রাশিয়ার ম্যাজিক! এআই প্রযুক্তিতে মাত্র সাত দিনে তৈরি হচ্ছে ক্যানসার ভ্যাকসিন 'এন্টেরোমিক্স'
Russia Cancer Vaccine: এই ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়ায় AI ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে মাত্র ১ সপ্তাহের মধ্যে একজন নির্দিষ্ট রোগীর জন্য ব্যক্তিগত ভ্যাকসিন তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
বিগত কয়েক দশক ধরে ক্যানসার মানেই ছিল এক আতঙ্কের নাম। কিন্তু ২০২৫-২৬ সালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান আমাদের এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। রাশিয়ার তৈরি নতুন ক্যানসার ভ্যাকসিন 'এন্টেরোমিক্স' নিয়ে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে। দাবি করা হচ্ছে, এটি কেবল ক্যানসার প্রতিরোধ নয়, বরং শরীরে থাকা টিউমার ধ্বংস করতে সক্ষম।
এন্টেরোমিক্স ঠিক কী?
অনেকে মনে করেন এটি পোলিও বা বিসিজি টিকার মতো একটি টিকা, যা আগেভাগে নিলে ক্যানসার হবে না। কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়। এটি একটি 'থেরাপিউটিক ভ্যাকসিন' (Therapeutic Vaccine)। অর্থাৎ, এটি সুস্থ মানুষকে দেওয়া হয় না; বরং যারা ইতোমধ্যেই ক্যানসারে আক্রান্ত, তাদের চিকিৎসার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত mRNA প্রযুক্তিতে তৈরি, যা আমরা করোনা অতিমারির সময় ফাইজার বা মডার্নার টিকার ক্ষেত্রে দেখেছিলাম।
এই ভ্যাকসিনের কাজের পদ্ধতি অত্যন্ত আধুনিক ও ব্যক্তিগতকৃত (Personalized):
• প্রথমে আক্রান্ত রোগীর শরীর থেকে ক্যানসার কোষ বা টিউমারের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
• ল্যাবরেটরিতে সেই কোষের জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Brain Pacemaker: মস্তিষ্কের কোনো অংশ যদি ঠিক ভাবে কাজ না করে তখন এই যন্ত্রটি কৃত্রিমভাবে সেই কাজ সম্পন্ন করে।
• এই ভ্যাকসিন শরীরে প্রবেশ করার পর আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমকে (বিশেষ করে T-cells) চিনিয়ে দেয় যে কোনগুলো ক্যানসার কোষ।
• আমাদের শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম অনেক সময় ক্যানসার কোষগুলোকে চিনতে পারে না, কারণ এই ক্ষতিকর কোষগুলো ছদ্মবেশ ধারণ করে থাকে। এই ভ্যাকসিনটি মূলত একটি 'ডিজিটাল ম্যাপ' হিসেবে কাজ করে।
রুশ স্বাস্থ্য সংস্থা FMBA (Federal Medical and Biological Agency)-র প্রধান ভেরোনিকা স্কভোর্টসোভা জানিয়েছেন যে, প্রাক-ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে (প্রাণীদের উপর) এই ভ্যাকসিন ১০০ শতাংশ সাফল্য দেখিয়েছে। ইঁদুরের উপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি টিউমার বৃদ্ধি রুখতে এবং ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া (Metastasis) বন্ধ করতে কার্যকর। প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, এটি কোলন ক্যানসার (Colorectal Cancer), মেলানোমা (এক ধরনের চর্মরোগ) এবং গ্লিওব্লাস্টোমার (মস্তিষ্কের ক্যানসার) মতো কঠিন রোগে দারুণ কাজ করছে। কিছু ক্ষেত্রে টিউমারের আকার ৬০% থেকে ৮০% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে প্রায় ৪৮ জন স্বেচ্ছাসেবীর উপর এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়েছে। প্রাথমিক তথ্যে দাবি করা হয়েছে যে, ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারী রোগীদের শরীরে টিউমারের বৃদ্ধি ৬০% থেকে ৮০% পর্যন্ত কমেছে এবং কারও কারও ক্ষেত্রে টিউমার সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে।
এই ভ্যাকসিনের ব্যবহারে এখনও পর্যন্ত বড় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর পাওয়া যায়নি। এটি কেমোথেরাপির তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ বলে দাবি করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের মধ্যে রাশিয়ার বেশ কিছু বিশেষায়িত হাসপাতালে মেলানোমা বা চর্ম ক্যানসারের রোগীদের জন্য এর বাণিজ্যিক ব্যবহার পুরোদমে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়ায় AI ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে মাত্র ১ সপ্তাহের মধ্যে একজন নির্দিষ্ট রোগীর জন্য ব্যক্তিগত ভ্যাকসিন তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, রাশিয়ার এই দাবি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও আমাদের মনে রাখতে হবে যে বড় আকারের (Phase 3) হিউম্যান ট্রায়ালের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নালগুলোতে প্রকাশিত হয়নি। তাই একে 'ক্যানসারের চূড়ান্ত নিরাময়' বলার সময় এখনও আসেনি, তবে এটি যে ক্যানসার চিকিৎসার মোড় ঘুরিয়ে দেবে—তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এই ভ্যাকসিন ভারতে কবে পাওয়া যাবে ?
রুশ সরকার জানিয়েছে, তাদের দেশের নাগরিকদের জন্য এই ভ্যাকসিন বিনামূল্যে দেওয়া হবে। তবে রাশিয়ার বাইরে বা ভারতে এটি কবে নাগাদ পাওয়া যাবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। ভারত বা অন্য কোনো দেশে এই ভ্যাকসিন ব্যবহারের আগে সেই দেশের ঔষধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (যেমন ভারতের ক্ষেত্রে DCGI - Drug Controller General of India) থেকে অনুমোদন নিতে হয়। রাশিয়ার নিজস্ব ট্রায়ালের ফলাফল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত ভারত সরকার সরাসরি এর অনুমতি দেবে না।
সাধারণত বিদেশি কোনো ওষুধ ভারতে আনতে গেলে ভারতীয় রোগীদের ওপর আলাদা করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করার প্রয়োজন পড়ে। এন্টেরোমিক্স-এর ক্ষেত্রেও তেমনটা হতে পারে।
রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি (Sputnik V) করোনা ভ্যাকসিনের সময় দেখা গিয়েছিল যে ভারত রাশিয়ার সঙ্গে দ্রুত চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। যদি এন্টেরোমিক্স-এর ফলাফল বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্যতা পায়, তবে ভারত এটি আমদানির ক্ষেত্রে বা ভারতে তৈরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেতে পারে। ২০২৬ সালের মধ্যে রাশিয়া নিজেদের দেশে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু করার পরিকল্পনা করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বা ভারতে পৌঁছতে আরও কিছুটা সময় (২০২৭-২৮ সাল পর্যন্ত) লাগতে পারে, যদি সব ট্রায়াল সফল হয়। রাশিয়ায় এটি সে দেশের নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে দেওয়া হবে। তবে রাশিয়ার বাইরে এর প্রতি ডোজের খরচ প্রায় ৩ লক্ষ টাকা (প্রায় ৩,৫০০ ডলার) হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এন্টেরোমিক্স কোনো জাদুকরী ওষুধ নয় যে এক রাতেই ক্যানসার সেরে যাবে। তবে এটি আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে এমনভাবে শক্তিশালী করে তোলে যে শরীর নিজেই ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়তে পারে।






