ডিলিমিটেশন বিল পাস হলে কেন দুর্বল হয়ে যেত রাজ্যসভা?

Delimitation Bill: ডিলিমিটেশন বিল পাস হলে কেন দুর্বল হয়ে যেত রাজ্যসভা? সংসদের ভারসাম্য এবং দেশের ফেডারেল কাঠামোর উপর এর প্রভাব কতটা বড় হতে পারত?

inscript
৪ মিনিট
ডিলিমিটেশন বিল পাস হলে কেন দুর্বল হয়ে যেত রাজ্যসভা?

লোকসভায় ডিলিমিটেশন বিলের পরাজয়কে অনেকেই শুধু রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখছেন। এই বিলগুলি পাস হলে তার প্রভাব শুধু লোকসভায় সীমাবদ্ধ থাকত না, ভারতের সংসদীয় কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ রাজ্যসভার উপরও গভীর প্রভাব পড়ত। সেই কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই বিলগুলি ব্যর্থ হওয়া শুধু বিরোধীদের সাফল্য নয়, ভারতের ফেডারেল কাঠামোর জন্যও বড় স্বস্তি।

ভারতের সংসদে দু’টি কক্ষ রয়েছে—লোকসভা এবং রাজ্যসভা। লোকসভা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত। অন্যদিকে রাজ্যসভা মূলত রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব করে। এই কারণেই রাজ্যসভাকে 'কাউন্সিল অব স্টেটস' বলা হয়। দেশের বিভিন্ন রাজ্যের স্বার্থ, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে রাজ্যসভার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার যে ডিলিমিটেশন বিল এনেছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল লোকসভার আসন সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো। বর্তমানে লোকসভায় ৫৪৩ জন নির্বাচিত সদস্য রয়েছেন। নতুন প্রস্তাবে সেই সংখ্যা ৮১৫ থেকে ৮৫০-র কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। অথচ রাজ্যসভার সদস্যসংখ্যা অপরিবর্তিত থাকত। এর ফলে দুই কক্ষের মধ্যে ভারসাম্য ভেঙে যেত। এখন লোকসভা রাজ্যসভার তুলনায় প্রায় ২.২ গুণ বড়। নতুন ব্যবস্থায় তা বেড়ে ৩.৩ গুণ হয়ে যেত।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ডিলিমিটেশন: একটি আসনও কমবে না, অমিত শাহের দাবি কেন মানছে না দক্ষিণ ভারত?

Delimitation: দক্ষিণের রাজ্যগুলির লোকসভা আসন কি সত্যিই কমবে না? কেন্দ্রের এই আশ্বাস কি উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের আশঙ্কা কমাতে পারবে? ডিলিমিটেশন, জনসংখ্যা এবং আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে কেন বাড়ছে রাজনৈতিক বিতর্ক?

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ত সংসদের যৌথ অধিবেশনে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিল নিয়ে দুই কক্ষের মধ্যে মতবিরোধ হলে যৌথ অধিবেশন ডাকা হয়। সেখানে লোকসভা এবং রাজ্যসভার সদস্যরা একসঙ্গে ভোট দেন। কিন্তু লোকসভার সদস্যসংখ্যা এত বেশি বেড়ে গেলে রাজ্যসভার ভূমিকা কার্যত নগণ্য হয়ে যেত। তখন যে দল লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা খুব সহজেই যৌথ অধিবেশনে নিজেদের পক্ষে বিল পাশ করিয়ে নিতে পারত। ফলে রাজ্যসভা আর ভারসাম্য রক্ষার ভূমিকা পালন করতে পারত না।

গত কয়েক বছরে দেখা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকার বহু ক্ষেত্রেই রাজ্যসভার আপত্তি বা আলোচনাকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে। উদাহরণ হিসেবে Aadhaar Act, Prevention of Money Laundering Act Amendments বা আয়কর আইনের কিছু সংশোধনীকে মানি বিল হিসেবে আনা হয়েছিল, যাতে রাজ্যসভার সম্মতি প্রয়োজন না হয়। কারণ এই বিলের ক্ষেত্রে রাজ্যসভা শুধু সুপারিশ করতে পারে, বাধা দিতে পারে না। এই প্রবণতা আরও বাড়ত যদি লোকসভার ক্ষমতা সংখ্যার বিচারে এত বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হতো।

ডিলিমিটেশন বিতর্কে আরও একটি বড় প্রশ্ন হলো, কোন রাজ্য কত আসন পাবে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন হলে উত্তর ভারতের বড় রাজ্যগুলি, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ বা রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলি অনেক বেশি আসন পেত। অন্যদিকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি তুলনামূলকভাবে কম আসন পেত। ফলে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য উত্তর ভারতের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়ত।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মহিলা সংরক্ষণ বিলের আড়ালে ২০২৯-এর রাজনৈতিক অঙ্ক কষছে কেন্দ্র?

Delimitation: ডিলিমিটেশন ও আসন বৃদ্ধির প্রস্তাবে কেন বাড়ছে উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের আশঙ্কা? মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোই কি আসল লক্ষ্য, নাকি এর আড়ালে রয়েছে বড় রাজনৈতিক হিসাব?

এই পরিস্থিতিতে রাজ্যসভার গুরুত্ব আরও বেশি হওয়ার কথা ছিল, কারণ সেটাই ছোট বা কম জনসংখ্যার রাজ্যগুলির কণ্ঠস্বর রক্ষা করে। কিন্তু লোকসভাকে অনেক বড় করে দিলে এবং রাজ্যসভাকে একই জায়গায় রেখে দিলে সেই কণ্ঠস্বর আরও দুর্বল হয়ে পড়ত। ফেডারেল কাঠামোয় রাজ্যসভা এমন এক জায়গা, যেখানে শুধুমাত্র জনসংখ্যা নয়, রাজ্য হিসেবে সবার অস্তিত্বের স্বীকৃতি থাকে। তাই রাজ্যসভাকে দুর্বল করা মানে শুধু সংসদের একটি কক্ষকে দুর্বল করা নয়, ভারতের ফেডারেল ধারণাকেই দুর্বল করা।

এই ভারসাম্যহীনতার প্রভাব রাষ্ট্রপতি এবং উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পড়ত। এই দুই নির্বাচনে লোকসভা ও রাজ্যসভার সব সদস্যের ভোট সমান গুরুত্ব পায়। কিন্তু যদি লোকসভায় সদস্যসংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায় এবং রাজ্যসভা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে রাজ্যসভার সদস্যদের ভোট কার্যত অনেক কম গুরুত্ব পেত। অর্থাৎ শুধু আইন পাশ নয়, দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদগুলির নির্বাচনেও লোকসভার প্রভাব অনেক বেশি বেড়ে যেত।

সমালোচকদের আরও একটি আপত্তি ছিল, সরকার নতুন বিলের মাধ্যমে ডিলিমিটেশন কখন হবে, কোন জনগণনার তথ্য ব্যবহার হবে—এই সিদ্ধান্ত সংসদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপর ছেড়ে দিতে চাইছিল। অর্থাৎ ভবিষ্যতে সরকার চাইলে পুরনো জনগণনার তথ্য ব্যবহার করেও নতুন আসন বণ্টন করতে পারত। এতে রাজনৈতিক সুবিধামতো নিয়ম বদলের সুযোগ তৈরি হতো।

লোকসভায় এই বিল শেষ পর্যন্ত পাস হয়নি। তার পরেই সরকার ডিলিমিটেশন বিল এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিলও সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। বিরোধীরা একে গণতন্ত্রের জয় বলে দাবি করেছে। অনেকের মতে, এটি সংসদের ভারসাম্য এবং দেশের ফেডারেল কাঠামো রক্ষা করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মমতা-অভিষেকের দল পরিচালনায় বিরাট গ্যাপ তৈরি হয়েছিল: ইনস্ক্রিপ্ট পডকাস্টে আর কী বললেন কুণাল?

Kunal Ghosh Interview: বিধানসভা ভোটে বিপর্যয়ের পরে প্রতীক, নাম হারিয়ে কার্যত দিশাহারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল। তার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই জারি রয়েছে। যদিও দলের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে মমতার কাছাকাছির বৃত্ত ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়েছে। নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে মুখ পুড়েছে। এই প্রেক্ষিতে আসন্ন পুরভোটে কেমন করবে তৃণমূল? ঘুরে দাঁড়ানোর কোনও সম্ভাবনা আছে? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী? বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে যা বললেন দলের বিধায়ক এবং অন্যতম মুখপাত্র কুণাল ঘোষ।

এসআইআর: বাংলায় ভোটার যাচাইয়ের প্রভাব মুসলিম এলাকাগুলিতে ছ’গুণ বেশি, বলছে পরিসংখ্যান

Bengal Voter List Review: পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা যাচাইয়ে বিচারাধীন ভোটারদের ক্ষেত্রে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলিতেই প্রভাব বেশি পড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই এলাকাগুলিতে ভোটার যাচাইয়ের প্রভাব অন্যান্য এলাকার তুলনায় প্রায় ছ’গুণ বেশি। এই পার্থক্য কীভাবে তৈরি হলো, কোন এলাকার ভোটাররা বেশি প্রভাবিত হলেন এবং এর পিছনে কী কারণ রয়েছে?

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?