্যাচারের গ্রাফ তখন ঊর্ধ্বমুখী।অন্যদিকে একই সময়ে দু বেলা দু মুঠো অন্ন সংস্থান করা দায় হয়ে উঠেছে মাস্টার সাহেবের,বাধ্য হয়ে নিতে হয়েছে কালেক্টরের চাকরি।কিন্তু তিনি যে স্বাধীনতা যুগের অগ্নিপুরুষ, তাঁর পায়ের তলায় সর্ষে।ফলে জীবনের বাঁধাধরা ছকে কোনোদিনই অভ্যস্ত হতে পারেননি তিনি। আত্মগোপন করে চালিয়ে গিয়েছেন একের পর এক ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ।হেমচন্দ্র ঘোষ ছিলেন মাস্টার সাহেবের সতীর্থ।বস্তুতপক্ষে।কিছুদিনের মধ্যেই হেমচন্দ্র ঘোষ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত গুপ্ত সমিতিতে যোগদান করলেন মাস্টার সাহেব।তারপর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ফলে শীর্ষস্থানীয় নেতা - নেত্রীরা যখন পুলিশের জালে সেই সময়ই শাসকের লালচোখকে পরোয়া না করে অসংখ্য স্থানীয় যুবককে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করেন মাস্টার সাহেব। তিনি ছিলেন একজন অক্লান্ত কর্মী।

দিনের পর দিন আত্মগোপন করে ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার পরেও পুলিশ টিকি ছুঁতে পারেনি মাস্টার সাহেবের।সেই সময় অসংখ্য হিন্দু - মুসলিম যুবকের অবাধ বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল মাস্টার সাহেবের আখড়া।কুস্তি লাঠি এবং অসিচলনায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন মাস্টার সাহেবের ছাত্ররা। এমনকী গুপ্ত বিপ্লবী দলগুলিকে সাহায্য করতে আলিমুদ্দিন সাহেব প্রতিষ্ঠা করেন স্বদেশী ডাকাত দলও।

১৯২০ সালে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় প্রচারের আড়ালে থেকে যাওয়া এই অক্লান্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীর।পরবর্তীকালে তারই নাম অনুসারে কলকাতার একটি রাস্তার নামকরণ হয় আলিমুদ্দিন স্ট্রিট।যেখানে আজ অবস্থিত সিপিএমের রাজ্য সদর দপ্তর। রাজ্যে বেজেছে পুরভোটের দামামা।ভোটের বাজার সরগরম শাসক - বিরোধী তরজায়।আজকের সাধারণ মানুষ থেকে রাজনীতিবিদরা কি মনে রেখেছেন মাস্টার সাহেবদের? নাকি ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের কাছে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন মাস্টার সাহেবরা? ইতিহাস ভুলে বর্তমান প্রজন্ম কি ব্যস্ত ঝাঁ চকচকে প্রচার আর টুম্পার হাত ধরে ব্রিগেড ভরাতে? উত্তর অমিল। আসলে ভোট যে বড়ো বালাই।

লিখেছেন
Debabrata Mondal
Debabrata Mondal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।

রামলীলার সভার জন্য ক্ষতি হয়েছে ছোট দোকানদারদের, কতটা প্রচার, কতটা সত্যি?

loss claim for Ramlila rally: রামলীলা ময়দানের সমাবেশ ঘিরে ছোট দোকানদারদের ‘২.৫ লক্ষ দোকান বন্ধ’ ও ‘১০-১১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি’র দাবি আসলে, দিল্লির ব্যবসায়ী সংগঠন সিটিআই-এর অনুমান আসলে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের হিসাবের ভিত্তিতে করা হয়েছে। বিজেপি-কংগ্রেস পাল্টাপাল্টি অভিযোগে এই সংখ্যাগুলি এখন রাজনৈতিক হাতিয়ার।