কীভাবে হাজার হাজার পর্যটকের মাঝেও পরিষ্কার থাকে ছাঙ্গু লেক?
গ্যাংটক থেকে নাথু লা যাওয়ার রাস্তায়, পাহাড়ি চড়াই-উতরাই পেরিয়ে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে এই ছাঙ্গু লেকের অবস্থান। বছরের পর বছর ধরে এখানে পর্যটকদের এই যে অবিরাম আনাগোনা, তা স্থানীয় পাহাড়ি গ্রামগুলির মানুষের রুজি-রোজগারের মূল চাবিকাঠি। কিন্তু এই পর্যটনই একসময় ডেকে এনেছিল মস্ত বড় বিপদ। ব্যবসার হাত ধরে লেকের চারপাশে জমা হতে শুরু করেছিল দেদার আবর্জনা।
আজকাল সিকিমের ছাঙ্গু লেকে (Tsomgo Lake) পা দিলেই পর্যটকদের চোখে প্রথম যে জিনিসটা পড়ে, তা হলো এর টলটলে শান্ত জল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বারো হাজার ফুটেরও বেশি উঁচুতে অবস্থিত এই হিমবাহ হ্রদ বা গ্লেসিয়াল লেকের জল এতটাই পরিষ্কার যে, চারপাশের আকাশ আর মায়াবী পাহাড়গুলির প্রতিচ্ছবি হুবহু ভেসে ওঠে তাতে। হিমেল হাওয়ায় লাদাখ বা সিকিমের চেনা ছন্দে উড়তে থাকে রঙিন প্রার্থনার পতাকা। পর্যটকেরা ক্যামেরায় বন্দি করেন সেই ফ্রেম। আর ওপাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা শান্ত ইয়াকগুলি পিঠে সওয়ারি নেওয়ার জন্য চুপচাপ অপেক্ষা করে।
আজকের এই শান্ত, মনোরম দৃশ্যটা দেখলে সত্যিই মন জুড়িয়ে যায়। কিন্তু মাত্র দুই দশক আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। তখন নিজের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তার চাপেই রীতিমতো ধুঁকছিল হিমালয়ের এই বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্রটি।
গ্যাংটক থেকে নাথু লা যাওয়ার রাস্তায়, পাহাড়ি চড়াই-উতরাই পেরিয়ে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে এই ছাঙ্গু লেকের অবস্থান। বছরের পর বছর ধরে এখানে পর্যটকদের এই যে অবিরাম আনাগোনা, তা স্থানীয় পাহাড়ি গ্রামগুলির মানুষের রুজি-রোজগারের মূল চাবিকাঠি। কিন্তু এই পর্যটনই একসময় ডেকে এনেছিল মস্ত বড় বিপদ। ব্যবসার হাত ধরে লেকের চারপাশে জমা হতে শুরু করেছিল দেদার আবর্জনা।
প্লাস্টিকের বোতল, চিপস-বিস্কুটের প্যাকেট, দুধের কার্টন, টেট্রা প্যাক থেকে শুরু করে নর্দমার নোংরা জল আর পশুর মলমূত্র—সব মিলিয়ে হ্রদের চারপাশটা আস্তে আস্তে নোংরার স্তূপে পরিণত হচ্ছিল। হ্রদের একদম ধার ঘেঁষেই সার বেঁধে দাঁড়িয়েছিল অজস্র দোকানপাট। ফলে দোকানের ছাঁটকাগজ আর নোংরা গিয়ে পড়ত হ্রদের জলের ভিতর। ২০০০ সালের শুরুর দিকে যখন পর্যটকদের সংখ্যা হু হু করে বাড়তে লাগল, তখন এই হ্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবেশবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। কারণ, এটি যেমন সিকিমের পর্যটন শিল্পের একটা বড় সম্পদ ছিল, তেমনই ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল এক পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্র এবং আশেপাশের গ্রামগুলির জল জোগানোর প্রধান উৎস।
২০০৬ সালের মধ্যে এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, হ্রদটিকে বাঁচাতে গেলে মাঝেসাঝে কেবল লোকদেখানো সাফাই অভিযান চালালেই চলবে না। তার চেয়েও বড় এবং স্থায়ী কিছুর প্রয়োজন। আর তখনই সিকিম সরকার এক অভিনব পদক্ষেপ নিল। তারা স্থানীয় বাসিন্দা, বন দপ্তর, পরিবেশ আধিকারিক, পর্যটন ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় সমাজকর্মীদের মতো সমস্ত পক্ষকে একসঙ্গে এক ছাতার তলায় নিয়ে এল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Anurag Bhandari: আমাদের চারপাশে আজ পরিবেশ সচেতনতা বা ‘সাসটেইনেবিলিটি’ নিয়ে কত বড় বড় কথা হয়। কিন্তু অনুরাগ সেটাকে স্রেফ মুখের কথায় আটকে না রেখে বাস্তবে করে দেখিয়েছেন। ভারতের ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার বেশিরভাগটাই জমা হয় আবর্জনার স্তূপে। অনুরাগ এই অপচয় কমানোর লড়াইয়ে নেমেছেন।
মূল লক্ষ্যটাই ছিল এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে কোনো আবর্জনা হ্রদের জল পর্যন্ত পৌঁছতেই না পারে। এর জন্য প্রথমেই হ্রদের একদম ধার ঘেঁষে থাকা দোকানগুলিকে সরিয়ে জলাশয়ের সীমানা থেকে বেশ কিছুটা দূরে নতুন একটা বাণিজ্যিক এলাকা তৈরি করে দেওয়া হলো।
পর্যটকদের প্রিয় ‘ইনস্ট্যান্ট নুডলস’ বা কাপ নুডলস ছিল ওয়ান-টাইম কাপ এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের অন্যতম প্রধান উৎস। তাই হ্রদের চারপাশে এটি বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলো। পর্যটকরা যাতে প্লাস্টিকের বোতলের উপর বেশি নির্ভর না করেন, তার জন্য সেখানে পরিস্রুত পানীয় জলের বিকল্প ব্যবস্থার সূচনা করা হলো। গাড়ির চালক এবং পর্যটকদের হাতে তুলে দেওয়া হলো ময়লা ফেলার বিশেষ ব্যাগ। আর যারা চমরী গাইয়ের মালিক, তাদের উৎসাহিত করা হলো পশুর মলমূত্র সঠিকভাবে পরিষ্কার রাখার জন্য। লক্ষ্য কিন্তু পর্যটন বন্ধ করে দেওয়া ছিল না, বরং পর্যটন আর পরিবেশ—দুটোকে কীভাবে হাত ধরাধরি করে একসঙ্গে বাঁচিয়ে রাখা যায়, সেটাই ছিল আসল উদ্দেশ্য।
সাফাই অভিযান যখন মানুষের দৈনন্দিন অভ্যেস
শুরুর দিকে, অর্থাৎ ২০০৬ সালের দিকে হ্রদ ও তার চারপাশের এলাকা থেকে প্রায় ২০ ট্রাক আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় মানুষজন খুব ভালো করেই জানতেন যে, একবারের এই চেষ্টা কোনো স্থায়ী সমাধান এনে দেবে না। তাই, আবর্জনা মুক্ত রাখার এই লড়াইটাকে তারা তাদের দৈনন্দিন জীবনেরই একটা অংশ বানিয়ে ফেললেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গত পাঁচ বছর ধরে তাঁর বাড়িতে কোনো ডাস্টবিন বা আবর্জনার বালতি নেই! শুনলে অবাক লাগাই স্বাভাবিক, কিন্তু এই ব্যস্ত শহরের বুকেই এক ফোঁটা আবর্জনা না জমিয়ে সম্পূর্ণ ‘জিরো-ওয়েস্ট’ বা বর্জ্যহীন জীবন কাটানো যে সম্ভব, তা হাতেনাতে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন এই মিডিয়া কর্মী।
এই পুরো ব্যবস্থাকে একটা সুনির্দিষ্ট রূপ দিতে জন্ম নিল একটি হ্রদ সংরক্ষণ কমিটি—যার নাম ‘ছাঙ্গু পোখরি সংরক্ষণ সমিতি’ (TPSS)। ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হওয়া এই সমিতিতে থেলু, চাঙ্গু আর চিপসু—এই তিনটি গ্রামের প্রায় ১৮০ থেকে ২৭০টি পরিবার সরাসরি যুক্ত হলো। নিয়ম হলো, প্রতি পরিবার থেকে অন্তত দুজন করে সদস্য এই সমিতির কাজে অংশ নেবেন।
এখন ছাঙ্গু লেকে ঠিক উৎস থেকেই ময়লা সংগ্রহ করে তা আলাদা করা হয়। পর্যটন এলাকার বিভিন্ন জায়গায় নির্দিষ্ট ডাস্টবিন বসানো হয়েছে। আর এই সংবেদনশীল পাহাড়ি এলাকায় যাতে বিন্দুমাত্র নোংরা জমে থাকতে না পারে, তার জন্য দিনে দুবার গাড়ি এসে সমস্ত আবর্জনা রিসোর্স রিকভারি সেন্টারে নিয়ে যায় পুনর্ব্যবহারের জন্য।
এখানে আসা পর্যটকেরাও মাত্র ১০ টাকার একটি ছোট সংরক্ষণ ফি (conservation fee) দেন। শুনতে খুব সামান্য মনে হলেও, এই টাকাটাই ব্যবহার করা হয় হ্রদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সচেতনতা শিবির এবং চারপাশের রক্ষণাবেক্ষণের কাজে।
এই পুরো লড়াইয়ের নেপথ্যে একজন স্থানীয় নায়কের নাম না করলেই নয়—তিনি হলেন সাঙ্গে লামা শেরপা (Sangay Lama Sherpa)। টিপিএসএস-এর অফিস সেক্রেটারি সাঙ্গে লামা বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ সামলাচ্ছেন। তাঁর জেদ আর পাহাড়ের প্রতি ভালবাসাই আজ ছাঙ্গুকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Jataka Stories: জাতক কাহিনি শুধু নীতিশিক্ষার গল্প নয়, প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। গাছপালা, পশুপাখি ও মানুষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার শিক্ষা পাওয়া যায় এসব গল্পে। লোভ, হিংসা ও আসক্তির ক্ষতির কথাও বলা হয়েছে। আজকের পরিবেশ সংকটের সময়ে বুদ্ধের পূর্বজন্মের ২৫০০ বছরের পুরনো এই গল্পগুলি কি আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখাতে পারে?
প্রায় দুই দশক পর: আজকের ছাঙ্গু লেক
আজ সেই আন্দোলনের ফল হাতেনাতেই দেখা যাচ্ছে। ছাঙ্গু লেক এখন অনেকটাই তার পুরনো রূপ ফিরে পেয়েছে। ২০১৩ সালে এটি ‘বেস্ট ক্লিন টুরিস্ট স্পট’ এবং ২০১৯ সালে ‘বেস্ট ক্লিন ইন্ডিয়া ক্যাম্পেইন’ সহ একাধিক বড় পুরস্কার পেয়েছে।
এই লেকটি ‘কিওংনোসলা আলপাইন স্যাংচুয়ারি’-র একটি অংশ। তাই পরিবেশ ভালো হতেই এখানে আবার দেখা মিলছে লাল পান্ডা, হিমালয়ান কালো ভাল্লুক, মাস্ক ডিয়ার, তুষার চিতা এবং হরেক রকমের পরিযায়ী পাখির। আর মে মাসের পর লেকের চারপাশ জুড়ে যখন রডোডেনড্রন, প্রিমুলা আর নীল-হলুদ পপি ফুল ফোটে, তখন মনে হয় যেন কোনো শিল্পী ক্যানভাসে রঙ ঢেলে দিয়েছেন।
শুধু পরিবেশ নয়, এই হ্রদের একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গুরুত্বও রয়েছে। স্থানীয় মানুষজন একে অত্যন্ত পবিত্র মনে করেন। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই হ্রদের জলের রঙও বদলে যায়। আগেকার দিনে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও জ্যোতিষীরা এই জলের রঙ দেখেই ভবিষ্যৎবাণী করতেন। আবার ভাদ্র পূর্ণিমা বা গুরু পূর্ণিমার দিনে সিকিমের ওঝা বা ফেইথ হিলাররা (জ্যাকরি) এখানে জড়ো হন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই জলের বিশেষ চিকিৎসাগুণ রয়েছে এবং স্বয়ং শিব ঠাকুর একসময় এখানে ধ্যান করেছিলেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছাঙ্গু লেকে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন পালক। শীতকালে, বিশেষ করে ২০২৬ সালের এই ফেব্রুয়ারি-মার্চের মরসুমেও লেক যখন পুরোপুরি বরফে ঢাকা থাকে, তখন স্নো-টুরিজমের টানে এখানে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন। মাঝেমধ্যে ভারী তুষারপাতের জন্য রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলেও, বরফ ঢাকা ছাঙ্গুর রূপ দেখতে পর্যটকদের উৎসাহে খামতি থাকে না। তার উপর এখন চালু হয়েছে এশিয়ার অন্যতম উঁচুতে অবস্থিত রোপওয়ে (প্রায় ১৪,৫০০ ফুট)। মাত্র ২০০ টাকার টিকিট কেটে রোপওয়েতে উঠলে উপর থেকে ছাঙ্গু লেক আর তুষারাবৃত হিমালয়ের যে দৃশ্য দেখা যায়, তা এককথায় অবিশ্বাস্য!
তবে সাফল্যের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কিন্তু কম নয়। বর্তমানে সিকিমে পর্যটকদের সংখ্যা প্রতি বছর ১৭ লক্ষ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মে মাসের মতো পিক সিজনে একেক দিনেই ৫,০০০-এর বেশি পর্যটক ছাঙ্গু লেকে আসেন। ফলে অতিরিক্ত ভিড়, ট্রাফিক জ্যাম আর গাড়ির ধোঁয়া সামলানো এখন সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথার কারণ। মাঝেমধ্যে কিছু অসচেতন পর্যটকের জন্য আবর্জনা ফেলার ঘটনাও ঘটে। তবে টিপিএসএস-এর কড়া নজরদারি আর নিয়মিত সচেতনতা প্রচারের ফলে পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সিকিমের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক অনন্য নজির
ভারতে প্রতি বছর কোটি কোটি টন বর্জ্য তৈরি হয়, এবং শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই এই আবর্জনার সঠিক ব্যবস্থাপনা আজও এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ছাঙ্গুর এই রূপান্তরের গল্প প্রমাণ করে দেয় যে, পরিবেশ রক্ষার সমাধান সবসময় বড় বড় পরিকাঠামো তৈরি বা কোটি কোটি টাকার দামি প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে না।
ছাঙ্গু লেকের ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণের মানে কিন্তু সাধারণ মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখা বা পর্যটন বন্ধ করে দেওয়া ছিল না। এর আসল চাবিকাঠি ছিল সবাইকে একসঙ্গে শামিল করা—গ্রামবাসী, দোকানদার, গাড়ির চালক, সরকারি আধিকারিক থেকে শুরু করে বেড়াতে আসা পর্যটক—প্রত্যেককে এই লড়াইয়ের অংশীদার করে তোলা এবং নিজের কাজের জন্য দায়বদ্ধ রাখা। সিকিমের ছাঙ্গু লেক আজ পুরো ভারতের কাছে এক অনুপ্রেরণামূলক মডেল। কারণ, এই যৌথ দায়িত্ববোধটুকু না থাকলে, প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলিকেও বোধহয় কোনোদিন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়।






