জুলাই আন্দোলন থেকে ৬ আসনে জয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কতটা প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে পারবে এনসিপি?

NCP wins six seats Bangladesh 2026: এনসিপির সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ— একদিকে সংসদে কার্যকর বিরোধী বা নীতিনির্ভর অবস্থান তৈরি করা, অন্যদিকে সাংগঠনিক বিস্তার ও আদর্শগত স্পষ্টতা বজায় রাখা।

inscript
৩ মিনিট
জুলাই আন্দোলন থেকে ৬ আসনে জয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কতটা প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে পারবে এনসিপি?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয়টি আসনে জয় পেয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। দলটির শীর্ষ ছয় নেতা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন বলে নিশ্চিত হয়েছে।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জয় লাভ করেছেন ঢাকা-১১ আসনে। সদস্য সচিব আখতার হোসাইন নির্বাচিত হয়েছেন রংপুর-৪ থেকে। দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ জয়ী হয়েছেন কুমিল্লা-৪ আসনে। এছাড়া নোয়াখালী-৬ আসনে যুগ্ম সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ, কুড়িগ্রাম-২ আসনে যুগ্ম আহ্বায়ক আতিকুর রহমান মুজাহিদ এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে যুগ্ম সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল আমিন জয় পেয়েছেন।

এই ছয়জনই দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা; ফলে সংসদে এনসিপির উপস্থিতি কেবল সাংগঠনিক নয়, রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে সংস্কারপন্থী নাগরিক প্ল্যাটফর্ম থেকে এনসিপির জন্ম। শুরু থেকেই দলটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার, নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্য, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাংলাদেশ নির্বাচনের ফলাফল যে শিক্ষা দিল

Bangladesh Election Result: নির্বাচনটি বিএনপির জন্য একপ্রকার ‘স্ট্রেস টেস্ট’ হিসেবে কাজ করেছে, বিশেষত জামায়াত ও তার সংশ্লিষ্টদের অপ্রত্যাশিত ভোট ও আসন বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে। ফলাফলের মানচিত্র ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি হয়ত আরও খণ্ডিত, দরকষাকষি নির্ভর এবং আসনকেন্দ্রিক এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

এনসিপির ৩৬ দফার নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল, জুলাই গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা-সহ অতীতে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং এ লক্ষ্যে একটি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন করা হবে। দলটি ভোটাধিকারের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ বছর করার প্রস্তাব দেয়, যাতে তরুণেরা দ্রুত নাগরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করতে পারে। পাশাপাশি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা নির্ধারণ, চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধে ৯৯৯-এর আদলে হটলাইন চালু ও জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন, সব প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ বেতনে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ও এক মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করা এবং বাংলাদেশকে আসিয়ানে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ইশতেহারে করা হয়। এনসিপি নিজেদের ‘কেন্দ্রপন্থী সংস্কারবাদী’ দল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে।

জামায়াতের সঙ্গে জোট ও ভাঙন

নির্বাচনের আগে কৌশলগত সমঝোতার ভিত্তিতে এনসিপি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন সমন্বয়ে যায়। উদ্দেশ্য ছিল বিরোধী ভোটের বিভাজন ঠেকানো এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট আসনে জয়ের সম্ভাবনা বাড়ানো।

তবে এই জোট ঘোষণার পর দলটির ভিতরে মতবিরোধ তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নের কিছু প্রগতিশীল ও নাগরিকমুখী নেতা জোটের বিরোধিতা করে দল থেকে সরে দাঁড়ান। তাঁদের অভিযোগ ছিল, আদর্শগত দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও কৌশলগত জোট দলটির মূল অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যদিও দলীয় নেতৃত্ব বলেছে, এটি ছিল

নির্বাচনী সমঝোতা, আদর্শিক একীভবন নয়।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ৫০টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয় এবং মোট ২,০২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এনসিপি নিজস্ব প্রতীক নিয়ে ৩০ আসনে প্রার্থী দিলেও সবকটিতে জোটভিত্তিক সমন্বয় ছিল। নির্বাচন শেষে ছয়টি আসনে জয় পেয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে দলটি। এবার মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হয়। এসব কেন্দ্রে ছিল ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ।

জাতীয় পর্যায়ে বড় দলগুলোর আধিপত্যের মধ্যেও নতুন দল হিসেবে এনসিপির ছয় আসনে জয়কে তাৎপর্যপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ— একদিকে সংসদে কার্যকর বিরোধী বা নীতিনির্ভর অবস্থান তৈরি করা, অন্যদিকে সাংগঠনিক বিস্তার ও আদর্শগত স্পষ্টতা বজায় রাখা। জামায়াতের সঙ্গে জোট-পরবর্তী বিতর্ক দলটির জন্য ভবিষ্যতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ছয়টি আসনে জয়— এনসিপির জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ, যা ভবিষ্যতের সমীকরণে দলটিকে প্রাসঙ্গিক রাখবে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।