অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব
Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

বিকেলের পড়ন্ত রোদে পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে আড্ডাটা সবে জমে উঠেছে। হঠাতই খবর এল, পাড়ার সবচেয়ে 'তেজস্বী' এবং অহংকারী হিসেবে পরিচিত চ্যাটার্জি বাবুর ছেলেটি বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির চাকরিটা খুইয়েছে। খবরটা শোনার পর আড্ডায় উপস্থিত কয়েকজনের মুখে যে তাৎক্ষণিক অভিব্যক্তি ফুটে উঠল, তাকে ঠিক 'দুঃখ' বলা যায় না। বরং অবদমিত এক অদ্ভুত তৃপ্তির ঝিলিক খেলল কারও কারও চোখে। কেউ বিড়বিড় করে বললেন, "খুব যে ধরাকে সরা জ্ঞান করত, এবার বুঝবে কত ধানে কত চাল!"
এই যে অন্যের পতন বা দুর্ভাগ্য দেখে মনের কোণে জেগে ওঠা এক চিলতে পৈশাচিক আনন্দ—জার্মান ভাষায় একেই বলে 'শ্যাডনফ্রয়ডা' (Schadenfreude)। 'Schaden' মানে ক্ষতি বা দুঃখ, আর 'Freude' মানে আনন্দ। আক্ষরিক অর্থে, অন্যের ক্ষতি দেখে আনন্দিত হওয়া।
বাংলায় হয়তো আমাদের এই অনুভূতির জন্য একক কোনো শব্দ নেই, তবে এর প্রভাব আমাদের মজ্জাগত। আমরা একে 'পরশ্রীকাতরতা'র উল্টো পিঠ বলতে পারি। পরশ্রীকাতরতায় আমরা অন্যের ভালো দেখে হিংসে করি, আর 'শ্যাডনফ্রয়ডা'-তে আমরা অন্যের ক্ষতি দেখে মনে মনে হাসি।
আমরা মৃণাল সেনের 'একদিন প্রতিদিন' ছবিতে দেখতে পাই, যে মেয়ে পুরো বাড়ির যাবতীয় খরচের জোগান দেয়, একদিন তার বাড়ি ফিরতে দেরি হওয়ায় সমাজের সকলের বক্রদৃষ্টির ভয়ে বাড়ির লোক কাউকে তাদের চিন্তার কথা বলতে পারে না। এমনকি, তাদের চিন্তা করার অধিকারও নেই, তারা এই ভয়ে আড়ষ্ট যে, সমাজের লোকে কী বলবে? আর তাদের এই ভয় যে অনর্থক নয়, তা-ও স্পষ্ট ছবিতে। প্রতিবেশীরা মেয়ের পরিবারের সামনে বেশ সমবেদনা দেখালেও, পেছনে তাদের আসল রূপ ধরা পড়ে।

'একদিন প্রতিদিন'-এর প্রতবেশীদের সমালোচনার দৃশ্য
বাঙালির ক্রিকেট প্রেম তো এর এক বড় উদাহরণ। ভারত হারলে আমরা দুঃখ পাই, তার চেয়েও বেশি তৃপ্তি পাই হয়তো পাকিস্তান বা অস্ট্রেলিয়া কোনো ছোট দেশের কাছে মুখ থুবড়ে পড়লে। এই যে অন্যের বিফলতায় আমাদের 'মিষ্টি হাসি', এটাই শ্যাডনফ্রয়ডা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Social Media Language: প্রোফাইল ছবি বদলালে যে ধরনের মন্তব্য করার অভ্যেস হয়েছে, সামনাসামনি দেখা হলে মনে হচ্ছে আসলে নতুন ছবি পোস্ট হয়েছে।
বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা। কোনো সেলিব্রিটির স্ক্যান্ডাল হলে ট্রোলরা অপমানজনক মন্তব্য করে এবং স্বাভাবিক ভাবেই তারপর যখন সেই সেলেব্রিটি রেগে যায়, তখন তা দেখে ট্রোলরা মজা পায়। কোনো সেলিব্রিটির ব্যক্তিগত জীবনের কোনো কেলেঙ্কারি ফাঁস হলে ইন্টারনেটে যে মিম-এর বন্যা বয়ে যায়, তা গণ-শ্যাডনফ্রয়ডা। পর্দার ওপারের মানুষটিকে হেয় করে নেটিজেনদের এক ধরনের অদ্ভুত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে চাওয়া। এই প্রবণতা অনেক সময় নিষ্ঠুরতার সীমানা ছাড়িয়ে যায়, যাকে বলা হয় 'সাইবার বুলিং'। এরকম উদাহরণ আমরা প্রায়শই পেয়ে থাকি।
ট্রোলিং শ্যাডনফ্রয়ডার কারণে সামাজিক মাধ্যমের পরিবেশকে বিষাক্ত করে। ভুক্তভোগীরা ডিপ্রেশন, উদ্বেগ বা আত্মহত্যার চিন্তা পর্যন্ত অনুভব করতে পারেন। এর ফলে ভুক্তভোগীর মনে সমাজের প্রতি বিতৃষ্ণা বাড়তে থাকে, বিশ্বাস হারাতে থাকে। তবে শ্যাডনফ্রয়ডা সবসময় নেতিবাচক নয়—কিছু ক্ষেত্রে এটি ন্যায়বিচারের অনুভূতিও দেয় (যেমন- দুর্নীতিপরায়ণদের শাস্তি দেখে)। কিন্তু ট্রোলিংয়ের ক্ষেত্রে এটি প্রায়শই অযৌক্তিক এবং ক্ষতিকর হয়।
কেন আমরা এমনটা করি? আমরা কি সবাই তবে মনে মনে একটু একটু নিষ্ঠুর?
মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, শ্যাডনফ্রয়ডা কোনো মানসিক ব্যাধি নয়, বরং এটি এক জটিল সামাজিক আবেগ। এর নেপথ্যে কাজ করে মূলত—সামাজিক তুলনা, ন্যায়বিচারের ধারণা এবং হীনম্মন্যতা।
• আমরা নিজেদের অজান্তেই বা হয়তো জেনে বুঝেই ক্রমাগত তুলনা করতে থাকি সমাজের অন্যদের সঙ্গে। আমরা যখন দেখি আমাদের চেয়ে এগিয়ে থাকা কেউ হোঁচট খেয়েছে, তখন অবচেতনে আমাদের নিজেদের অবস্থানটা একটু উপরে উঠে আসে। চ্যাটার্জি বাবুর ছেলের চাকরি যাওয়ায় পাশের বাড়ির কাকুর মনে যে আনন্দ হয়, তা আসলে নিজের ছেলের তুলনায়, চ্যাটার্জি বাবুর ছেলের শ্রেষ্ঠত্ব ঘুচে যাওয়ার স্বস্তি।
• আমরা যাদের শাস্তি পাওয়ার যোগ্য বলে মনে করি, তারা যখন শাস্তি পায় আমরা খুশি হই। মনে করি, এটা 'পোয়েটিক জাস্টিস'। আমরা মনে করি সামনের মানুষটা এই বিপদেরই যোগ্য ছিল। যেমন, কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ যখন জেল খাটেন বা কোনো উদ্ধত খেলোয়াড় যখন শূন্য রানে আউট হন, তখন আমাদের আনন্দ হয়। আমরা ভাবি, "উচিত শিক্ষা হয়েছে!"
• যাদের আত্মবিশ্বাস কম, তারা অন্যের ব্যর্থতায় বেশি আনন্দ পায়। অন্যের পতন তাদের নিজের ব্যর্থতাকে ক্ষণিকের জন্য আড়াল করে দেয়।
তবে কি আমরা খারাপ মানুষ?
বিবর্তনবাদীরা বলেন, এই অনুভূতি আদিম মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের অংশ ছিল। অন্য দলের পতন মানেই নিজের দলের আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ। তবে আধুনিক সভ্য সমাজে একে সরাসরি 'ভালো' বলা কঠিন। কিন্তু স্বীকার করতে বাধা নেই যে, আমরা কেউই এই অনুভূতির ঊর্ধ্বে নই। মনস্তত্ত্ব বলে, অন্যের বিপদে প্রথম যে ভাবনাটি মাথায় আসে, সেটি আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়; কিন্তু তারপর আমরা সেই আনন্দকে কতটা প্রশ্রয় দিচ্ছি—সেটাই আমাদের চারিত্রিক পরিচয় দেয়। শ্যাডনফ্রয়ডা অনেকটা নুনের মতো। খাবারে অল্প স্বাদের জন্য প্রয়োজন, জীবনের সামাজিক সমীকরণেও এটি অলক্ষ্যে মিশে থাকে। কিন্তু এর পরিমাণ বেড়ে গেলে তা মানবিকতাকে গ্রাস করে। অন্যের দুঃখে বিচলিত হওয়ার নামই যদি হয় মনুষ্যত্ব, তবে অন্যের দুঃখে আনন্দ পাওয়াটা অন্তত সেই মনুষ্যত্বের অভাবকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
তাই, এর পরের বার যখন কারও খারাপ খবরে মনের ভেতরে একটা হালকা চিলতে হাসি অনুভব করবেন, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার প্রশ্ন করবেন—এই আনন্দ কি আপনার শ্রেষ্ঠত্বের, নাকি আপনার নিজেরই কোনো অতৃপ্তির ছায়া? উত্তরটা হয়তো আপনাকে একজন আরও ভালো মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করবে।শ্যাডনফ্রয়ডা মানুষের জটিল মনের একটি অংশ, যা প্রতিযোগিতা এবং ন্যায় থেকে উদ্ভূত। এটি স্বাভাবিক হলেও, সহানুভূতি বাড়িয়ে আমরা আরও ভালো সমাজ গড়তে পারি।














