ইরান যুদ্ধ: ভারতে বাড়তে চলেছে ওষুধের দাম?

Iran war impact India: ইরান যুদ্ধের প্রভাব কি ভারতের ওষুধের বাজারে পড়তে শুরু করেছে? কাঁচামালের দাম বাড়া ও পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি কি ওষুধের দাম বাড়াবে?

inscript
৩ মিনিট
ইরান যুদ্ধ: ভারতে বাড়তে চলেছে ওষুধের দাম?

ইরান যুদ্ধের অভিঘাত যে কেবল পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তা এখন স্পষ্ট। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে সংঘাত হলেও ভারতের ওষুধের বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে। প্রশ্ন হলো, ভারতে কি ওষুধের দাম বাড়তে চলেছে? আর যদি বাড়ে, তার পেছনে কারণ কী?

প্রথমেই বুঝতে হবে, ভারতের ওষুধ বা ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টর সম্পূর্ণ স্বনির্ভর নয়। দেশে ওষুধ তৈরি হলেও তার একটি বড় অংশ নির্ভর করে আমদানি করা কাঁচামালের উপর। বিশেষ করে চিন থেকে আসা API (Active Pharmaceutical Ingredients), বিভিন্ন সলভেন্ট, রাসায়নিক উপাদান—এসব ছাড়া উৎপাদন কার্যত থমকে যেতে পারে।

ইরানকে ঘিরে চলা যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগর অঞ্চলে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে কাঁচামাল পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে পরিবহণ খরচও হঠাৎ করে বেড়ে গিয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হরমুজ প্রণালী: কাঠের নৌকার সামনে কেন বিপাকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মার্কিন নৌবাহিনী?

Strait of Hormuz Crisis: হরমুজ প্রণালীতে কেন বিপাকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মার্কিন নৌবাহিনী? কীভাবে ইরানের সাধারণ কাঠের মাছধরা নৌকা আধুনিক যুদ্ধজাহাজকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে? অসম যুদ্ধের এই নতুন কৌশল কি বদলে দিচ্ছে সমুদ্রযুদ্ধের ভবিষ্যৎ?

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটি চোখে পড়ছে, তা হলো কাঁচামালের দামে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ওষুধ তৈরির মূল উপাদানের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গ্লিসারিনের দাম কয়েক মাসে ৬৪ শতাংশ বেড়েছে, আবার সাধারণ প্যারাসিটামলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকী কিছু বিশেষ ওষুধের ক্ষেত্রে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বড় সমস্যা, পরিবহণ খরচ। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজের সংখ্যা কমে গিয়েছে। ফলে প্রতিটি কনটেইনার পাঠাতে বাড়তি ৪,০০০ থেকে ৮,০০০ ডলার পর্যন্ত খরচ দিতে হচ্ছে। এই সমস্ত কারণ মিলিয়ে ওষুধ তৈরির মোট খরচ দ্রুত বাড়ছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ব্রিটেন থেকে মার্কিনদেশ: তেল যার ইরান তার

Iran oil politics: ইরান কেন পশ্চিমের চেয়ে পূর্বকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল? রেশমপথ কীভাবে ইরানকে সমৃদ্ধ করেছিল? তেল নিয়ে ব্রিটেন-আমেরিকার হস্তক্ষেপ কেন বাড়ল? মোসাদ্দেকের জাতীয়করণ উদ্যোগ কেন বাধার মুখে পড়ে? এই ইতিহাস কি আজকের ইরান-রাজনীতির ভিত গড়ে দিয়েছে?

ভারতে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করে সরকার, বিশেষ করে ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি (NPPA)। ফলে কোম্পানিগুলি চাইলেই দাম বাড়াতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের এই অতিরিক্ত খরচ নিজেদেরই বহন করতে হচ্ছে। কিন্তু এই ব্যবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ওষুধের দাম ধীরে ধীরে বাড়তে বাধ্য। ইতোমধ্যেই পাইকারি বাজারে ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ার ইঙ্গিত মিলছে।

এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে সেইসব মানুষের উপর, যারা নিয়মিত ওষুধের উপর নির্ভরশীল—ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, হাঁপানি বা সংক্রমণের রোগীরা। কারণ এইসব ওষুধের চাহিদা সর্বাধিক এবং সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও তার প্রভাব দ্রুত বাজারে দেখা যায়। তবে সমস্যা এখানেই শেষ নয়। ভারতের ওষুধ শিল্পে রফতানিও একটি বড় ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলিতে ভারত সস্তা জেনেরিক ওষুধ সরবরাহ করে।

অন্যদিকে, আবার অনেক ক্ষেত্রে অর্ডার কমে যাচ্ছে। ফলে ভারতের ওষুধ রফতানিতে ২,৫০০ কোটি থেকে ৫,০০০ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (GCC) দেশগুলি ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমানের মতো দেশগুলি ভারতের ওষুধের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। কিন্তু এই অঞ্চলই এখন সবচেয়ে বেশি অস্থির। ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ভারতের ওষুধ শিল্প শুধু আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে না, আন্তর্জাতিক বাজারে তার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। কারণ সময়মতো ওষুধ সরবরাহ করতে না পারলে ভবিষ্যতে চুক্তি হারানোর সম্ভাবনাও থেকে যায়।

একদিকে কাঁচামালের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে পরিবহণ ব্যয় আকাশছোঁয়া। তার উপর রফতানি বাজারেও অনিশ্চয়তা। ফলে ভারতীয় ফার্মা ক্ষেত্রে একসঙ্গে একাধিক চাপের মধ্যে রয়েছে। তবে এখনও বাজারে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যায়নি। বেশিরভাগ ওষুধ আগের দামে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সমস্যা হতে পারে, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে প্রশ্ন হলো, বৈশ্বিক সংঘাতের এই যুগে ভারতের মতো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা নিরাপদ? ইরান যুদ্ধ সেই প্রশ্নটাই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।