বারবার বিচ্যুতি, প্রযুক্তির ঘাটতি না কি নেহাত গাফিলতি? মমতার নিরাপত্তায় ফাঁক ঠিক কোথায়

রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান তিনি। নিজেকে ‘স্ট্রিট ফাইটার’ বলে মানলেও, ভিড়ের মধ্যে ঢুকে আবেগ মেপে নিতে চাইলেও, তাঁর নিরাপত্তার দিকটি মাথায় রাখতেই হয়। তাই বাড়ি হোক বা দপ্তর, সরকারি অনুষ্ঠান হোক বা রাজনৈতিক সভা, বজ্র-আঁটুনি নিরাপত্তার বলয় ঘিরে থাকে তাঁকে। কিন্তু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তায় উদ্বেগজনক ফাঁক ধরা পড়ল। নবান্নের চোদ্দ তলায় নয়, নন্দীগ্রামের রানিচকে নয়, খাস কলকাতার বুকে তাঁর কালীঘাটের বাড়িতেই ঘটল ‘অনুপ্রবেশ’। দেওয়াল টপকে শুধু ঢুকে পড়া নয়, জামার ভেতর নিয়ে সাত ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বাড়ির মধ্যেই কাটিয়ে দিলেন অনুপ্রবেশকারী। সদা-সতর্ক, উচ্চমানের প্রশিক্ষণ পাওয়া কম্যান্ডো থেকে নিরাপত্তারক্ষী, কেউ তা টেরও পেলেন না। শুধু তাই নয়, সকালে বিষয়টি গোচরে আসার পরও, গাফিলতির দায় স্বীকারেও ব্যয় হলো দীর্ঘ সময়। পদাধিকারী অফিসারকে সরিয়ে, নিরাপত্তা বাড়িয়ে ‘ভুল’ সংশোধন চলছে যদিও, কিন্তু রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের নিরাপত্তায় চূড়ান্ত গাফিলতি, পুলিশ তথা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার করুণ চিত্রই তুলে ধরছে।
কয়েকদিন আগেই মমতার এলাকা, ভবানীপুরের তথাকথিত অভিজাত এলাকায় রোমহর্ষক খুনের ঘটনা গিয়েছিল। সেই সময়ই ভবানীপুরের মতো এলাকায়, যেখান থেকে মমতা, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ রাজ্যের বেশ কয়েকজন নেতা-মন্ত্রীর বাড়ির দূরত্ব কয়েকশো মিটার মাত্র, সেখানে এমন ঘটনায় সাধারণের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। সেই ভয়াবহতা বিস্মৃত হওয়ার আগেই খাস মমতার কালীঘাটের বাড়িতে ‘অনুপ্রবেশ’ ঘটল আগন্তুকের।তা-ও আবার নিরাপত্তার দুর্ভেদ্য বলয় পার করে, দেওয়াল টপকে, সঙ্গে লোহার রড নিয়ে। ২ জুলাই রাত ১টা বেজে ২০ মিনিট নাগাদ দেওয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন হাসনাবাদের বাসিন্দা, ৩১ বছরের হাফিজুল মোল্লা। সকাল ৮টায় নিরাপত্তারক্ষীদের শিফট বদলের সময় টহলদারি দিতে গেলে পুলিশের নজর পড়ে তাঁর ওপর। ধরে-বেঁধে তল্লাশি নিতে জামার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে লোহার রড। অনুপ্রবেশকারী মানসিকভাবে অসুস্থ, মমতাকে ভালবাসেন, আগে নবান্নেও গিয়েছিলেন বলে তাঁর পরিবার দাবি করলেও, পুলিশের দৃঢ় বিশ্বাস, ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্য নিয়েই মমতার বাড়িতে ঢুকেছিলেন তিনি।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ভিভিআইপি হিসেবে গণ্য হন মমতা। পান জেড প্লাস ক্যাটেগরির নিরাপত্তা। ২৪ ঘণ্টা তাঁর বাড়িতে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা মোতায়েন রাখার বিধি রয়েছে। মমতার সঙ্গে সর্বক্ষণ ৩০ জনের বেশি নিরাপত্তারক্ষী থাকেন, যাঁদের মধ্যে কমপক্ষে ১০ জন উচ্চমানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এছাড়াও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বন্দোবস্ত রয়েছে। ঘুরিয়েফিরিয়ে দিনভর সব মিলিয়ে প্রায় ১৫০ জন কর্মী-আধিকারিক তাঁর নিরাপত্তায় মোতায়েন থাকেন। তাতেই আরও বেশি করে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে পুলিশকে। খাতায়-কলমে রাতেও মমতার বাড়ি ঘিরে রাখার কথা। সজাগ থাকার কথা পুলিশ এবং নিরাপত্তারক্ষীদের। এই নিরাপত্তা-বেষ্টনীর দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা হয়নি বলেই কি এতবড় বিচ্যুতি ঘটল, উঠছে প্রশ্ন। সরকারি বাসভবনে না থেকে নিজের বাড়িতে থাকেন মমতা। তিনি যে ঘরে থাকেন, সেখান থেকে মেরেকেটে ১০ ফুট দূরে হাফিজুল লুকিয়ে ছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর ভাই কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই রাতে কোনও কারণে মমতা ঘর থেকে বেরোলেই অঘটন ঘটে যেতে পারত বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। এর পিছনে বৃহত্তর ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে সন্দেহ তাঁর। নিরাপত্তায় গাফিলতির জন্য সরাসরি কাঠগড়ায় তুলেছেন পুলিশকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গ্রামে-গঞ্জে গেরুয়া শিবির যেভাবে শিকড় বিস্তার করছে, তাতে বেকায়দায় পড়েছে দল। তাই এই সময় বিজেপি-র কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট হাতছাড়া হতে দেওয়া কাম্য নয় বলেই হয়তো মহুয়ার থেকে দূরত্ব বাড়িয়েছেন দলীয় নেতৃত্ব।
শুধু কার্তিকই নন, মমতার নিরাপত্তায় ঘাটতি নিয়ে সরব হয়েছেন বিরোধী দলের নেতারাও। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও, তিনি যখন গোটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, সেক্ষেত্রে তাঁর নিরাপত্তা সকলেরই মাথা ব্যথার কারণ। তাই কেউ কেউ ‘গিমিক’ বলে কটাক্ষ করলেও, কেন এমন ঘটনা ঘটল, কার দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় ঘটল, প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী শিবিরের অনেকেই। যেখানে মুখ্যমন্ত্রী নিরাপত্তাহীন, রাজ্যের মানুষের নিরাপত্তা কোথায়, উসকে দিয়েছেন এই প্রশ্নও। পুলিশ বিভাগ নিজের হাতে রেখেছেন মমতা। তাই এই বিচ্যুতি নিয়ে তাঁর বিবৃতিও দাবি করেন কেউ কেউ। মমতা যদিও এযাবৎ ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে মৌনতাই বজায় রেখেছেন। তবে জল যে অনেক দূর গড়িয়েছে, তার প্রমাণ মিলেছে ইতিমধ্যেই। মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বিবেক সহায়কে। তাঁর জায়গায় বসানো হয়েছে দেশের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব-পালনকারী সরকারি সংস্থা স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসা আইপিএস অফিসার পীযূষ পান্ডেকে। তিনি এসেই ত্রুটি-বিচ্যুতি সামাল দিতে নেমে পড়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা আরও আঁটোসাটো করতে প্রথমেই কালীঘাটে তাঁর বাড়ির দেওয়ালের উচ্চতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ইট-পাথরের দেওয়ালের পাশাপাশি, পিছন দিক থেকে বাড়ি ঘিরে দেওয়া হবে ১৩ থেকে ১৪ ফুট উঁচু অ্যালুমিনিয়ামের শিট দিয়ে। বাড়ির কাছাকাছি বসানো হবে দু’টি ওয়াচটাওয়ার, একটি আলিপুর জেলের কাছে, অন্যটি বলরাম ঘাটের কাছে। প্রতি শিফটে পুলিশকর্মীর সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে। সিসিটিভি-তেও সর্বক্ষণ নজরদারি চলবে। মোবাইল ফোন নিয়ে কালীঘাটে মমতার বাড়িতে ঢুকতে পারবেন না নিরাপত্তায় মোতায়েন পুলিশকর্মীরা। মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে পা রাখতে পারবেন না নবান্নেও। কাজের সময় মোবাইল ঘাঁটাঘাঁটিতেই তাঁরা অমনোযোগী হয়ে পড়ছেন বলে মত প্রশাসনিক আধিকারিকদের। একই সঙ্গে কালীঘাটে মমতার বাড়িতে এবং নবান্নে ঢোকা-বেরনোর ক্ষেত্রে নাম নথিভুক্তিকরণের পদ্ধতিতেও আনা হচ্ছে বদল।
যদিও তাতেও নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না অনেকেই। কারণ এই প্রথম নয়, এর আগেও একাধিকবার মমতার নিরাপত্তা লঙ্ঘিত হওয়ার ঘটনা চোখে পড়েছে। এই বছরই বগটুই হত্যাকাণ্ডের পর রাজ্য পুলিশের ডিজি-সহ শীর্ষ কর্তাদের নিয়ে সেখানে যান মমতা। পীড়িতদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন দাঁড়িয়ে। মমতা যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন সকলের সঙ্গে, কয়েকদিন পর সেখান থেকে সোয়া একশো মিটার দূরত্বে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হয় বোমা। সেগুলি ঢের আগে থেকে পোঁতা ছিল বলে জানা যায়। মুখ্যমন্ত্রী যাওয়ার আগে কেন আশপাশ খতিয়ে দেখা হল না, উঠে আসে প্রশ্ন। একইভাবে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে এসে নন্দীগ্রামে আহত হন মমতা। তাঁর পায়ের ওপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে নিজে জানান তিনি। তারপর হুইলচেয়ারে বসেই প্রচার সারতে হয় তাঁকে। সেই ঘটনার সময়ও মমতার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন বিবেক। কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে সরিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। পরে ফের পদে ফিরিয়ে আনা হয়।
এছাড়াও, ২০১৮ সালে হেমতাবাদের সভায় ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ভেদ করে মমতার মঞ্চে উঠে পড়েন এক মহিলা। ২০১৩ সালে কামদুনি থেকে ফেরার পথে টানা দু’ঘণ্টা নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন বলে জানিয়েছিলেন নিজেই। বারবার তাঁর নিরাপত্তায় গাফিলতি দেখা গিয়েছে। তাই নিরাপত্তা জোরদার করলেও, আগামী দিনেও এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না বলে নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না কেউই।







