ভোটারের তথ্য আড়াল করতে নির্বাচন কমিশনের দুর্ভেদ্য দেওয়াল যেভাবে ভাঙা হলো
West Bengal voter list: ভোটার তালিকার ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ কি সত্যিই কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা, নাকি এর আড়ালে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন লুকিয়ে আছে? কেন লক্ষ লক্ষ ভোটার ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’-এ? কেন তথ্য এমন ফরম্যাটে, যা খুঁজে দেখা কঠিন? এই সংশোধন প্রক্রিয়া কি স্বচ্ছতা বাড়াচ্ছে, নাকি উল্টে সন্দেহই বাড়াচ্ছে?
নির্বাচন কমিশন ২০২৫-২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) করেছে। দাবি করা হয়, এটি একটি নজিরবিহীন উদ্যোগ। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেখা গেল, এটি তথ্য দেওয়ার চেয়ে বরং সমস্যাই বাড়িয়েছে।
এই তালিকা এমনভাবে প্রকাশ করা হয়েছে যে তা সহজে খোঁজা বা বিশ্লেষণ করা যায় না। মেশিনে রিডেবেল ফাইলের বদলে এই তালিকাটি স্ক্যান করা পিডিএফ হিসেবে দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ তুলে ধরা হয়েছে কাগজের পাতার ছবি। ফলে এর মধ্যে কিছু খুঁজে বের করা যেমন কঠিন, তথ্য বিশ্লেষণ করাও দূরহ। প্রতিটি পাতা যেন ইচ্ছাকৃতভাবে যাচাই-বাছাই থেকে দূরে রাখা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, জনগণ তথ্য মেলাতে না পারলে আসলে কার লাভ হয়?
পশ্চিমবঙ্গে এই বিশেষ সংশোধন (SIR) নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, বড় মাত্রায় গরমিল রয়েছে। বিরোধী দলগুলির দাবি, যেসব সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী সাধারণত বিজেপি-কে সমর্থন করে না, তাদের ভোটারদেরই বেশি করে বাদ দেওয়া হয়েছে বা সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে।
বারবার আঙুল উঠেছে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে চলতি বছরের ১৩ মার্চ তাঁর অপসারণের নোটিসও আনা হয়। এর আগেই তাঁর নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। নতুন আইনে নির্বাচন কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে একজন মন্ত্রীকে সেই পদ দেওয়া হয়, ফলে শাসক দলের হাতে কার্যত দুই-এক সংখ্যাগরিষ্ঠতা চলে আসে।
এই পরিস্থিতিতে, তথ্য উপস্থাপনের ফরম্যাটটি আর রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখা যাচ্ছে না।
‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’: ভারতীয় নির্বাচনী ইতিহাসে এক নতুন ধারণা
কেন এই এসআইআর আলাদা, তা বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে—'লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি' বিষয়টি। ২০২৬ সালের আগে ভারতীয় নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এই ধরনের কোনো ধারণা ছিল না।
এই এসআইআর-এ প্রতিটি ভোটারকে ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে নিজের বা পরিবারের কারও তথ্যের মাধ্যমে যোগসূত্র প্রমাণ করতে বলা হয়। এর ভিত্তিতে ভোটারদের তিন ভাগে ভাগ করা হয়—ম্যাপড, আনম্যাপড, এবং এবারের নতুন বিভাগ: লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি।
আসলে লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সিতে কাগজে-কলমে রাখার কথা যাদের বাবা-মায়ের নামের অমিল, বয়সের অস্বাভাবিক ফারাক বা নথির অসঙ্গতি দেখা যাবে তাদের। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় খুব সাধারণ কারণেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। যেমন নামের বানানে সামান্য পার্থক্য 'Mohammed' আর 'Muhammad', 'Mondal' আর 'Mandal' এসব নিয়েই সফটওয়্যার বিভ্রান্ত হয়েছে। পুরনো তালিকার খারাপ মানের স্ক্যানও মিল খুঁজে বের করা আরও কঠিন করে তুলেছে।
ফলে এমনও হয়েছে, একজন ভোটার অযোগ্য নন, কিন্তু সফটওয়্যার তাকে চিনতে না পারায় সন্দেহের তালিকায় পড়ে গিয়েছেন। এই গোলযোগ একজন মানুষ চাইলেই এড়িয়ে যেতে পারতেন।
প্রক্রিয়া চলাকালীনই কমিশন আরেকটি নতুন ধাপ যোগ করে। একটি অ্যালগরিদমের মাধ্যমে আগেই মিল পাওয়া ভোটারদেরও আবার চিহ্নিত করা শুরু হয়। সফটওয়্যারের আপডেটের মাধ্যমে নিয়ম যেন চলতে চলতেই বদলে যাচ্ছিল, যার ব্যাখ্যা ভোটারদের কাছে তো নয়ই, অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছেও পরিষ্কারভাবে জানানো হয়নি।
বহুজনই 'লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি'র আওতায় পড়ে যান। প্রায় ১.৩৬ কোটি ভোটারকে 'লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি' বিভাগে রাখা হয়। তাদের নাম সরানো হয়নি, কিন্তু ভোট দিতেও দেওয়া হয়নি। তাদের 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' বলে চিহ্নিত করা হয়—মানে যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের ভোটাধিকার স্থগিত থাকে। এই প্রক্রিয়া শেষ করার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমাও ঠিক করা হয়নি, তবুও নির্বাচনের ঘোষণা হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বারবার হস্তক্ষেপ করে। ২০ ফেব্রুয়ারি আদালত সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে বিচারিক আধিকারিকদের নিয়োগ করে, এমনকী ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা থেকেও কর্মী আনা হয় কাজ সামলাতে। তবুও ৩২ লক্ষ মামলার নিষ্পত্তি হলেও, প্রায় ৪০ শতাংশ, মানে প্রায় ১৩ লক্ষ নাম ২৩ মার্চ প্রকাশিত প্রথম অতিরিক্ত তালিকায় দেখা যায়নি।
১৯৫২ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত ১৩ বার এই ধরনের বিশেষ সংশোধন (SIR) হয়েছে। কিন্তু আগে কখনও লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি নামে এমন কোনো বিভাগ রাখাই হয়নি, যেখানে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই ভোটাধিকার থেকে কার্যত বাইরে রাখা হয়। এই বিভাগের মানে কী, কী ভাবে একজন ভোটার এতে পড়ছেন, বা কী ভাবে সেখান থেকে বের হবেন—কিছুই পরিষ্কারভাবে জানানো হয়নি।
ফাইল খোলার আগেই শুরু বাধা
পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা নিয়ে কাজ শুরু করতেই সমস্যার মুখে পড়ে অল্ট নিউজ। তারা কলকাতার দুটি কেন্দ্র—ভবানীপুর (১৫৯) ও বালিগঞ্জ (১৬১)- এর তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে।
তথ্য পাওয়াই ছিল প্রথম বাধা। শুধু ভবানীপুরেই ২৬৭টি জোন রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে একবারে মাত্র ১০টি এলাকার তথ্য ডাউনলোড করা যায়, তাও আবার ক্যাপচা দিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে একসঙ্গে সব ডেটা নামানো যায় না, সবই করতে হয় সময় নিয়ে।
নিচের স্ক্রিনশটে দেখা যাচ্ছে, সঠিক ক্যাপচা দেওয়া হলেও পোর্টাল 'invalid captcha' দেখাচ্ছে।
দ্বিতীয় বাধা ছিল ফাইলের ধরন। এই স্ক্যান করা পিডিএফগুলি গড়ে কিছু ফাইল ডিজিটালি পড়া যায় এমন ফাইলের চেয়ে প্রায় ২২৮ গুণ বড়, কিন্তু তাতে কোনো সাজানো তথ্য (structured data) নেই। এটা প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা নয়। ভারত ইতোমধ্যেই আধার, ইউপিআই, ডিজিলকারের মতো বড় বড় সিস্টেম চালায়। তাই পিডিএফের পাশাপাশি একটি সিএসভি (CSV) ফাইল দেওয়া খুবই সহজ কাজ। তা না দেওয়া আসলে একটি উদ্দেশ্যপ্রোণদিত সিদ্ধান্ত।
তৃতীয় বাধা রয়েছে ফাইলের ভেতরেই। প্রায় প্রতি দশজন ভোটারের একজনের নামের উপর তির্যকভাবে 'UNDER ADJUDICATION' লেখা থাকে, এতে অনেক সময় নামটাই ঢেকে দেয়। এটি কোনো ভুল নয়, এর ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য বের করা তো কঠিন হয়ই, অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের পক্ষে পড়াও কঠিন হয়ে যায়।

প্রতিটি ধাপেই আলাদা সমস্যা আছে—ক্যাপচা ডাউনলোডে বাধা দেয়, ছবির মতো পিডিএফ বুঝতে কঠিন হয়, আর ওয়াটারমার্কে নাম পড়া মুশকিল হয়ে যায়।
তথ্য কী বলছে: অনিশ্চয়তায় ৩৯,৬০৪ ভোটার
অল্ট নিউজ ভবানীপুর ও বালিগঞ্জের ৫৫৮টি পিডিএফ থেকে ভোটারদের তথ্য ডিজিটাল করে। তারা প্রতিটি ভোটারের সিরিয়াল নম্বর, আইডি, নাম ও যাচাইয়ের অবস্থা আলাদা করে বের করে এবং দু'ভাবে যাচাই করে মিলিয়ে দেখে।
এই দুই কেন্দ্রে মোট ৩৯,৬০৪ জন ভোটার, যা মোট ভোটারের প্রায় ১১.২ শতাংশ 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ, তারা এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

এই ৩৯,৬০৪ জন ভোটারের মধ্যে অল্ট নিউজ নামের ভিত্তিতে (প্রথম নাম ও পদবি একসঙ্গে দেখে) তাদের ধর্মীয় পরিচয় বোঝার চেষ্টা করে। কারণ বাংলায় অনেক সময় হিন্দু নামের সঙ্গে মুসলিম পদবি বা তার উল্টোটা দেখা যায়।
এই দুই কেন্দ্রে মোট ভোটারের মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যা ৩৯.৫ শতাংশ। কিন্তু 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' তালিকায় থাকা ভোটারদের মধ্যে তাদের সংখ্যা ৬৬.৫ শতাংশ।
এটি বোঝার নিয়ম খুব সহজ: যদি কোনো একটি সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের মোট জনসংখ্যার তুলনায় বেশি হারে 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন'-এ পড়ে, তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরে, মুসলিম ভোটার ২১.৯ শতাংশ। কিন্তু 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন'-এ থাকা ভোটারদের মধ্যে মুসলিমদের ভোটার সংখ্যা ৫১.৮ শতাংশ, মানে প্রায় প্রতি চারজন মুসলিম ভোটারের একজন এই তালিকায়। একই কেন্দ্রে হিন্দু ভোটারদের ক্ষেত্রে এই হার অনেক কম, ১৭ জনে একজনেরও কম।
বালিগঞ্জেও মুসলিমরা সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৪.৩ শতাংশ), সেখানেও এই তালিকায় তাদের উপস্থিতি অনেক বেশি—প্রায় চারজনের মধ্যে তিনজন। এখানে মুসলিম ভোটারদের 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন'-এ পড়ার হার হিন্দুদের তুলনায় প্রায় তিনগুণ।
এই দুই কেন্দ্রের তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়, একজন মুসলিম ভোটারের 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন'-এ পড়ার সম্ভাবনা একজন হিন্দু ভোটারের তুলনায় ৩.১ গুণ বেশি।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, দুটি কেন্দ্রেই একই রকম একটি স্পষ্ট প্রবণতা রয়েছে। এই নিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার।
এই বিশ্লেষণ কোথায় আলাদা
অনেক সংস্থা এসআইআর-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে কিছু উদ্বেগজনক দিক তুলে ধরেছে। কিন্তু অল্ট নিউজ আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে শুধু ফলাফল নয়, ফলাফলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তথ্যও প্রকাশ করেছে।
দুটি কেন্দ্রে প্রতিটি ভোটারের বিস্তারিত তথ্য অল্ট নিউজ ডাটাবেসে দেওয়া হয়েছে (নিচে লিঙ্ক রয়েছে)। সেখানে ভোটার আইডি, সিরিয়াল নম্বর, শ্রেণিবিভাগ এবং একটি কনফিডেন্স স্কোরও আছে। যেমন, ভবানীপুরে মুসলিম ভোটার ২১.৯ শতাংশ, এই দাবির ভিত্তি হিসেবে নামের তালিকাও সবাই দেখতে পারবেন। আবার, 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন'-এ থাকা ৮,০৮৩ জন মুসলিম ভোটারের প্রতিটি রেকর্ডও যাচাই করার জন্য খোলা রাখা হয়েছে।
তবে ব্যক্তির গোপনিয়তার কথা ভেবে, এআই-এর সাহায্যে নির্ধারিত ধর্মীয় পরিচয়ের তথ্য এই প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি।
অ্যাডজুডিকেশনের ভোটারদের মোট তিনটি শ্রেণিতে ভাঙা হয়েছে, যথা হাই, মিডিয়াম এবং লো কনফিডেন্স। মোট ৩৯,৬০৪টি অ্যাডজুডিকেশন
ভোটারের মধ্যে ৯৩.৯ শতাংশই পড়ছে হাই কনফিডেন্সের মধ্যে। মুসলিম ভোটারদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে হাই কনফিডেন্সের আওতায় পড়ছেন ৯৭.৩ শতাংশ। এই বৈষম্যই বড় ফারাক তৈরি করে দিচ্ছে।
যেসব ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা আছে—যেমন এক শব্দের নাম, মিশ্র ধরনের নাম (হিন্দুদের মতো নামের সঙ্গে মুসলিমদের মতো পদবি বা উল্টোটা), বা ওয়াটারমার্কে ঢাকা তথ্য আলাদা করে যাচাইয়ের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ডেটাসেটকে নিখুঁত বলা হয়নি, বরং এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে সবাই এটি যাচাই করতে পারে। পাঠক, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট ভোটারদের ভুল খুঁজে দেখে ঠিক করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এই ডাটাবেসটি একটি পাবলিক ইন্টারফেসের মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়, যেখানে ব্যবহারকারীরা জনসংখ্যাগত তথ্য দেখতে পারেন, নাম বা ভোটার আইডি দিয়ে রেকর্ড খুঁজে বের করতে পারেন এবং কী ভাবে এই শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে তা যাচাই করতে পারেন। এর উদ্দেশ্য শুধু তথ্য যাচাই নয়, বরং তথ্যকে আবার এমনভাবে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া, যাতে তারা তা ব্যবহার করতে পারেন।
সম্পূর্ণ ডেটাসেট এবং এর বিশ্লেষণ এখানে দেখা যাবে: https://sir-data-decoded.altnew
এটি দেখতে এরকম:

হোমপেজে গিয়ে Demographics Analysis-এ ক্লিক করলেই দুটি কেন্দ্রের ধর্ম ও লিঙ্গভিত্তিক পুরো বিভাজন দেখা যাবে। এখানে সেই মূল জনসংখ্যার তথ্য দেখিয়ে, ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন'এ থাকা সংখ্যাগুলির তুলনা করা হয়।
Adjudication Records-এ ক্লিক করলে আন্ডার অ্যাডজুডিকেশনে থাকা ৩৯,৬০৪ জন ভোটারের পুরো তালিকা দেখা যাবে। এখানে নাম বা ভোটার আইডি দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তি খুঁজে বের করা যায়।
Demographics Triage-এ গেলে 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন'-এ থাকা ভোটারদের পাশাপাশি তাদের শ্রেণিবিন্যাস এবং কনফিডেন্স স্কোরও দেখা যাবে। এই অংশে কাজের পদ্ধতি পুরোপুরি স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে ধর্ম, লিঙ্গ এবং কনফিডেন্স লেভেল অনুযায়ী ফিল্টার করে দেখা যায় এবং যেসব ক্ষেত্রে শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে সন্দেহ আছে, সেগুলিও পর্যালোচনা করা যায়।
(নোট: যারা সম্পূর্ণ ডেটাসেট দেখতে ও যাচাই করতে চান, তাঁ রা লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।)
যাতে কোনো সমস্যায় না পড়তে হয় এমন টুল তৈরি করা
আসলে এটি একটি প্রুফ অব কনসেপ্ট। এর মতো উদাহরণ বিদেশেও আছে। সেখানেও অস্পষ্ট সরকারি পিডিএফ ডেটাকে টুল হিসেবে ব্যবহার করে সহজে ব্যবহারযোগ্য করা হয়েছে। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের প্রকাশিত তথ্য ইঞ্জিনিয়াররা, সার্চ করা যায় এমন আর্কাইভে রূপান্তর করেছেন। মূল কথা হলো, কেবল ফাইলের ফরম্যাট জটিল হলেই তা তথ্য গোপন করা বোঝায় না
নির্বাচন কমিশনের কাছে ইতোমধ্যেই এই ডেটা কাঠামোবদ্ধ (structured) আকারে রয়েছে। এই পিডিএফ গুলি ডাটাবেস থেকেই তৈরি করা হয়। তাই কেবল স্ক্যান করা ইমেজ আকারে প্রকাশ করা, সঙ্গে মেশিন-পড়তে পারে (machine-readable) এমন ফাইল না দেওয়ার বিষয়টি আসলে শুধুই তথ্য গোপন করা নয়, বরং তথ্যকে ব্যবহারযোগ্য না করে রাখার একটি সিদ্ধান্ত।
অল্ট নিউজ পশ্চিমবঙ্গের সব নির্বাচনী এলাকায় এই কাজটি ছড়িয়ে দিতে চায়। তাদের লক্ষ্য এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে সাংবাদিক, গবেষক এবং সাধারণ মানুষ ভোটার তালিকার তথ্য খুঁজতে, বিশ্লেষণ করতে এবং ত্রুটি শনাক্ত করতে পারবেন। যাচাই করে পাওয়া সংশোধনগুলি ধীরে ধীরে ডেটাসেটে যুক্ত করা হবে, ফলে তথ্যটি ক্রমে আরও নির্ভুল হবে।
এই বিষয়টি শুধু এই নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্রে কোনো তথ্য যদি আইনি ভাবে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে, তবে সেটি বাস্তবেও সহজে ব্যবহারযোগ্য হওয়া উচিত। যদি তা না হয়, তাহলে বাধাটি প্রযুক্তিগত নয়, বরং রাজনৈতিক।
এই দুটি নির্বাচনী এলাকায় অন্তত ৩,৫২,২৮৭ জন ভোটারের ক্ষেত্রে এই বাধা শুধুই আর ধারণাগত নয়, এর বাস্তব প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে।
খরচ
দুটি নির্বাচনী এলাকার মোট ৩,৫২,২৮৭টি ভোটার রেকর্ড ডিজিটাইজ করতে (ডেটা সংগ্রহ, যাচাই এবং বিশ্লেষণ) মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১৪১ ডলার (প্রায় ১১,৮০০ টাকা)। এই কাজের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি ব্যবহার করলে, প্রতি নির্বাচনী এলাকার জন্য খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৫৫ ডলার।
যাদের মৌলিক প্রযুক্তিগত দক্ষতা আছে, নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত পিডিএফ ডেটা যাদের কাছে আছে এবং ৫৫ ডলার খরচ করার সামর্থ্যও আছে, তারা চাইলে পশ্চিমবঙ্গের যে কোনো নির্বাচনী এলাকায় এই ধরনের বিশ্লেষণ পুনরায় করতে পারেন।
তবে এই খরচটি পুরোপুরি তৈরি হয়ে যাওয়া একটি প্রক্রিয়ার খরচ, এটি তৈরি করতে গিয়ে আসল যে খরচ হয়েছে তা নয়। এই পর্যায়ে পৌঁছাতে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়েছে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে ডেটা বের করার চেষ্টা করা হয়েছে, এবং সেগুলোর সঠিকতা যাচাই করা হয়েছে ওয়াটারমার্কযুক্ত ভোটার কার্ডের সঙ্গে মিলিয়ে। যেসব পদ্ধতি বেশি খরচসাপেক্ষ বা নির্ভরযোগ্য ছিল না, সেগুলি বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে ফলাফল যাচাই করার জন্য আবার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই সব ধাপে কয়েকশো ডলার খরচ হয়েছে, যা একবারের বিনিয়োগ। এর ফলেই এখন প্রতি নির্বাচনী এলাকার খরচ এই পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
পাশাপাশি পদ্ধতি তৈরি করা এবং ফলাফল যাচাই করা বিশেষজ্ঞদের পারিশ্রমিকও ধরা হয়নি। তারা বিনামূল্যে কাজ করেছেন, কিন্তু এই কাজে তাদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
প্রসঙ্গত, ভারতের নির্বাচন কমিশন জনসাধারণের অর্থ খরচ করে ERONET নামে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে ১ কোটিরও বেশি মানুষকে 'Logical Discrepancy' (যুক্তিগত অসঙ্গতি)- র আওতায় চিহ্নিত করেছে। কিন্তু সে বিষয়ে তারা জনসমক্ষে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। অন্যদিকে, Alt News কয়েকশো ডলার খরচ করে সেই তথ্যগুলিকে এমনভাবে সাজিয়েছে, যাতে সেগুলো সহজে খুঁজে বের করা, সাজানো এবং সাধারণ মানুষের সামনে আনা যায়।
এই কাজটি এখনও প্রাথমিক ধাপে। পরবর্তী ধাপে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর যে অতিরিক্ত তালিকাগুলি বের হয়েছে, সেগুলো এবং SIR প্রক্রিয়ার আগে যে খসড়া তালিকাগুলি ছিল, সেগুলিও বিশ্লেষণ করা হবে। এর মাধ্যমে পুরো সংশোধন প্রক্রিয়ার সময় ভোটারের তথ্য কী ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তার একটি সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।
কমিশনের যুক্তি এবং তার সীমাবদ্ধতা
ভারতের নির্বাচন কমিশন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোটার তালিকাকে শুধু ইমেজ (ছবির) ফরম্যাটে প্রকাশ করার পক্ষে একাধিক কারণ ব্যাখ্যা করেছে।
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তারা সব রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয় যাতে ভোটার তালিকা শুধু ইমেজ ফাইল হিসেবে প্রকাশ করা হয়। তাদের যুক্তি ছিল ডেটার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, বিশেষ করে বিদেশি পক্ষের দ্বারা তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। এই নীতির বিরুদ্ধে কংগ্রেস নেতা কমল নাথ আদালতে চ্যালেঞ্জ জানালে, কমিশন দাবি করে যে সার্চযোগ্য ও মেশিন-পাঠযোগ্য ফরম্যাট থাকলে বড় আকারে ডেটা বিশ্লেষণ (data mining) করা সম্ভব এবং তা ভোটারদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করতে পারে। তবে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই দাবির যথার্থতা নিয়ে বিস্তারিত বিচার করেনি এবং ফাইলের ফরম্যাট বেছে নেওয়ার বিষয়টি কমিশনের উপরই ছেড়ে দেয়।
সম্প্রতি ২০২৫ সালের অগাস্টে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার আরও কঠোরভাবে বলেন যে মেশিন-পাঠযোগ্য ফাইল কার্যত নিষিদ্ধ, কারণ সেগুলি সহজে পরিবর্তন (edit) করা যায়, ফলে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।
এই যুক্তিটি অনেকেই প্রযুক্তিগতভাবে ভুল বলে সমালোচনা করেছেন। কারণ, কোনো ডেটাসেটের ডাউনলোড করা কপি সম্পাদনা করলে সেটি নির্বাচন কমিশনের কাছে থাকা মূল তথ্যকে পরিবর্তন করতে পারে না। অফিসিয়াল ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নির্ভর করে না সেটি কোন ফরম্যাটে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হচ্ছে তার উপর।
এখানে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো এই নীতির মধ্যে থাকা এক ধরনের অসমতা। নির্বাচন কমিশন নিজেই ERONET সিস্টেমে ভোটার ডেটা কাঠামোবদ্ধ ও মেশিন-পাঠযোগ্য আকারে সংরক্ষণ করে। কিন্তু এই সুবিধা বাইরে অর্থাৎ সাধারণ মানুষ, গবেষক এবং রাজনৈতিক দলগুলির জন্য, সেইভাবে উন্মুক্ত করা হয় না।
অর্থাৎ, সমস্যা আসলে এই নয় যে ডেটা কাঠামোবদ্ধ করা সম্ভব কি না—কারণ তা ইতোমধ্যেই করা আছে। আসল বিষয় হলো, সেই কাঠামোবদ্ধ ডেটা কে ব্যবহার করতে পারবে এবং কীভাবে ব্যবহার করতে পারবে।
Alt News পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি লিখে তাঁর মতামত ও প্রতিক্রিয়া চেয়েছে। যদি কোনো উত্তর পাওয়া যায়, তাহলে এই প্রতিবেদনটি সেই অনুযায়ী আপডেট করা হবে।
(অল্টনিউজের অনুমতিক্রমে বাংলাভাষী পাঠকদরে জন্য এই প্রতিবেদনটি অনূদিত হলো।)






