জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী
Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

কমবয়সে জ্যোতির্ময় দত্তকে আমরা মনে করতাম সিআইএ-র এজেন্ট। উনি শিকাগো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, আইওয়া ইউনিভার্সিটির রেসিডেন্ট ছিলেন, এইসব কারণেই বাঁকা নজরে দেখা। আসলে তখন আমরা ছিলাম আগুনখেকো বিপ্লবী। যেকোনো রকম আমেরিকান যোগাযোগই আমাদের কাছে ছিল অপছন্দের। সত্তর দশকের শেষার্ধে বা ওই আশির শুরুতে জ্যোতিদার সঙ্গে আলাপ। এখন আর ঠিক মনে পড়ে না। অসম্ভব স্টাইলাইজড বাচনভঙ্গি ও পড়াশোনার বহর তখন বেশ আকৃষ্ট করেছিল। সিআইএ-র ভূত ততদিনে মাথা ছেড়ে চলে গেছে। দু-চারদিন আড্ডা দিয়ে মনে হয়েছিল জ্যোতিদা বাংলা সংস্কৃতির এহেন সমাজে সত্যিই আন্ডাররেটেড। প্রায় কোনও মূল্যায়নই হয়নি সেভাবে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে বুদ্ধদেব বসুর প্রথম ব্যাচের ছাত্র ও পরবর্তীতে জামাই, এটা কোনো পরিচয়ই নয়।
জ্যোতির্ময় দত্ত তখনকার বিদগ্ধ বাঙালির অবশ্যপাঠ্য দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বাংলা ও ইংরেজি সংবাদপত্রে লিখেছেন দীর্ঘদিন। জ্যোতির্ময় দত্ত কবিতাও লিখেছেন। তাঁর কবিতার বই 'বোম্বেটের গান' যথেষ্ট আলোড়ন ফেলেছিল। তবু বলব জ্যোতিদা গদ্যে ছিলেন অত্যন্ত সাবলীল। যুগান্তর পত্রিকায় তাঁর নিয়মিত কলমে শিল্প-সাহিত্য ও রাজনীতি নিয়ে লেখা পাঠকসমাজে সাড়া ফেলেছিল। যদিও লেখক হিসেবে খুব বেশি লিখেছেন তা নয়। কম বয়সে জ্যোতিদার গদ্যই আপ্লুত করেছিল। আমার কাছে জ্যোতির্ময় দত্তের লেখক, কবি, সাংবাদিক, সংবাদপত্র সম্পাদনা এসব পরিচয়কে ছাপিয়ে উঠেছিল তাঁর অ্যাক্টিভিজম। উনি ছিলেন যাকে বলে অ্যাক্টিভিস্ট। তাঁর 'কলকাতা' সাময়িক পত্র সেই পরিচয় বহন করেছে আগাগোড়া।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

যুবক জ্যোতির্ময় দত্ত
জরুরি অবস্থার সময় 'কলকাতা'র এক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেন জ্যোতিদা। তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ও জরুরি অবস্থার কড়া সমালোচনা ও বিরোধিতার জন্য সম্পাদকের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। দীর্ঘ সময় পালিয়ে বেড়ান পুলিশের হাত থেকে, কেওনঝড় অঞ্চলে আন্ডারগ্রাউন্ডে। শুনেছি দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে থাকাকালীন পুলিশ অ্যারেস্ট করতে এলে তিনতলা থেকে লাফ দেন। তাতে তাঁর পা ভাঙে। পরে তিনি গ্রেফতার হন, ছয় মাস কাটে প্রেসিডেন্সি জেলে। ১৯৭৭-এ মুক্তি পাওয়ার পর মেতে উঠলেন এক অভিনব পরিকল্পনা নিয়ে। কাকদ্বীপ থেকে পালতোলা নৌকা করে পাড়ি দেবেন শ্রীলঙ্কা। সেই মতো দাঁড়ি মাঝি-সহ রওনা দিলেন সেই অবিশ্বাস্য যাত্রায়। সেই অভিযানের খবর রোজ ছাপা হতো সংবাদপত্রে। শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে সে যাত্রা ভেস্তে যায়। কিন্তু এহেন বিচিত্রকর্মা মানুষের আকর্ষণ তখনকার যুবক আমাদের কাছে যে কতটা ছিল তা বলা বাহুল্য।
কবি বিনয় মজুমদার সম্পর্কে জ্যোতিদা ছিলেন প্রবল উচ্চকিত। অসাধারণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন কবি বিনয়কে নিয়ে। একজন কবিকে নিয়ে এরকম বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যাধর্মী আলোচনা বাংলা সাহিত্যে খুব কম লেখা হয়েছে। জীবনানন্দকে নিয়ে তাঁর আলোচনা ও ভাষ্যও সাহিত্য পাঠক ও ছাত্রদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ জ্যোতির্ময় দত্ত লেখালেখির জগত ছাড়িয়েও ছিলেন খ্যাপাটে ও গিমিক প্রিয়। প্রতি শনিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের গাছের তলায় একধরনের শিল্প সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন তিনি। লেখক, শিল্পী, কবি, নাট্যকার, অভিনেতা, চিত্রকররা সেখানে প্রতি শনিবার আসতেন ও অনুষ্ঠান করতেন। সে ছিল এক দেখার মতো ব্যাপার। কলকাতা বইমেলায় এক এক বছর এক এক রকম সাজপোষাকে উপস্থিত হতেন। কখনও কখনও মাথায় ময়ূর কিংবা কাকের পালক লাগিয়ে সাধারণ্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। এতকিছুর মধ্যেই একটা সময় পর্যন্ত নিয়মিত প্রকাশ করতেন 'কলকাতা' পত্রিকা। সম্পাদক হিসেবে তিনি ছিলেন অনন্য এবং অবশ্যই বিতর্কিত।
বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা। তাঁর সঙ্গে আলাপচারি মানেই ছিল তর্ক জমে ওঠা। পরে দীর্ঘদিন আমেরিকায় ছিলেন। শেষ বয়সে দক্ষিণ কলকাতায় থিতু হন। ওঁর স্ত্রী, বুদ্ধদেব বসুর কন্যা মীনাক্ষী দত্ত প্রয়াত হওয়ার পর খুব একা হয়ে পড়েন। শরীরও ভালো যাচ্ছিল না। অবশেষে জ্যোতিদা পাড়ি দিলেন শেষ খেয়ায় এক অনির্দেশ্য যাত্রায়।














