নেহেরু নন, ইনিই ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী

Sourish Das
৪ মিনিট
নেহেরু নন, ইনিই ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী

যেকোনো ছোট্ট স্কুল পড়ুয়া থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক যে কোন সাধারণ মানুষ, যাকে জিজ্ঞেস করবেন না কেনো, সেই কিন্তু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জওহরলাল নেহেরুর কথা বলবেন। এবং সেটা বলাই স্বাভাবিক। আজ অব্দি স্কুল সিলেবাস থেকে শুরু করে সমস্ত জায়গাতেই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জহরলাল নেহেরুর নাম লেখা রয়েছে। ১৯৪৭ সালে যখন ইংরেজদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে ভারত স্বাধীন হল, তখন থেকেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জহরলাল নেহেরু। কিন্তু ভারতে এমন কিছু ঐতিহাসিক নথিপত্রে রয়েছে, যা প্রমাণ করে '৪৭ এর স্বাধীনতার আগেই ভারতে প্রথম সরকার গঠিত হয়ে গিয়েছিল। তৎকালীন সময়ের ভারতের একটি রাজনৈতিক দল এই সরকার গঠন করেছিল। সেই দলের থেকেই নির্বাচিত হয়েছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীবর্গ। ইংরেজদের দ্বারা সেই সরকার ভেঙে ফেলা হলেও, ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকে সম্পূর্ণরূপে প্রমাণিত হয়েছে, ওই সরকার ছিল ভারতের প্রথম স্বাধীন সরকার। রাশিয়া থেকে শুরু করে আফগানিস্তান, জাপান এবং তুর্কমেনিস্তানের সাহচর্য লাভ করে ওই সরকার গঠন করা হয়েছিল।

তখনকার সময়ে এই সরকারের ক্ষমতা এতটা বেশি হয়ে গিয়েছিল যে ইংরেজ শাসকরা ওই সরকার ভেঙে ফেলতে বাধ্য হয়েছিল। অত্যন্ত স্বল্প মেয়াদী সরকার হলেও এই সরকারটিকে ভারতের প্রথম সরকারি হিসেবে গণ্য করা হয়, এবং এই সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। আর এই সরকার গঠন করেছিল তৎকালীন স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত অন্যতম রাজনৈতিক দল গদর পার্টি। ১৩ মার্চ ১৯১৩ সালে গদর পার্টি স্থাপিত হয়েছিল। তারপরে ১২০ জন ভারতীয়কে নিয়ে একটি বিশাল বড় সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল গদর পার্টির তরফ থেকে। সেই সময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সবে সবে শুরু হয়েছে। ভারতের মধ্যে গদর পার্টির জনপ্রিয়তা হু হু করে বাড়তে শুরু করলো। সেই সময় এই দলের সঙ্গে যুক্ত হলেন শোহন সিং বহুকনা এবং লালা হরদয়াল এর মত বেশকিছু স্বাধীনতা সংগ্রামী। ভারতের ব্রিটিশ সরকারকে ধংস করা এবং গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ সরকার গঠন করার লক্ষ্য নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ঘোষণা করে গদর পার্টি।

শুধু ভারত নয়, ভারতের বাইরেও ধীরে ধীরে এই গদর পার্টির জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করলো। সেই সময় এই পার্টির সংস্থাপক মৌলানা বরকতউল্লাহ একটি সাপ্তাহিক গদর প্রকাশন তৈরি করলেন। সেখান থেকে আগামী দেড় বছর পর্যন্ত ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ক্রান্তিকারী লেখা ছাপানো শুরু হলো। সেই সময় থেকেই একজন ক্রান্তিকারী লেখক এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে বরকতউল্লাহ জনপ্রিয় হতে শুরু করলেন। গদর প্রকাশন এর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করলে এই পত্রিকায় লিখতে শুরু করলেন চম্পক রামন পিল্লাই, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, এবং রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ এর মত ব্যক্তিরা। ভারতের সাধারণ মানুষকে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণে নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা শুরু করলো গদর প্রকাশন। ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুরধার লেখা এবং বরকতউল্লাহর দুর্দান্ত বাচনভঙ্গি গদর পার্টির এই পত্রিকাকে আমেরিকা থেকে জার্মানি পর্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলল।

আস্তে আস্তে সাপ্তাহিক গদর পত্রিকার জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করলো। তার সাথে সাথেই এই সমস্ত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার ব্যবস্থা নিতেও শুরু করলেন। কিন্তু, পত্রিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও ইংরেজ সরকারের পক্ষ থেকে গদর পার্টির বিরুদ্ধে তখনও তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তবে পরিস্থিতি সমস্যাজনক হয়ে পড়লে তখন যখন বরকতউল্লাহ খান এবং রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ এর প্রচেষ্টায় ইংরেজদের হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লড়াই করা সৈনিকেরা ইংরেজদের হয়ে কাজ করতে মানা করতে শুরু করলেন। অথৈ জলে পড়ল ব্রিটিশ সরকার। এই পদক্ষেপকে ব্রিটিশ সরকার অনেকটা বেইমানির চোখে দেখতে শুরু করলো। এই পদক্ষেপের পরেই বরকতউল্লাহ এবং রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে লোহা নেওয়ার উদ্দেশ্যে তুর্কমেনিস্তান, বাগদাদ এবং আফগানিস্তান সফরে গেলেন। কাবুলে এই দুই নেতাকে ব্রিটিশ সৈন্যরা নজরবন্দি করে ফেলল। কিন্তু অন্যদিকে তাদের বাঁচানোর জন্য এগিয়ে এলো আফগানিস্তানের সাধারণ জনতা এবং জার্মানি সরকার।

ফলে ব্রিটিশ সরকার তাদের দুজনকে মুক্ত করতে বাধ্য হল। কিন্তু তখন থেকেই এই দুই নেতা ফন্দি আঁটতে শুরু করলেন যে কোনোভাবেই হোক ব্রিটিশ সরকারকে দেশ থেকে সরাতে হবে। এবং তার জন্য সবার আগে লাগবে একটি অস্থায়ী সরকার। যেমন ভাবা তেমন কাজ, ১৯১৫ সালে জার্মানি সরকারের সাহায্য নিয়ে কাবুলে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিয়ে প্রথম অস্থায়ী সরকার গঠন করে ফেললেন রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ। জার্মানির সরকারের তরফ থেকে ভারতের এই অস্থায়ী সরকার কে সাহায্য করা হয়েছিল। এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন বরকতউল্লাহ খান এবং রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ। এছাড়াও ভারতীয় গৃহ মন্ত্রী হয়েছিলেন উবেদ আল সিন্ধি, যুদ্ধমন্ত্রী হয়েছিলেন মৌলবি বশীর এবং বিদেশ মন্ত্রী হয়েছিলেন চম্পক করন পিল্লাই।

তবে জানিয়ে রাখা ভাল, বরকতউল্লাহ খানের এই সরকার কিন্তু ভারতের মাটিতে তৈরি হয়নি, বরং গঠিত হয়েছিল আফগানিস্তানের মাটিতে। তাই সবার আগে আফগানিস্তানের সঙ্গে বরকতুল্লাহ একটি চুক্তি করেছিলেন। তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল, ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আফগানিস্তান তাদেরকে সাহায্য করবে। আফগান সরকারের সমস্ত আশ্বাসন লাভ করে ভারতের ওই অস্থায়ী সরকার ইংরেজদের বিরুদ্ধে নিজেদের আক্রমণ আরো জোরালো করতে শুরু করে। অন্যদিকে রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ চীন, মঙ্গোলিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার বেশকিছু দেশের সঙ্গে সখ্যতা বাড়াতে শুরু করলেন। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় অক্টোবর সংগ্রামের পর রাশিয়ায় জারশহী পরাজিত হলেন।

১৯১৯ সালে মস্কো গিয়ে সেখানে বরকতুল্লাহ দেখা করলেন লেনিনের সঙ্গে। লেনিনের আশ্বাসনের পর সোভিয়েত রাশিয়ার তরফ থেকে ভারতকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করা শুরু হলো। কিন্তু, ১৯১৯ সালের শেষের দিকে ইংরেজ সরকার বুঝতে পারল, এই গদর পার্টি ইংরেজ সরকারের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই তড়িঘড়ি বন্ধ করে দেওয়া হল এই পার্টির সংবাদপত্র। সাথে সাথেই রাশিয়া এবং আফগানিস্তানের সঙ্গেও এই সরকারের সম্পূর্ণ যোগাযোগ স্তব্ধ করে দিলো ব্রিটিশ সরকার। ফলপ্রসূ কয়েক বছরের মধ্যেই ভারতের প্রথম অস্থায়ী সরকারের পতন হলো। কিন্তু এই সরকার জন্ম দিয়েছিল বাঘাযতীন, লালা হরদয়াল, শচীন সান্যাল, রাজবিহারী বসু, এবং ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত এর মত লোকেদের যারা পরবর্তীতে সুভাষচন্দ্র বসুর জন্য জায়গা তৈরি করতে পেরেছিলেন।

তথ্যসূত্র -

  • https://hindi.news18.com/news/knowledge/barkatullah-khan-was-the-first-prime-minister-of-india-instead-of-nehru-1973446.html

লিখেছেন
Sourish Das
Sourish Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।