অহিংসার আলোয় পরিবেশ: মহাবীরের চিরন্তন বার্তা

মহাবীরের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল অহিংসা একটি নীতি যা কেবল মানুষের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, সমগ্র জীবজগতের প্রতি সমানভাবে প্রযোজ্য।

S N Chakraborty
৪ মিনিট
অহিংসার আলোয় পরিবেশ: মহাবীরের চিরন্তন বার্তা

আজ মহাবীর জয়ন্তী, এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিন, যা কেবলমাত্র ধর্মীয় অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানবসভ্যতার নৈতিক বিবর্তন এবং পরিবেশচিন্তার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে মহাবীর-এর জীবন ও দর্শন আজকের পৃথিবীর জলবায়ু সংকট, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় এবং ক্রমবর্ধমান পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তাঁর শিক্ষা যেন সময়ের সীমানা অতিক্রম করে আমাদের বর্তমান বাস্তবতায় এসে দাঁড়ায়, এক অনিবার্য দিশারীর মতো।

মহাবীরের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল অহিংসা একটি নীতি যা কেবল মানুষের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, সমগ্র জীবজগতের প্রতি সমানভাবে প্রযোজ্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি জীবই বাঁচতে চায়, এবং সেই বেঁচে থাকার অধিকার সকলের জন্য সমান। এই ভাবনা আধুনিক পরিবেশবাদের সঙ্গে গভীরভাবে সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে জীববৈচিত্র্যের প্রতিটি উপাদানকে একটি অপরিহার্য সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বনভূমি ধ্বংস, প্রাণীদের আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া কিংবা নির্বিচারে সম্পদ আহরণ এসবের বিরুদ্ধে তাঁর নীরব কিন্তু দৃঢ় অবস্থান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চোখের নিমেষে শেষ হচ্ছে জলাভূমি: আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব?

World Wetlands Day: বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, গত পঞ্চাশ বছরে পৃথিবীর মোট জলাভূমির প্রায় ৩৫ শতাংশ হারিয়ে গেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বনাঞ্চলের তুলনায় জলাভূমি ধ্বংসের হার তিন গুণ বেশি।

তাঁর জীবনের নানা ঘটনায় এই দর্শনের বাস্তব প্রয়োগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সন্ন্যাসগ্রহণের পর দীর্ঘ সময় তিনি অরণ্যে তপস্যায় লিপ্ত ছিলেন। কিন্তু সেই অরণ্যে অবস্থান করেও তিনি কখনো প্রকৃতির উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাননি। গাছের পাতা অকারণে ছিঁড়ে নেওয়া থেকে শুরু করে আশ্রয়ের জন্য প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এসব থেকে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ বিরত রেখেছিলেন। বলা হয়, তিনি এমনভাবে বসতেন বা চলাফেরা করতেন যাতে কোনো ক্ষুদ্রতম প্রাণীও তাঁর কারণে আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। এমনকি তপস্যার সময় শরীরে পিঁপড়ে বা অন্যান্য কীটপতঙ্গ উঠে এলেও তিনি তাদের সরিয়ে দেননি। এই সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতা কেবল এক সাধকের আত্মসংযম নয়, বরং জীবনের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাবোধের প্রকাশ।

মহাবীরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল অপরিগ্রহ অর্থাৎ সীমিত ভোগ ও আসক্তির পরিহার। তাঁর মতে, অতিরিক্ত সংগ্রহ ও ভোগ মানুষের মনকে আবদ্ধ করে এবং প্রকৃতির উপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে। আধুনিক ভোক্তাবাদী সমাজে এই শিক্ষা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আজ যখন প্রাকৃতিক সম্পদের অযৌক্তিক ব্যবহার, অতিরিক্ত উৎপাদন এবং অপচয় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে, তখন মহাবীরের অপরিগ্রহের ধারণা টেকসই জীবনযাপনের একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কম ভোগ মানেই কম দূষণ, কম সম্পদ আহরণ এবং প্রকৃতির সঙ্গে একটি সুস্থ সহাবস্থান।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বৌদ্ধ ধর্মেই লুকিয়ে পরিবেশ বাঁচানোর মূল মন্ত্র? কী বলছে গবেষণা

Environment: পরিবেশ সম্পর্কে ভাবতে গেলে সেখানে অনুভূতির দরজা খুলে পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের কথা বারবার উল্লেখ করেছেন গৌতম বুদ্ধ।

জল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাঁর সংযম লক্ষণীয় ছিল। তিনি অপ্রয়োজনীয়ভাবে জল ব্যবহার করতেন না এবং জলাশয়ের জীবদের ক্ষতি না করার জন্য সর্বদা সতর্ক থাকতেন। এই আচরণ আজকের জলসংকটপূর্ণ পৃথিবীতে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি দায়িত্বশীলতা কেবল নীতির বিষয় নয়, এটি প্রতিদিনের জীবনের একটি অপরিহার্য অনুশীলন।

মহাবীর প্রকৃতিকে কখনো মানুষের অধীনস্থ কোনো উপাদান হিসেবে দেখেননি; বরং তিনি মানুষকে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক পরিবেশদর্শনের ecocentric ধারণার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি সমানভাবে মূল্যবান এবং পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। তাঁর এই চিন্তাধারা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির সঙ্গে সংঘর্ষ নয়, বরং সহাবস্থানই মানবসভ্যতার টিকে থাকার একমাত্র পথ।

বর্তমান সময়ে, যখন আমরা জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে নানা নীতি, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক চুক্তির উপর নির্ভর করছি, তখন মহাবীরের সরল জীবনদর্শন আমাদের এক ভিন্ন পথের সন্ধান দেয়। সেই পথ প্রযুক্তিনির্ভর নয়, বরং নৈতিক ও মানসিক রূপান্তরের উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি দেখিয়েছিলেন, পরিবর্তনের সূচনা বাহ্যিক জগতে নয়, মানুষের অন্তরে।

নির্মল প্রভাতের আলোয় যখন পৃথিবী নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে তোলে, যখন বাতাসে মিশে থাকে এক অপার্থিব প্রশান্তি, তখনই যেন তাঁর স্মৃতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর আবির্ভাব কেবল একটি ধর্মীয় ইতিহাস নয়; এটি মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং পরিবেশ সচেতনতার এক চিরন্তন আহ্বান। আজকের এই দিনে তাঁর দর্শন যদি আমাদের চিন্তা ও আচরণের মধ্যে সামান্য হলেও প্রতিফলিত হয়, তবে হয়তো আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি আরও সবুজ, সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী নির্মাণের পথে এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারব।

লিখেছেন
S N Chakraborty
S N Chakraborty
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সাত দিনের ব্যবধানে দুটো ঘূর্ণিঝড়: জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা কি এটাই?

Climate change impact on cyclone: ২৮ অক্টোবরে অন্ধ্র উপকূলে আছড়ে পড়ে অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, ঠিক সাত দিন পর ৩ নভেম্বরে ল্যান্ডফল করে ‘মুরাসু’। আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, এই পিঠোপিঠি ঝড়ের ঘটনাকে বলা হয় ‘ক্লাইমেটোলজিক্যাল অ্যানোমালি'। বঙ্গোপসাগরের এই ‘ওভার-এনার্জাইজড’ অবস্থাই, এখন জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা।

কোথায় আছড়ে পড়ল ঘূর্ণিঝড় মুরাসু, কতটা ক্ষয়ক্ষতি, বাংলায় কী প্রভাব?

Cyclone Murasu: ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাব কাটতে না কাটতেই বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড় মুরাসু। মঙ্গলবার ভোরে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়ে শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড়। নেল্লোর, প্রকাশম ও বাপটলা জেলায় গাছ উপড়ে পড়েছে, নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়েছে। তামিলনাড়ু ও ওড়িশাতেও ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতা জারি হয়েছে। বাংলায় কতটা প্রভাব ফেলবে মুরাসু?

ভুটানে হড়পা বানের জেরে উত্তরবঙ্গে আতঙ্ক, কী পরিস্তিতি এখন?

Bhutan Flash Flood: ভুটানের শিনতাফু হ্রদ ভেঙে হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তা ও পর্যটনকেন্দ্রের পরিকাঠামো। বন্যার আশঙ্কায় আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রামে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরানোর উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। শুক্রবার সকালে সংকোশ নদীর জলস্তর না বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি ফেরে। পরিস্থিতি এখন কেমন?

মাত্র ১০০ বই থেকে ১০ হাজার! অসমের চা-বাগানের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন অনিন্দিতা

Assam Library Initiative: মাত্র ১০০টি বই নিয়ে ২০২০ সালে অসমের চা-বাগান এলাকার শিশুদের জন্য লাইব্রেরি শুরু করেছিলেন অনিন্দিতা গগৈ। আজ তিনটি লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। পরিবারের ৪০ লক্ষ টাকারও বেশি বিনিয়োগে এগিয়ে চলেছে এই উদ্যোগ। কীভাবে শিশুদের পড়াশোনা ও সৃজনশীলতার সুযোগ তৈরি করছেন অনিন্দিতা?

Cyclone Arnab: কোথায় আছড়ে পড়ল অর্ণব, কতটা ক্ষয়ক্ষতি? বাংলায় কতটা প্রভাব?

Cyclone Arnab: অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া, ভারী বৃষ্টি ও জল জমার জেরে বিপর্যস্ত একাধিক এলাকা। ৮৪ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো হয়েছে। বাংলার কোন কোন জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, আর কতটা প্রভাব পড়তে পারে ঘূর্ণিঝড়ের?

অ্যানথ্রোপিকের মতো এআই সংস্থাগুলি যেভাবে হয়ে দাঁড়াচ্ছে জলবায়ু সংকটের কারণ

The AI Carbon Bill: অ্যানথ্রোপিকের আইপিও ফাইলিংয়ে জলবায়ু পরিবর্তনকে বড় ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। ডেটা সেন্টার ঠান্ডা করতে বিদ্যুৎ-জলের ব্যয় বাড়ছে। ২০২৫-এ ডেটা সেন্টারগুলিতে ঘণ্টা প্রতি বিদ্যুৎ ব্যবহার, ৪৪৮ টেরাওয়াটে পৌঁছবে।

লুলার জয়ের পরেও কেন স্বস্তিতে নেই 'পৃথিবীর ফুসফুস' আমাজন?

lula's amazon policy: প্রথম পর্বে পিছিয়ে থাকার পর, কুড়ি দিনে এক কোটিরও বেশি ভোট বাড়িয়ে লুলা দা সিলভা চতুর্থবার ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। লুলার আমলে, আমাজনের জঙ্গল উজাড় হওয়া ৭১% কমেছে, তবু আইনসভায় ডানপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি হওয়ায়, আমাজনের সংকটজনক সীমার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেলই।

ঘূর্ণিঝড় অর্ণব : কোথায় রয়েছে, বাংলায় কতটা দুর্যোগের আশঙ্কা?

Cyclone Arnab: বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়িয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে অর্ণব। বুধবার অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে এই ঝড়। সরাসরি বাংলায় আঘাত না হানলেও মঙ্গলবার থেকে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উত্তরবঙ্গেও বৃষ্টি হতে পারে। কোন কোন জেলায় দুর্যোগের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি?