যে ফুল হারিয়ে গিয়েছে বলেই মনে করা হয়েছিল, ১৫৮ বছর পর মিলল তার খোঁজ
Cyananthus hookeri: ১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী স্যার জোসেফ ডাল্টন হুকার সিকিম থেকে শেষবার এই ফুলটি সংগ্রহ করেছিলেন। তারপর দেড় শতাব্দীর বেশি সময় কেটে গিয়েছে, কিন্তু ভারতের কোথাও এই ফুলের আর কোনো নিশ্চিত খোঁজ মেলেনি। অবশেষে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো।
পাহাড়ি উপকথার মতোই এক বিস্ময়কর ঘটনা! যে ফুলকে বিজ্ঞানীরা একপ্রকার ধরেই নিয়েছিলেন ভারতের বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে, দীর্ঘ ১৫৮ বছর পর দেশের মাটিতেই আবার তার দেখা মিলল. নাম তার সায়ানান্থাস হুকারি (Cyananthus hookeri)। বরফ মোড়া হিমালয়ের রুক্ষ পরিবেশে ফুটে থাকা এই ছোট্ট নীল-বেগুনি ফুলটি যেন ভারতীয় উদ্ভিদবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক।
১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী স্যার জোসেফ ডাল্টন হুকার সিকিম থেকে শেষবার এই ফুলটি সংগ্রহ করেছিলেন। তারপর দেড় শতাব্দীর বেশি সময় কেটে গিয়েছে, কিন্তু ভারতের কোথাও এই ফুলের আর কোনো নিশ্চিত খোঁজ মেলেনি। অবশেষে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো।
কীভাবে খোঁজ মিলল এই হারিয়ে যাওয়া ফুলের?
২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বোটানিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার (BSI) তিন বিজ্ঞানী—ড. সুধাংশু শেখর দাশ, ড. শুভজিৎ লাহিড়ী এবং মোনালিসা দাস অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং জেলার চুনা ভ্যালিতে সমীক্ষা করতে গিয় মায়ো গ্রাম থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৬০০ মিটার উঁচুতে পাহাড়ি পাথুরে ও ঘাসের ঢালে আচমকাই তাঁদের চোখে পড়ে এই ছোট্ট ফুলটি।
হাওড়ার সেন্ট্রাল ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামে (CAL) নমুনা পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এটিই সেই হারিয়ে যাওয়া 'সায়ানান্থাস হুকারি'। সম্প্রতি ২০২৬ সালের জুন মাসে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের আন্তর্জাতিক কনজারভেশন জার্নাল ‘Oryx’-এ এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডু সহ গোটা দেশের বিজ্ঞানী মহল এই ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Great Green Wall: চড়া রোদে তপ্ত হয়ে ওঠা ধূসর মরুভূমির বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে কোটি কোটি গাছপালা, সবুজ ঘাস আর সতেজ জলাভূমি। প্রকৃতির আপন খেয়ালে তৈরি এই জীবন্ত মহাপ্রাচীরের নাম ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ বা সবুজ মহাপ্রাচীর। আফ্রিকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত, অর্থাৎ সেনেগালের আটলান্টিক মহাসাগরীয় উপকূল থেকে শুরু করে লোহিত সাগরের জিবুতি পর্যন্ত প্রায় আট হাজার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে চলছে মরুভূমিকে রুখে দেওয়ার এক অবিশ্বাস্য লড়াই।
কেমন দেখতে এই পাহাড়ি বিস্ময়?
হিমালয়ের তীব্র ঠান্ডা আর রুক্ষ পরিবেশে যেখানে সাধারণ গাছের বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব, সেখানে মাটির বুক ঘেঁষে জন্মায় এই গাছ। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এই উদ্ভিদটি Campanulaceae বা সাধারণ কথায় 'বেলফ্লাওয়ার' (ঘণ্টাফুল) পরিবারের অন্তর্গত। এই বিশেষ উদ্ভিদ পরিবারটি সাধারণত তাদের ঘণ্টার মতো দেখতে সুন্দর ফুলের জন্য পরিচিত। বিশ্বজুড়ে এই পরিবারের অধীনে থাকা 'সায়ানান্থাস' গণের (Genus) প্রায় ২০টি প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে ভারতে এখন পর্যন্ত ৯টি প্রজাতি বা ট্যাক্সার খোঁজ পাওয়া গিয়েছে।এটি আকারে ভীষণ ছোট এবং পাহাড়ি মাটিতে গুচ্ছ আকারে কুশানের মতো গোল হয়ে জন্মায়। এর কান্ড ও ডালপালা বেশ ঘন ও লোমশ প্রকৃতির হয়। পাতাগুলি দেখতে অনেকটা রম্বস বা ডিম্বাকৃতির এবং লোমযুক্ত হয়. গাছের ঠিক ডগায় ফোটে একটিমাত্র চমৎকার বেগুনি-নীল রঙের ফুল, যার ভিতরের দিকেও নরম ঘন লোমের মতো অংশ থাকে।
অরুণাচলের বুকে এমন একটি বিরল ফুলের খোঁজ পাওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দের খবর, যা পূর্ব হিমালয়ের অসাধারণ জীববৈচিত্র্যকে নতুন করে প্রমাণ করে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে এদের বর্তমান সংখ্যা।
সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, চুনা ভ্যালির ওই নির্দিষ্ট এলাকায় সব মিলিয়ে ৫০টিরও কম পূর্ণাঙ্গ গাছ বেঁচে আছে! কোনো কোনো জায়গায় মাত্র ৩ থেকে ৭টি গাছের ছোট ছোট গুচ্ছ দেখা গিয়েছে। ভারতে এদের সংখ্যা এতটাই কম এবং এদের আবাসস্থল এতটাই সীমিত যে, আন্তর্জাতিক নিয়ম (IUCN criteria) অনুযায়ী বিজ্ঞানীদের দল এটিকে জাতীয় স্তরে ‘Endangered’ বা বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে ঘোষণা করার সুপারিশ করেছেন। যদিও এটি প্রতিবেশী দেশ ভুটান, নেপাল এবং চীনের তিব্বত অঞ্চলেও পাওয়া যায়, তবে ভারতের বুকে এর উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত ও ঝুঁকিপূর্ণ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
East Kolkata Wetlands: আমাদের শরীরে কিডনি ঠিক যেরকম ভাবে শরীরকে সুস্থ রাখতে রক্ত থেকে সব নোংরা আর বর্জ্য ছেঁকে বের করে দেয়, সেরকম ভাবেই কলকাতার ক্ষেত্রে এই কাজটি করে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি। তাই পরিবেশবিদরা একে ভালবেসে ডাকেন ‘কলকাতার প্রাকৃতিক কিডনি’।
কেন এই ফুল এত বিরল?
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, সায়ানান্থাস হুকারি গাছটি একটি বিশেষ পরিবেশ ছাড়া একেবারেই বাঁচতে পারে না। হিমালয়ের উঁচুতে যেখানে অক্সিজেন কম, প্রচণ্ড কনকনে হাওয়া এবং গ্রীষ্মকাল খুব অল্প সময়ের জন্য আসে—এমন চরম আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়েই এরা বেঁচে থাকে।
এই গাছের বীজ প্রাকৃতিকভাবে অঙ্কুরোদ্গমের জন্য 'কোল্ড স্ট্র্যাটিফিকেশন' বা শীতকালীন তীব্র ঠান্ডার মধ্যে কয়েক মাস কেটে যাওয়া প্রয়োজন হয়। সাধারণত শরৎকালে এদের বীজ ছড়ায় এবং দীর্ঘ শীতের পর বসন্তে নতুন চারা জন্মায়। এই চরম পরিবেশের কারণে তাদের প্রাকৃতিকভাবে বংশবৃদ্ধির হার ভীষণ ধীর। এর উপর বৈশ্বিক উষ্ণতা বা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই গাছের বেঁচে থাকার অনুকূল পরিবেশ আরও উঁচুর দিকে সরে যাচ্ছে অথবা হারিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি মানুষের যাতায়াত ও রাস্তা তৈরির মতো নানা কারণেও এদের বাসস্থান আজ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। তাই এই বিরল ফুলটিকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের কথা বলেছেন।
১. স্থানীয় সুরক্ষা (In-situ Conservation): যে নির্দিষ্ট এলাকায় ফুলটি পাওয়া গিয়েছে, সেই এলাকাটিকে সুরক্ষিত অঞ্চল বা 'কমিউনিটি কনজারভেড এরিয়া' হিসেবে ঘোষণা করা. সেখানে যাতে অবাধ পর্যটন, রাস্তা তৈরি বা অতিরিক্ত পশুচারণ না হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখা।
২. বাইরে সংরক্ষণ (Ex-situ Conservation): ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য এই ফুলের বীজ সংগ্রহ করে ‘সীড ব্যাংক’ বা জিন ব্যাংকে জমা রাখা। পাশাপাশি ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে টিস্যু কালচার বা মাইক্রোপ্রোপাগেশনের মাধ্যমে এর বংশবৃদ্ধির চেষ্টা করা।
৩. গবেষণা ও জনসচেতনতা: অরুণাচল ও পূর্ব হিমালয়ের অন্যান্য দুর্গম অঞ্চলে আরও সুনির্দিষ্ট ফিল্ড সার্ভে চালানো। সেই সঙ্গে মায়ো গ্রামের বাসিন্দাদের এই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পর্কে সচেতন করা এবং সুরক্ষার কাজে তাঁদের সরাসরি যুক্ত করা।
দীর্ঘ ১৫৮ বছর পর ফিরে আসা প্রকৃতির এই সূক্ষ্ম সৃষ্টি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, হিমালয়ের বুনো পরিবেশকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখা আজ শুধু বিজ্ঞানীদের নয়, আমাদের সবার কাছেই এক নীরব ও জরুরি আবেদন।






