নিষ্কৃতি মৃত্যুর অধিকার কি আমাদের পাওনা নয়?
Harish Rana euthanasia case: আধুনিক বিশ্বে 'প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া' বা পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে প্রথম বড় আইনি লড়াই শুরু হয় আমেরিকার কারেন অ্যান কুইনল্যান-এর হাত ধরে।
সঞ্জয় লীলা বনশালি পরিচালিত ‘গুজারিশ’ (২০১০) ছবিতে আমরা দেখতে পাই এক দুর্ঘটনার পর ঘাড়ের নিচ থেকে সম্পূর্ণ পঙ্গু হয়ে যায় এক সময়ের বিশ্বখ্যাত জাদুকর ইথান মাসকারেনহাস। সেই দৃশ্য এখনও আমাদের মনে গেঁথে আছে, যেখানে আমরা দেখতে পাই, ইথান মাসকারেনহাস বিছানায় শুয়ে লড়াই করে চলেছে ঘরের সিলিং থেকে তাঁর কপালে পড়া জলের ফোঁটার সঙ্গে। অসহায় ইথান সাহায্যের জন্য বাড়ির অন্যান্যদের ডাকার, নড়াচড়া করার অনেক ব্যর্থ চেষ্টা করার পরও নিজের চোখকে বাঁচাতে পারেন না ছাদ থেকে পড়া সেই জলবিন্দুগুলি থেকে। শেষমেশ হার স্বীকার করেন তিনি। দীর্ঘ ১৪ বছর বিছানায় শুয়ে অসহ্য শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার পর ইথান আদালতের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন ‘ইচ্ছামৃত্যু’র। তিনি চেয়েছিলেন অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি। সিনেমায় ইথানের সেই লড়াই নাড়া দিয়েছিল জনমানসকে, উসকে দিয়েছিল এক নৈতিক বিতর্ক— জীবনের অধিকার যদি মৌলিক অধিকার হয়, তবে মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণ কি সেই অধিকারের অংশ হতে পারে না?
আজ ১৬ বছর পর, ভারতের সুপ্রিম কোর্টে হরিশ রানা নামে এক ৩২ বছরের যুবকের জীবন সেই ‘গুজারিশ’ ছবিরই ছায়া বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। ৩২ বছরের এই তরুণ গত ১৩ বছর ধরে কার্যত একটি জীবন্ত লাশ হয়ে পড়েছিলেন।
২০১৩ সাল। হরিশ তখন এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর মেধাবী যুবক। থাকতেন উত্তরপ্রদেশের নয়ডায় একটি পেয়িং গেস্ট (PG) আবাসে। হঠাৎই একদিন চারতলার ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত এবং মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যাওয়ার ফলে তিনি নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারান।
চিকিৎসার পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘পারসিস্টেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’ (PVS) এবং ‘কোয়াড্রিপ্লেজিয়া’ (শরীরের চারটি অঙ্গই অবশ)।
গত ১৩ বছর ধরে হরিশের জগৎ সীমাবদ্ধ ছিল একটি বিছানায়। তিনি কথা বলতে পারেন না, নিজে খেতে পারেন না, এমনকী যন্ত্রণার অনুভূতিও প্রকাশ করতে পারেন না। তার গলায় ‘ট্র্যাকিওস্টোমি’ টিউব লাগানো ছিল শ্বাস নেওয়ার জন্য এবং পেটে ‘গ্যাস্ট্রোস্টোমি’ করা হয়েছিল তরল খাবার দেওয়ার জন্য। দীর্ঘ সময় শুয়ে থাকার ফলে তার শরীরে বিশাল বিশাল ‘বেড সোর’ বা ক্ষত তৈরি হয়েছিল। চিকিৎসকদের মতে, তার ফেরার কোনো রাস্তা ছিল না, কেবল কৃত্রিম উপায়ে তার হৃদপিণ্ড সচল রাখা হয়েছিল। এই নিদারুণ কষ্ট সহ্য করতে না পেরেই তার বাবা আদালতের দ্বারস্থ হন, যাতে তার ছেলেকে এই যন্ত্রণাময় 'জৈবিক অস্তিত্ব' থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
বিশ্বজুড়ে নিষ্কৃতিমৃত্যুর ইতিহাস ও আন্দোলন
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Epstein files analysis: বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষরা, যেমন দেশের নেতা, বড় বড় ব্যবসায়ী আর বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা এক টেবিলে বসে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় বড় আলোচনা করতেন। কিন্তু সেই আভিজাত্য ভরা ঘরে একদল নারীর উপস্থিতিও থাকত। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁদের সেখানে কোনো সম্মান ছিল না, ছিল না কোনো কথা বলার অধিকার।
নিষ্কৃতিমৃত্যু বা ইউথেনেশিয়া নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৩৫ সালে লন্ডনে প্রথম ‘ভলান্টারি ইউথেনেশিয়া লিগালাইজেশন সোসাইটি’ তৈরি হয়। আমেরিকায় চিকিৎসক ডেরেক হামফ্রি এবং জ্যাক কেভোরকিয়ান (যাকে ‘ডক্টর ডেথ’ বলা হতো) এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন। তাঁরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, একজন মানুষের যেমন সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার আছে, তেমনই যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর অধিকারও থাকা উচিত।
ইচ্ছামৃত্যু বা ইউথেনেশিয়া নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন আইন রয়েছে। ২০০২ সালের ১ এপ্রিল নেদারল্যান্ড বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে 'টার্মিনাল ইলনেস' বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের জন্য চিকিৎসকের সহায়তায় মৃত্যুবরণ বৈধ করে। তবে এর পিছনে ছিল কয়েক দশকের দীর্ঘ সামাজিক আন্দোলন। ডাক্তার গিরট্রুইডা পোস্টমা (Gertruida Postma) ১৯৭৩ সালে তাঁর মুমূর্ষু মাকে অতিরিক্ত মরফিন দিয়ে শান্তিতে ঘুমোনোর সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এই ঘটনাটি নেদারল্যান্ডসে এমন এক বিতর্কের জন্ম দেয় যে, শেষ পর্যন্ত সরকার আইন পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।
বেলজিয়ামেও প্রায় একই ধরনের আইন রয়েছে, এমনকী সেখানে শিশুদের ক্ষেত্রেও কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে এই অনুমতি দেওয়া হয়। সুইজারল্যান্ডে ‘অ্যাসিস্টেড সুইসাইড’ বা সহায়তাপ্রাপ্ত আত্মহত্যা দীর্ঘকাল ধরে বৈধ। তবে এর জন্য কঠোর চিকিৎসাগত প্রমাণের প্রয়োজন হয়। ২০১৬ সালে কানাডায় ‘MAID’ (Medical Assistance in Dying) আইন পাস হয়, যা প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্তদের সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার দেয়। লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া এবং ইউরোপের দেশ স্পেনেও নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে ইচ্ছামৃত্যু বৈধ। অস্ট্রেলিয়ার কিছু রাজ্যে (যেমন ভিক্টোরিয়া) স্বেচ্ছায় সহায়তাপ্রাপ্ত মৃত্যু বৈধ করা হয়েছে।
আধুনিক বিশ্বে 'প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া' বা পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে প্রথম বড় আইনি লড়াই শুরু হয় আমেরিকার কারেন অ্যান কুইনল্যান-এর হাত ধরে।
মাত্র ২১ বছর বয়সে কারেন মদ্যপান এবং ড্রাগের প্রতিক্রিয়ায় কোমায় চলে যান। চিকিৎসকরা জানান, তিনি কোনোদিন সুস্থ হবেন না। তাঁর বাবা-মা আদালতকে অনুরোধ করেন কারেনকে লাইফ সাপোর্ট বা ভেন্টিলেটর থেকে মুক্তি দিতে। ক্যাথলিক চার্চ এবং চিকিৎসকদের একাংশ এর বিরোধিতা করলেও, ১৯৭৬ সালে নিউ জার্সি সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, রোগীর পক্ষে তাঁর পরিবার লাইফ সাপোর্ট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম বড় জয়, যেখানে আদালত স্বীকার করে যে যন্ত্রের সাহায্যে জোর করে কাউকে বাঁচিয়ে রাখা ব্যক্তির স্বাধীনতার পরিপন্থী।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
LGBTQ+ Community: আমেরিকান শিল্পী গিলবার্ট বেকার সমকামী মানুষের অধিকারের প্রতীক হিসাবে আঁকেন রামধনু পতাকা। ২৫ জুন ১৯৭৮ LGBTQ+ মানুষের স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে রামধনু পতাকা প্রথম প্রকাশ পায়। এই পতাকা আশ্রয়, ভরসার প্রতীক হয়ে নিজের স্বভাব, মন, মেজাজ, মর্জি ও মুক্তির প্রকাশ হয়ে রাজপথ দখলের কর্মসূচিতে গোটা পৃথিবীতে জনপ্রিয় সংস্কৃতির চেহারায় হাজির হতে চায়।
১৯৯০ সাল থেকে পনেরো বছর ধরে কোমায় ছিলেন আমেরিকার টেরি শিয়াভো। তার স্বামী লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন, কিন্তু তার বাবা-মা বিপক্ষে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০০৫ সালে আদালত তাকে মুক্তি দেয়।
১৭ বছর ধরে কৃত্রিমভাবে বেঁচে ছিলেন ইতালির এলুয়ানা এংল্লারো। ইতালির আদালত তার বাবার আবেদনের ভিত্তিতে তাকে নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দেয়, যা সেই দেশে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
ভারতে ইচ্ছামৃত্যু বা ‘ইউথেনেশিয়া’ নিয়ে তর্কের সূত্রপাত হয়েছিল অরুণা শানবাগ-এর হাত ধরে। মুম্বইয়ের কেইএম হাসপাতালের নার্স অরুণা ৪২ বছর ধরে কোমায় ছিলেন। ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট প্রথমবার ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ বা পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যুর পথ প্রশস্ত করে। এরপর ২০১৮ সালে ‘কমন কজ’ নামক একটি সংগঠনের মামলায় আদালত রায় দেয় যে, ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যু’ প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। তবে এই নিয়ম অত্যন্ত জটিল ছিল। ২০২৬ সালের ১১ মার্চের এই রায়টি ঐতিহাসিক কারণ, এই প্রথম ভারতের কোনো আদালত সরাসরি একজন ব্যক্তিকে জীবনদায়ী ব্যবস্থা খুলে নেওয়ার অনুমতি দিল।
বিচারপতি জে. বি. পার্দিওয়ালা এবং বিচারপতি কে. ভি. বিশ্বনাথনের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, যখন সুস্থ হওয়ার কোনো আশা নেই এবং রোগী কেবল যান্ত্রিক উপায়ে বেঁচে আছেন, তখন সেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া আসলে নিষ্ঠুরতা। বিচারপতিরা হরিশের বাবা-মায়ের ত্যাগের প্রশংসা করে বলেন,
কাউকে ভালবাসা মানে কেবল তাকে ধরে রাখা নয়, তাকে কষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়াও ভালোবাসারই অংশ।
মানুষের বেঁচে থাকা কি কেবল হৃদস্পন্দনের যান্ত্রিক ওঠানামা? নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু? সুপ্রিম কোর্টের এই রায় আমাদের সেই চিরন্তন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। ১৩ বছর আগে যে উজ্জ্বল কিশোরটি চারতলার ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছিল, তার শরীরটা পড়ে থাকলেও প্রাণস্পন্দন যেন সেই দিনই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। গত তেরো বছর ধরে হরিশের বাবা-মা একদিকে যেমন চিকিৎসার প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেছেন, অন্যদিকে তেমনই লড়েছেন এক কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে।
চিকিৎসাশাস্ত্রে একে ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ বলা হতে পারে, আইনি পরিভাষায় একে বলা হতে পারে ‘মৌলিক অধিকারের প্রয়োগ’, কিন্তু মানবিকতার মাপকাঠিতে এটি আসলে এক পরম করুণা। ‘গুজারিশ’ সিনেমার শেষে ইথান মাসকারেনহাস যখন তার চারপাশের প্রিয়জনদের হাসিমুখে বিদায় জানাচ্ছিলেন, তখন সেখানে বিষাদের চেয়ে মুক্তির আনন্দই ছিল প্রকট। হরিশ রানার ক্ষেত্রেও বিষয়টি আলাদা নয়।
ভারতের বিচারবিভাগের ইতিহাসে ১১ মার্চের এই দুপুরটি এক দীর্ঘশ্বাসের অবসানের সাক্ষী হয়ে রইল। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে হরিশ আজ যন্ত্রণাহীনভাবে এবং মর্যাদার সঙ্গে বিদায় নেওয়ার সুযোগ পেলেন। এই রায় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিজ্ঞান যখন জীবনের সংজ্ঞা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন করুণা আর বিচারবোধই হয়ে ওঠে শেষ আশ্রয়। মর্যাদা কেবল বেঁচে থাকায় নয়, মর্যাদা মিশে থাকে শান্তিময় বিদায়বেলাতেও।






