বছরে দু’বার ফল, চড়া দাম আর দুর্দান্ত স্বাদ—কেন এত জনপ্রিয় দোফলা আম?
Dofola Mango: গ্রীষ্ম পেরিয়ে গিয়েছে, আকাশ ভেঙে বর্ষা নেমেছে, কিংবা পুজো-পুজো গন্ধ নিয়ে এসে গিয়েছে অক্টোবর-নভেম্বরের শরৎ-হেমন্ত—অথচ গাছে ঝুলছে থোকা থোকা আম! কোনো কোনো গাছে আবার কচি মুকুল, ছোট কাঁচা গুটি আর ডাঁসো পাকা আম একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে।
টকডাল দিয়ে জমিয়ে দুপুরের খাওয়া শেষ হতে না হতেই এই সময় বাঙালির মনে এক হাহাকার জাগছে—“আহা! আমের মরশুম বুঝি এবার শেষ হতে চলল!” ল্যাংড়া, হিমসাগরের দিন তো ফুরিয়ে এল। এবার দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষা। কিন্তু যখন আমরা এতকিছু ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে থাকি, ঠিক তখনই বাংলার কিছু বাগানে ঘটে এক অদ্ভুত ম্যাজিক। এই গুটিকতক বাগানে তখন জন্ম নেয় আমের মুকুল।
গ্রীষ্ম পেরিয়ে গিয়েছে, আকাশ ভেঙে বর্ষা নেমেছে, কিংবা পুজো-পুজো গন্ধ নিয়ে এসে গিয়েছে অক্টোবর-নভেম্বরের শরৎ-হেমন্ত—অথচ গাছে ঝুলছে থোকা থোকা আম! কোনো কোনো গাছে আবার কচি মুকুল, ছোট কাঁচা গুটি আর ডাঁসো পাকা আম একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে। এ হলো বাংলার মাটির এক লুকিয়ে থাকা আশ্চর্য রত্ন—‘দোফলা’ আম।
বাঙালির কাছে আম তো শুধু একটা ফল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশভাগের স্মৃতি, ওপার বাংলার ঘরছাড়ার এক আবেগ আর এক অদ্ভুত জীবনসংগ্রাম। কিন্তু গ্রীষ্মকাল পেরোলেই এই আবেগ ফের পাতে আসতে সময় নেয় এক বছর। তবে, একদল মানুষ পরম মমতায় বাঁচিয়ে রেখেছেন এক অসময়ের ম্যাজিককে— দোফলা আমকে। এই আম গ্রীষ্ম পেরোলেও আপনার পাতে থাকতে পারে।
এরকমই একটি বাগান, নদীয়ার রাধানগর গ্রামের ‘মা অন্নপূর্ণা নার্সারি’। সেখানে গেলে আপনার দেখা হবে ৭০ বছর বয়সি অনুকূল মণ্ডলের সঙ্গে। এই বয়সেও মাটিতে নখ গেঁথে যিনি আগলে রাখছেন বাংলার এক বিপন্ন ঐতিহ্যকে। তাঁর বাগানে নিভৃতে বেড়ে উঠছে কিছু দুর্লভ দোফলা আমের জাত—ভাষতারা, শুকতারা, সোহিনী আর নয়নতারা।

অনুকূলবাবু যখন এই গাছগুলির দিকে তাকান, তাঁর চোখমুখ গর্বে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ঠিক যেমন কোনো বাবা তাঁর সন্তানের সাফল্যের কথা বলেন। অনুকূলবাবুর কথায়, বাজারে যখন কোনো আম থাকে না, তখন এই আমগুলি পেকে তৈরি হয় বাজারে যাওয়ার জন্য। ক্রেতারা তাই চড়া দামে লুফে নেন। আর তাই চাষিদের কাছে এই গাছগুলি একেকটা সোনার খনি!
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শোনা যায়, বহু বছর আগে লখনউয়ের নবাব ফিদা হোসেন পাকিস্তানের ইসলামাবাদের শাহ ফয়সাল মসজিদ এলাকা থেকে একটি বিশেষ আমের চারা নিয়ে এসেছিলেন। তিনি সেটি এনে পুঁতলেন বিহারের পাটনার দিঘা অঞ্চলে। নবাবের ছিল প্রচুর কোলা গরু। রোজ খাঁটি দুধ দোয়ানোর পর যেটুকু দুধ বেঁচে যেত, নবাবের হুকুমে তা ঢেলে দেওয়া হতো ওই ছোট্ট আম গাছটির গোড়ায়।
সমাজ মাধ্যমের সাহায্যে সরাসরি অর্ডার নিয়ে অনুকূলবাবুরা তাঁদের বাগানের এই অফ-সিজন উপহার পৌঁছে দিচ্ছেন সারা ভারতের আমপ্রেমীদের কাছে।
মুর্শিদাবাদের রায়গঞ্জের ৫৫ বছর বয়সি আবদুল মান্নান মণ্ডলের বাগানে ঢুকলে মনে হবে আপনি কোনো সুগন্ধী জাদুঘরে এসে পড়েছেন। গাছে গাছে ঝুলছে রাজকীয় সব নামফলক—কালীভোগ, বাদশাভোগ, কৃষ্ণকলী, আমিনা আর রাস-কি-গুলিস্তান।
তবে মান্নান সাহেবকে সবচেয়ে বেশি টানে তাঁর বাগানের ছয়টি দেশি জাতের দোফলা আম। আজও তাঁর মনে পড়ে, প্রথমবার বর্ষা শেষ হওয়ার পর যখন তিনি গাছে আম ঝুলতে দেখেছিলেন, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেননি। মান্নান সাহেবের বলেন, তাঁরা কখনো ভাবেননি অক্টোবর মাসেও আম পাকতে পারে! বৃষ্টিতে অন্য ফসল নষ্ট হলেও এই গাছগুলি তাঁদের বাঁচার আশা দেখায়।

পশ্চিমবঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার নানা আশঙ্কার মাঝেও আজও প্রায় ২০০-র বেশি দেশি জাতের আম টিকে রয়েছে। নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা, হুগলি বা উত্তর ২৪ পরগনার চাষিদের কাছে দোফলা আম এক দারুণ ভরসার জায়গা। বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাও বলছে, এই আমগুলি অসময়ে বাজারে ফলের জোগান ঠিক রাখতে এবং চাষিদের পকেট সচল রাখতে দারুণ সাহায্য করে।
এখন প্রশ্ন হতে পারে, এই আমের স্বাদ কেমন? সত্যি বলতে, হিমসাগরের মতো আঁশহীন মখমলে শাঁস বা ল্যাংড়ার মতো অতি-মিষ্টি আভিজাত্য হয়তো এর নেই। দোফলা আমে আঁশ (বাঙালির চেনা ‘আঁশ’) একটু বেশি থাকে, আর স্বাদে থাকে একটা চনমনে টক-মিষ্টি ভাব।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
উত্তরপ্রদেশের মালিহাবাদের কালিমুল্লাহ খান। দুনিয়া আজ তাঁকে একডাকে চেনে ‘ম্যাঙ্গো ম্যান অফ ইন্ডিয়া’ নামে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা বিজ্ঞানাগারের প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি আজ ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্যানপালক। তাঁর এই উদ্যানে সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হলো তাঁর ১২৫ বছরের এক বুড়ো আমগাছ। একটা-দুটো নয়, এই একটিমাত্র গাছের শরীরেই তিনি ৩৫০টিরও বেশি জাতের আম ফলিয়ে দেখিয়েছেন!
তবে এই টক ভাবটাই তো বাঙালির হেঁশেলের আসল ম্যাজিক! কাঁচা অবস্থায় এই আম টক ডাল, আচার কিংবা চাটনিতে এক্কেবারে জমে যায়। আর রোদে দেওয়া আমসত্ত্বে এর জুড়ি মেলা ভার।
দিল্লির দরবার থেকে মুখ্যমন্ত্রীর পাত
এই দোফলা আমের খ্যাতি কিন্তু এখন আর শুধু বাংলার গ্রামে সীমাবদ্ধ নেই। ২০১১ সালে তিরুবনন্তপুরমে ‘ন্যাশনাল ম্যাঙ্গো ফেস্ট’-এ বাংলার ‘সুরের দোফলা’ আম রীতিমতো পুরস্কৃত হয়েছিল।
হুগলির উত্তর শিমলাপাল গ্রামের চাষি হালদার মশাইয়ের বাগানে এই সুরের দোফলা গাছ রয়েছে। তিনি জানান, এই গাছে বছরে দুবার মুকুল আসে—প্রথমবার ডিসেম্বরের শীতে, আর দ্বিতীয়বার অগাস্ট-সেপ্টেম্বরের বর্ষায়। হালদারবাবু গর্ব করে বলেন, তিনি শুনেছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও তাঁদের এই সুরের দোফলার স্বাদের প্রশংসা করেছিলেন! অক্টোবর-নভেম্বরের উৎসবের মরশুমে যখন এই আম বাজারে যায়, তখন ভালো দামে বিক্রি হয়।

বহু বছর ধরে এই আমগুলি অবহেলায় পড়ে থাকলেও, এখন বিজ্ঞান এদের গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছে। দ্য নেওটিয়া ইউনিভার্সিটির উদ্যানপালন বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ড. শুভদীপ হালদার তাঁর গবেষণার খাতিরে বাংলার এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ঘুরে বেরিয়েছেন। তিনি হুগলি, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ ঘুরে প্রায় ৩০টি সম্পূর্ণ আলাদা দোফলা জাতের সন্ধান পেয়েছেন।
তার মধ্যে যেমন আছে আমাদের দেশি ‘দত্ত দোফলা’—যা রোদের আলোয় গায়ের খোসা লাল করে এক অদ্ভুত রূপ নেয়; তেমনই এই পরিবারে এসে জুটেছে কিছু বিদেশি অতিথিও! ভিয়েতনামের ‘কাটিমন’, থাইল্যান্ডের ‘থাই অল-টাইম’ আর বাংলাদেশের ‘বারি-১১’ এখন বাংলার মাটিতে দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন এই দত্ত দোফলা আর চিনে দোফলাকে কাজে লাগিয়ে আরও নতুন, উন্নত এবং বেশি ফলনশীল জাত তৈরির চেষ্টা করছেন।
মাটির ঘরের ল্যাবরেটরি
বিজ্ঞানীরা যা এসি ঘরে বসে ভাবছেন, মুর্শিদাবাদের ৭৭ বছর বয়সি কুশল ঘোষ তা নিজের জমিতে করে দেখিয়েছেন। শক্তসমর্থ, অক্লান্ত এই মানুষটি বিভিন্ন জেলা থেকে কেটে ফেলা বা হারিয়ে যাওয়া আমগাছের ডাল উদ্ধার করে এনেছেন। তাঁর ৩৬ বিঘার বাগানটা আসলে একটা জীবন্ত ল্যাবরেটরি।
জানলে অবাক হবেন, তাঁর বাগানের কোনো কোনো গাছে কলম বা গ্রাফটিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ১৬৫টি আলাদা জাতের আম একসঙ্গে ফলে! কুশলবাবু নিজের তৈরি গাছের ডাল কোনো স্বার্থ ছাড়াই অন্য চাষিদের হাত বিলিয়ে দেন, যাতে এই জাতগুলি পৃথিবী থেকে হারিয়ে না যায়। তিনি নিজে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ১৩টি সম্পূর্ণ নতুন হাইব্রিড জাত তৈরি করেছেন, যার নামগুলিও ভারী মিষ্টি—তোতাসিংহ, বেলচম্পা, ল্যাঙ্গো, চম্পারানি, চৌসাসুন্দরী আর বেলাতুর। বাজারে তাঁর তৈরি এক একটা চারার দাম এখন সাড়ে চারশো টাকা!
কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো, দোফলা আমের এই বৈচিত্র্য আজ সংকটের মুখে। আমবাগান কেটে ধান চাষের প্রবণতা এবং বাজারে ক্রেতাদের চেনা ছকের একরকম দেখতে হাইব্রিড আমের প্রতি অন্ধ মোহ—এই দুইয়ের চাপে পড়ে হারিয়ে যাচ্ছে এই দেশি রত্নগুলি। সরকারি স্তরে চারা বিলি বা সংরক্ষণের কাজ শুরু হলেও, আসল দায়িত্ব আমাদের। যতদিন না আমরা এই বৈচিত্র্যকে ভালবাসতে শিখব, ততদিন এই আমগুলির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।






