আহত ঘাস কীভাবে বিপদ থেকে বাঁচায় অন্যান্য গাছেদের?

Grass Protects other Plants: গবেষণা অনুযায়ী, আমাদের দেহের কোনও অংশে কেটে গেলে যেমন রক্ত ঝরতে থাকে, ঘাসের পাতাও ক্ষতিগ্রস্ত হলে ‘লাইনোলেনিক অ্যাসিড’ ও ‘লিনোলিয়েক অ্যাসিড’ নির্গত হয়।

Diganta Paul
৩ মিনিট
আহত ঘাস কীভাবে বিপদ থেকে বাঁচায় অন্যান্য গাছেদের?

‘ঘাস’ বলামাত্র কী মনে পড়ে আমাদের? সবুজে-ভরা এক ধরনের শান্ত নিরীহ গাছ, যে সামান্য একটু মাটি পেলেই জন্ম নেয়। বিন্দু মাত্র যত্ন ছাড়াই বেড়ে ওঠে। এ কারণেই হয়তো এক টুকরো জমি থেকে রাস্তার ধার, কিংবা ফাঁকা মাঠ, জঙ্গল— সর্বত্রই বিভিন্ন রকমের ঘাস, এই শহরায়নের যুগে এখনও দুর্লভ হয়ে যায়নি।

চারপাশে নিত্যদিন দেখতে পাওয়া এই ঘাসের অস্তিত্বের সঙ্গে প্রাণী সমাজের একটা আশ্চর্য মিল রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, আমাদের দেহের কোনও অংশে কেটে গেলে যেমন রক্ত ঝরতে থাকে, তেমনই একটি ঘাসের পাতাও ক্ষতিগ্রস্ত হলে ‘লাইনোলেনিক অ্যাসিড’ ও ‘লিনোলিয়েক অ্যাসিড’ নির্গত হয়। আসলে, যখনই ঘাস কাটা হয় বা ঘাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ঘাসে উপস্থিত ‘লাইপক্সিজিনেজ’ নামক এক প্রকার উৎসেচক ঘাসের কিছু কোষের কোষপর্দায় রাসায়নিক ভাঙন ঘটাতে শুরু করে।

প্রসঙ্গত জানাই, ঘাসের কোষপর্দার গঠন প্রক্রিয়া নির্ভর করে আছে কতগুলি জৈব যৌগিক পদার্থের ওপরে। ফসফোলিপিড, প্রোটিন, কোলেস্টেরল, কার্বোহাইড্রেট—- এর মধ্যে অন্যতম! যখনই ঘাস উপড়ে ফেলা হয় বা, ঘাসকে মাড়িয়ে চলে যায় কেউ, কোনও-না-কোনও ভাবে আহত হওয়া মাত্রই, ঘাসের সেই কোষপর্দা রাসায়নিক ভাবে ভেঙে পড়ে। এবং এর ফলে ‘লাইনোলেনিক অ্যাসিড’ ও ‘লিনোলিয়েক অ্যাসিড’ উৎপন্ন হয়। শুধু তাই নয়, ‘লাইনোলেনিক অ্যাসিড’ ও ‘লিনোলিয়েক অ্যাসিড’ ঘাস থেকে নির্গত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই বাতাসের সঙ্গে বিক্রিয়াপর্ব শুরু করে দেয়। অক্সিজেনের সংস্পর্শে ‘লাইনোলেনিক অ্যাসিড’ ও ‘লিনোলিয়েক অ্যাসিড’ বিক্রিয়া করে ‘সিস্-৩-হেক্সেনাল’ নামক এক অস্থায়ী জৈব যৌগিক পদার্থ উৎপাদন করে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রূপান্তরকামী হয় গাছও! প্রতি ঋতুতে কীভাবে লিঙ্গ বদলায় আখরোট গাছ?

Walnut Tree: যে নিয়মে মহিলা এবং পুরুষ আখরোট গাছগুলিকে তাদের ৫০:৫০ অনুপাতে ভারসাম্য বজায় রাখে তা অনেকটা প্রাণীর যৌন ক্রোমোজোমের কাজ করার মতোই।

জনজীবনে পরিচিত ঘাস

এই জৈব যৌগিক পদার্থের এক বিশেষ গন্ধ আছে। যে-গন্ধের সঙ্গে কম-বেশি সকলেই পরিচিত। ঘাস কাটার পর, এই বিশেষ গন্ধটিই আমাদের নাকে আসে। এই জৈব যৌগিক পদার্থটি খুবই সামান্য পরিমাণে উৎপন্ন হলেও, মানুষের ঘ্রাণইন্দ্রিয়ে তার বিশেষ গন্ধটি ধরা পড়ে।

এখানে একটি তারতম্যের উল্লেখ করা জরুরি। পরীক্ষালব্ধ ফলাফল বলছে, উজ্জ্বল সূর্যালোকের উপস্থিতিতে ঘাস কাটা হলে এই জৈব যৌগিক পদার্থটির উৎপাদন অনেক বেড়ে যায়! তবে এই জৈব পদার্থ অস্থায়ী বলে ওই বিশেষ ঘাস কাটার গন্ধটিও বেশীক্ষণ স্থায়ী হয় না। আবার এই গন্ধ বিভিন্ন পাখি ও কীটদেরও আকর্ষণ করে, যাদের জীবনখাদ্য হল ঘাসে বসবাসকারী বিভিন্ন উদ্ভিদভুক পোকা। ফলে, কোনও উদ্ভিদভুক কীট, কোনও ঘাসে কামড় বসালেও সেই ঘাস থেকে উৎপন্ন হওয়া বিশেষ গন্ধ সেই ঘাসকে আত্মরক্ষায় সাহায্য তো করেই, এমনকী অন্যান্য ঘাস ও উদ্ভিদেও কামড় বসাতে সেই উদ্ভিদভুক পোকাকে বাধা দেয়!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গাছ সত্যিই হাঁটে? বটগাছের এই অভাবনীয় ঘটনার আড়ালে কোন সত্য?

The Walking Banyan Tree : হাওড়ার আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু বোটানিক্যাল গার্ডেনে অবস্থিত এই গাছটির ছায়ায় আস্ত ম্যানহাটন শহর ঢুকে যেতে পারে!

আগেই বলেছি যে, 'সিস্-৩-হেক্সেনাল' পদার্থটি অস্থায়ী, তাই উৎপন্ন হওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বিশ্লিষ্ট হয়ে ‘সিস্-৩-হেক্সেনল’ ও ‘ট্রান্স-২-হেক্সেনাল’ নামক দু-রকম পদার্থ উৎপন্ন করে। উল্লেখ্য যে, ‘সিস্-৩-হেক্সেনল’ হল অ্যালকোহল জাতীয় এক রকম জৈব পদার্থ এবং ‘ট্রান্স-২- হেক্সেনাল’ হল অ্যালডিহাইড জাতীয় জৈব পদার্থ। ‘সিস্-৩-হেক্সেনল’ পদার্থটি উৎপন্ন হয়ে ঘাসের ক্ষতকে মেরামত করে, আবার ‘ট্রান্স-২- হেক্সেনাল’ পদার্থটি উদ্বায়ী বলে উৎপন্ন হওয়ার পরেই তা বাষ্পে পরিণত হয় এবং বাতাসে ছড়িয়ে যায়।

বিভিন্ন ধরনের ঘাস

আহত ঘাস থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া এই ‘ট্রান্স-২- হেক্সেনাল’ পদার্থটি অন্যান্য সকল ঘাস ও উদ্ভিদকে আসন্ন আক্রমণের সংকেত পাঠায়। কারণ ‘ট্রান্স-২-হেক্সেনাল’ পদার্থটি অন্যান্য ঘাস ও উদ্ভিদের কোষের কোষপর্দার স্বাভাবিক তড়িৎ বিভবকে কিছুটা বাড়িয়ে দেয়। এ যেন এক ভীতির শিহরণ! একটি ঘাস আহত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই সেই আহত তড়িৎসংবাদ সকল ঘাস ও উদ্ভিদের শরীরে খেলে যায়!

প্রকৃতির মধ্যে বসবাসকারী এমন বিশেষ কিছু বুদ্ধিমান উদ্ভিদ আছে যাদের শরীরে এই শিহরন খেলে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই তারা তাদের পাতার রাসায়নিক গঠন খুব তাড়াতাড়ি বদলে ফেলে, যাতে সেই পাতার স্বাদ, গন্ধ মানুষ ও উদ্ভিদভুক পোকাদের পছন্দ না হয়! এর ফলে, সেই বিশেষ উদ্ভিদেরা মানুষ ও উদ্ভিদভুক পোকাদের আসন্ন আক্রমণ থেকে অনেক ক্ষেত্রেই রক্ষা পায়। আত্মরক্ষার এই তৎক্ষণাৎ আয়োজন খুবই আশ্চর্যময় হলেও, স্বীকার করতেই হয় যে সেই আয়োজনেও ছোট ছোট ঘাসেদের ভূমিকাই সব চেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ!

লিখেছেন
Diganta Paul
Diganta Paul
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?