বিরোধিতা করলেই আয়কর হানা! যেভাবে শাসকের অস্ত্র হয়ে উঠল কাস্টমস আর ইডি
BBC Income Tax Raid Narendra Modi : রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, বিবিসির বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধ’ নিতেই এই আয়কর হানা। আর এটা প্রত্যাশিতও ছিল।

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩। প্রেমের এই বিশেষ দিনে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার মতো ভারতেও বসন্তের হাওয়া ছিল প্রখর। অন্যান্যদিনের মতোই রাস্তাঘাটে ঘুরে, কম্পিউটারে কাজ করতে বসে গিয়েছেন দেশের সাংবাদিকরা। দিল্লি আর মুম্বইয়ে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন বা বিবিসির দফতরেও ব্যস্ততা তুঙ্গে। হঠাৎই এই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দুটি অফিসেই হাজির হল আয়কর দফতর। কেন? আয়কর দরফতরের দাবি, বিবিসির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কর ও টাকা হস্তান্তরের বিষয়ে বেনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তার তদন্ত করতেই এই হানা। কে করল এই অভিযোগ? তার ভিত্তি কী? সেসব অবশ্য জানা যায়নি।
ইতিমধ্যেই বিবিসির কর্মীদের ফোন, ল্যাপটপ বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হয়েছে। এই তদন্ত প্রক্রিয়া এরপরও জারি থাকতে পারে, জানিয়ে দিয়েছে আয়কর দফতর। সত্যিই যদি কোনও অভিযোগ থাকে, তাহলে অবশ্যই তদন্ত করা উচিত। বিবিসিও জানিয়েছে, তারা সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবে। সেসব তো ঠিক আছে। কিন্তু আপাতত এই ইস্যু ঢুকে পড়েছে ভারতের রাজনীতির অন্দরেও। রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, বিবিসির বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধ’ নিতেই এই আয়কর হানা। আর এটা প্রত্যাশিতও ছিল।
এমন দাবির কারণ জানতে পিছিয়ে যেতে হবে কয়েকদিন আগে। যার কেন্দ্রবিন্দুতে বিবিসির বিশেষ একটি ডকুমেন্টারি। এর বিষয়বস্তু আর কেউ নন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ‘ইন্ডিয়া: দ্য মোদি কোয়েশ্চেন’ (India: The Modi Question) নামের ওই তথ্যচিত্রটির মূল বিষয় ছিল গুজরাত দাঙ্গা। পাশাপাশি প্রথমে মুখ্যমন্ত্রী, পরে প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়কালকেও এখানে তুলে ধরা হয়েছে। সেই তথ্যচিত্রে সামনে আসে সাম্প্রদায়িকতা, উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি। তথ্য আর প্রমাণের ভিত্তিতে তৈরি এই ডকুমেন্টারিকে সরাসরি নিশানা করেন শাসকদল বিজেপির নেতারা। ‘চক্রান্ত তত্ত্ব’, ‘ভারত বিরোধী’ ইত্যাদি তকমা সামনে আসতেও সময় লাগেনি বেশি। ভারতের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে এই তথ্যচিত্র সরিয়ে ফেলার নির্দেশও দেওয়া হয়। তারপরেও বেশকিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিবিসির এই বিশেষ তথ্যচিত্রটি দেখানো হয়েছিল। বিরোধীদের বক্তব্য, এতকিছু হওয়ার পর আয়কর হানা তো অবধারিত ছিল!
অবশ্য এটাই প্রথম ও একমাত্র ঘটনা নয়। রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে ব্যবহার করছে বিজেপি ও মোদি – এই দাবি বহুদিন ধরেই জানিয়ে আসছে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল হোক বা দিল্লিতে আপ সরকার – সবারই মূল বক্তব্য এটাই। খেয়াল করে দেখুন, প্রতিটা ক্ষেত্রে অভিযোগগুলো কোথা থেকে উঠে আসছে? মূলত অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি থেকে। শুধু প্রশাসন, কিংবা বিরোধী নেতা নয়, সংবাদপত্র, সামাজিক কর্মী, অনেকের বাড়িতেই বিগত কয়েক বছরে হানা দিয়েছে আয়কর, ইডি, কাস্টমস।
পরিসংখ্যান কী বলছে? ২০২২ সালের মার্চে খোদ অর্থমন্ত্রকের তরফ থেকে একটি রিপোর্ট পেশ করা হয় লোকসভায়। মূলত ইডি, আয়কর হানা নিয়েই এই বিশেষ সমীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানে দেখা গিয়েছে, ২০০৪-২০১৪, এই দশ বছরে মোট ১১২ টি কেসে তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে ইডি। প্রতিটাই বেআইনি অর্থের কারবার নিয়ে। পরবর্তী আট বছরে, অর্থাৎ ২০১৪-২০২২ সালে সেই সংখ্যাটাই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৭৪! মানে, আগেরটার থেকে প্রায় ২৬ গুণ বেশি তল্লাশি অভিযান চলেছে ভারতজুড়ে! সেইসঙ্গে আরও একটি পরিসংখ্যান এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একই সমীক্ষায় এও বলা হয়েছে, ২০১৪-র আগের এক দশকে ১০৮টি কেসের তদন্ত সম্পূর্ণ করে চার্জশিট দিয়েছে ইডি। সেখানে মোদি জমানায় এই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৮৩৯। আপাতদৃষ্টিতে ইউপিএ-র থেকে বেশি হলেও, সামগ্রিক কেস আর তল্লাশি অভিযানের সাপেক্ষে এই সংখ্যাটি কিন্তু বেশ কম!
এর মানে! যতগুলো তদন্ত হচ্ছে, যতবার ইডি-আয়কর হানা হচ্ছে, ততগুলো কেস কিন্তু শেষের মুখ দেখছে না। ২০০৫ সালে প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট লাগু করা হয়। তারপর থেকে অন্তত ৪৭০০ টি কেস হয়েছে। যার মধ্যে শেষ পাঁচ বছরেই হয়েছে প্রায় ২১৮৬ টি কেস। মানে, মূল পরিসংখ্যানের অর্ধেকেরও বেশি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদির আমলে স্বচ্ছ তদন্তের সংখ্যা বেড়েছে। তাই ইডি-সিবিআই-আয়করের সক্রিয়তাও বেড়েছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? মোদি জমানায় মানি লন্ডারিং অ্যাক্টে এখনও অবধি কাঠগড়ায় উঠেছেন কারা?
সনিয়া গান্ধী, সঞ্জয় রাউত, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, চিদম্বরম, শরদ পাওয়ার – এই নামগুলো নিশ্চয়ই চেনা চেনা লাগছে। ভারতে মোদি ও বিজেপির বিরুদ্ধে বারবার এই নেতাদের কথা বলতে দেখা গিয়েছে। তালিকা আরও অনেক দীর্ঘ। তাঁরা প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। এঁদের মধ্যে আরও একটা জিনিসের মিল আছে। বিগত কয়েক বছরে এঁদের বাড়িতে হয় ইডি, নয়তো আয়কর হানা হয়েছে। খেয়াল করে দেখুন, প্রত্যেকেই বিজেপি বিরোধী মুখ হিসেবে পরিচিত। কংগ্রেস, আপ, শিবসেনা হোক কিংবা বাংলার তৃণমূল কংগ্রেস – প্রত্যেকেই মোদির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। ভারতের বেশকিছু রাজ্যে এখনও অ-বিজেপি শাসক ক্ষমতায়। মূলত সেই জায়গাগুলোতেই আঘাত পড়েছে। একের পর এক বিরোধীদের ঘরে হানা দিয়েছে ইডি, আয়কর। কেউ কেউ জেলও খেটেছেন, কিংবা খাটছেন।
কেবল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই নয়। ২০২২ সালেই স্নগবাদ সংস্থা ন্যাশনাল হেরাল্ডের অফিসে হানা দেয় ইডি। কারণ? সেই বেআইনি লেনদেনের তদন্ত! সামাজিক কর্মী, সাংবাদিক, লেখক – অনেকের বাড়িতেই পা পড়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির। অদ্ভুতভাবে, বিজেপি এবং নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার পরই এমন ‘আক্রমণ’ নেমে এসেছে সেখানে। কিংবা আমাদের বাংলার কথাই ধরুন। টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত একটি রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, ইডির তালিকায় একসময় নাম ছিল শুভেন্দু অধিকারী, মিঠুন চক্রবর্তীরও। কিন্তু এখন সেই নামগুলি খুব একটা উল্লেখ করতে দেখা যায় না ইডি-আয়করকে। নারদা মামলা নিয়ে অভিযোগ দায়ের হলেও কোনও এক অদৃশ্য নিয়মে বাদ পড়ে যায় শুভেন্দু অধিকারীর নাম। উল্লেখ্য, একটা সময় শুভেন্দু-মিঠুন দুজনেই তৃণমূল কংগ্রেসের অংশ ছিলেন। আর এখন, বিজেপির নেতা…
তাহলে এটাই এখন রাজনীতির দস্তুর? বিরোধীদের দাবি, গুজরাত দাঙ্গা নিয়ে বিরোধিতার ফল ভুগতে হচ্ছে বিবিসি-কে। বিজেপি নেতারা তো এমনও দাবি করছেন যে, বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ সংবাদ সংস্থা নাকি বিবিসি! ইন্দিরা গান্ধীও নাকি এদের ব্যান করে দিয়েছিলেন! ৭০-র দশকে তৎকালীন কংগ্রেস সরকারেরও রোষানলে পড়ে বিবিসি, এটা ঠিক। শাসকের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করলে, সত্যি কথা বললে, সত্যি ঘটনার কথা তুলে ধরলে তো এমনটাই হয়। শাসক কবে আর মুক্তচিন্তাকে প্রশ্রয় দিয়েছে? কিন্তু বিরোধিতা মানেই ইডি-আয়করের জুজু! হাত মেলালেই নিষ্কৃতি। বিজেপি শাসিত রাজ্যে তাহলে কোনও সমস্যাই নেই! দুর্নীতিই নেই! সেখানে অবশ্য ইডির মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির পা পড়ে না।







