ডিলিমিটেশন বিল পাস হলে কেন দুর্বল হয়ে যেত রাজ্যসভা?
Delimitation Bill: ডিলিমিটেশন বিল পাস হলে কেন দুর্বল হয়ে যেত রাজ্যসভা? সংসদের ভারসাম্য এবং দেশের ফেডারেল কাঠামোর উপর এর প্রভাব কতটা বড় হতে পারত?
লোকসভায় ডিলিমিটেশন বিলের পরাজয়কে অনেকেই শুধু রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখছেন। এই বিলগুলি পাস হলে তার প্রভাব শুধু লোকসভায় সীমাবদ্ধ থাকত না, ভারতের সংসদীয় কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ রাজ্যসভার উপরও গভীর প্রভাব পড়ত। সেই কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই বিলগুলি ব্যর্থ হওয়া শুধু বিরোধীদের সাফল্য নয়, ভারতের ফেডারেল কাঠামোর জন্যও বড় স্বস্তি।
ভারতের সংসদে দু’টি কক্ষ রয়েছে—লোকসভা এবং রাজ্যসভা। লোকসভা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত। অন্যদিকে রাজ্যসভা মূলত রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব করে। এই কারণেই রাজ্যসভাকে 'কাউন্সিল অব স্টেটস' বলা হয়। দেশের বিভিন্ন রাজ্যের স্বার্থ, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে রাজ্যসভার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার যে ডিলিমিটেশন বিল এনেছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল লোকসভার আসন সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো। বর্তমানে লোকসভায় ৫৪৩ জন নির্বাচিত সদস্য রয়েছেন। নতুন প্রস্তাবে সেই সংখ্যা ৮১৫ থেকে ৮৫০-র কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। অথচ রাজ্যসভার সদস্যসংখ্যা অপরিবর্তিত থাকত। এর ফলে দুই কক্ষের মধ্যে ভারসাম্য ভেঙে যেত। এখন লোকসভা রাজ্যসভার তুলনায় প্রায় ২.২ গুণ বড়। নতুন ব্যবস্থায় তা বেড়ে ৩.৩ গুণ হয়ে যেত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Delimitation: দক্ষিণের রাজ্যগুলির লোকসভা আসন কি সত্যিই কমবে না? কেন্দ্রের এই আশ্বাস কি উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের আশঙ্কা কমাতে পারবে? ডিলিমিটেশন, জনসংখ্যা এবং আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে কেন বাড়ছে রাজনৈতিক বিতর্ক?
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ত সংসদের যৌথ অধিবেশনে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিল নিয়ে দুই কক্ষের মধ্যে মতবিরোধ হলে যৌথ অধিবেশন ডাকা হয়। সেখানে লোকসভা এবং রাজ্যসভার সদস্যরা একসঙ্গে ভোট দেন। কিন্তু লোকসভার সদস্যসংখ্যা এত বেশি বেড়ে গেলে রাজ্যসভার ভূমিকা কার্যত নগণ্য হয়ে যেত। তখন যে দল লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা খুব সহজেই যৌথ অধিবেশনে নিজেদের পক্ষে বিল পাশ করিয়ে নিতে পারত। ফলে রাজ্যসভা আর ভারসাম্য রক্ষার ভূমিকা পালন করতে পারত না।
গত কয়েক বছরে দেখা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকার বহু ক্ষেত্রেই রাজ্যসভার আপত্তি বা আলোচনাকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে। উদাহরণ হিসেবে Aadhaar Act, Prevention of Money Laundering Act Amendments বা আয়কর আইনের কিছু সংশোধনীকে মানি বিল হিসেবে আনা হয়েছিল, যাতে রাজ্যসভার সম্মতি প্রয়োজন না হয়। কারণ এই বিলের ক্ষেত্রে রাজ্যসভা শুধু সুপারিশ করতে পারে, বাধা দিতে পারে না। এই প্রবণতা আরও বাড়ত যদি লোকসভার ক্ষমতা সংখ্যার বিচারে এত বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হতো।
ডিলিমিটেশন বিতর্কে আরও একটি বড় প্রশ্ন হলো, কোন রাজ্য কত আসন পাবে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন হলে উত্তর ভারতের বড় রাজ্যগুলি, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ বা রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলি অনেক বেশি আসন পেত। অন্যদিকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি তুলনামূলকভাবে কম আসন পেত। ফলে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য উত্তর ভারতের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়ত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Delimitation: ডিলিমিটেশন ও আসন বৃদ্ধির প্রস্তাবে কেন বাড়ছে উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের আশঙ্কা? মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোই কি আসল লক্ষ্য, নাকি এর আড়ালে রয়েছে বড় রাজনৈতিক হিসাব?
এই পরিস্থিতিতে রাজ্যসভার গুরুত্ব আরও বেশি হওয়ার কথা ছিল, কারণ সেটাই ছোট বা কম জনসংখ্যার রাজ্যগুলির কণ্ঠস্বর রক্ষা করে। কিন্তু লোকসভাকে অনেক বড় করে দিলে এবং রাজ্যসভাকে একই জায়গায় রেখে দিলে সেই কণ্ঠস্বর আরও দুর্বল হয়ে পড়ত। ফেডারেল কাঠামোয় রাজ্যসভা এমন এক জায়গা, যেখানে শুধুমাত্র জনসংখ্যা নয়, রাজ্য হিসেবে সবার অস্তিত্বের স্বীকৃতি থাকে। তাই রাজ্যসভাকে দুর্বল করা মানে শুধু সংসদের একটি কক্ষকে দুর্বল করা নয়, ভারতের ফেডারেল ধারণাকেই দুর্বল করা।
এই ভারসাম্যহীনতার প্রভাব রাষ্ট্রপতি এবং উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পড়ত। এই দুই নির্বাচনে লোকসভা ও রাজ্যসভার সব সদস্যের ভোট সমান গুরুত্ব পায়। কিন্তু যদি লোকসভায় সদস্যসংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায় এবং রাজ্যসভা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে রাজ্যসভার সদস্যদের ভোট কার্যত অনেক কম গুরুত্ব পেত। অর্থাৎ শুধু আইন পাশ নয়, দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদগুলির নির্বাচনেও লোকসভার প্রভাব অনেক বেশি বেড়ে যেত।
সমালোচকদের আরও একটি আপত্তি ছিল, সরকার নতুন বিলের মাধ্যমে ডিলিমিটেশন কখন হবে, কোন জনগণনার তথ্য ব্যবহার হবে—এই সিদ্ধান্ত সংসদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপর ছেড়ে দিতে চাইছিল। অর্থাৎ ভবিষ্যতে সরকার চাইলে পুরনো জনগণনার তথ্য ব্যবহার করেও নতুন আসন বণ্টন করতে পারত। এতে রাজনৈতিক সুবিধামতো নিয়ম বদলের সুযোগ তৈরি হতো।
লোকসভায় এই বিল শেষ পর্যন্ত পাস হয়নি। তার পরেই সরকার ডিলিমিটেশন বিল এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিলও সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। বিরোধীরা একে গণতন্ত্রের জয় বলে দাবি করেছে। অনেকের মতে, এটি সংসদের ভারসাম্য এবং দেশের ফেডারেল কাঠামো রক্ষা করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।






