ছেলে নিহত হাতির হানায়, সাপের সঙ্গে বাস! 'জঙ্গলের মা' কেমন আছেন?

গাছের সবুজটুকু শরীরে দরকার

আরোগ্যের জন্য ওই সবুজের ভীষণ দরকার

-শক্তি চট্টোপাধ্যায়

 

গাছেদের নিয়েই তাঁর সংসার, সুখ-দুঃখ। দিনের শেষে তাঁর দরকার 'গাছ দেখে যাওয়া'। তিনি লক্ষ্মীকুট্টি আম্মা। তিরুবনন্তপুরমের পোনমুডির কাছে অবস্থিত কল্লার জঙ্গলেই তাঁর বসবাস। শেষ ৪৬ বছর জঙ্গলের ঔষধি গাছ তুলে মানুষের চিকিৎসা করেই দিন কেটেছে তাঁর। প্রকৃতির প্রতি তাঁর অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে দিয়েছে পদ্মশ্রী সম্মান।

'জঙ্গলের মা' লক্ষ্মীকুট্টি আম্মার জীবন ও বেড়ে ওঠা কেরলের কানি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যেই। জঙ্গলের মধ্যেই এক ছোট বাড়িতে আম্মার বসবাস। তাঁকে ঘিরে আছে কয়েকশো ভেষজ গাছ। প্রায় পাঁচশো প্রজাতির ভেষজ-ঔষধি গাছ ও তার গুণাগুণ আম্মার মগজস্থ। কিন্তু কীভাবে এই প্রকৃতির সন্তানদের মা হয়ে উঠলেন আম্মা? আম্মার মা-ও ছিলেন একজন ভেষজ ঔষধ বিশেষজ্ঞ। এই প্রসঙ্গে আম্মা বলেন, "মা মারা যাওয়ার আগে তাঁর এই জ্ঞান আমাকে দিয়ে গিয়েছেন। মা-ই আমাকে প্রকৃতিকে দেখতে শিখিয়েছেন। আমাদের সবরকম রোগের ওষুধই প্রকৃতির মাঝখানে আছে। এমনকী, মাছ বা অন্যান্য পশুর মধ্যেও কিছু গুণাগুণ আছে।"

আম্মার স্বামী মারা গিয়েছেন বছরদুয়েক। তিন সন্তানের মধ্যে দু'জন আর বেঁচে নেই। এক ছেলে রেলে চাকরি করে। বাকি দুই সন্তানকে না বাঁচাতে পারার আক্ষেপ ঝরে পরে আম্মার গলায়।

আরও পড়ুন: হাতে তির-ধনুক, না মাওবাদী নন, অস্ত্র হাতে গাছ বাঁচাচ্ছেন এই আদিবাসী মেয়েরা

"যে জঙ্গলের মধ্যে আমি থাকি, সেখানে গাড়ি পৌঁছনোর কোনও রাস্তা নেই। ১৯৫২ সালে সরকার রাস্তা নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছিল। কিন্তু এখনও অবধি রাস্তা হয়ে ওঠেনি। রাস্তা না থাকায় আমার দুই ছেলেকেও সঠিক সময়ে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারিনি। বিষক্রিয়া হলে যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা যাবে তত তাড়াতাড়ি বাঁচানো যায় রোগীকে।" আম্মা বলেন। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে থাকা বেশিরভাগ মানুষই এই বিষয়ে দেরি করে ফেলে। আর তাদের জন্যই আম্মা প্রকৃতির ওষুধের ভান্ডার আগলে অপেক্ষা করেন। পদ্মশ্রী সম্মান পাওয়ার পর আম্মার বাড়িতে রোগীর ভিড় আরও বেড়েছে। নিজের রাজ্যের বাইরে অন্য রাজ্য থেকেও আম্মার কাছে রোগীরা আসেন। আম্মার বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই রয়েছে ১৫০ রকমের ভেষজ কাজ, যা বিষধর সাপের কামড় খাওয়া প্রায় ৩৫০ জন মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।

পঁচাত্তর বছর বয়সেও আম্মা প্রত্যেকদিন ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠেন। উঠেই তাঁর প্রথম কাজ জঙ্গলে যাওয়া। জঙ্গলের ভেতর থেকে বিভিন্ন গাছ পরীক্ষা করে নিজে হাতে তুলে আনেন ভেষজ ওষুধ। বাড়ি ফিরে ভেষজ প্রক্রিয়ায় তৈরি করেন ওষুধ। এর মাঝেই রোগী দেখার ভিড় সামাল দিতে হয় আম্মাকে।

আম্মার জঙ্গলের সঙ্গে এই নাড়ির টান ৪৬ বছরের। আম্মার বাড়ির উঠোনেই বিষাক্ত সাপেদের বসবাস। এই ব্যাপারে আম্মা নির্ভীক। বলেন, "ওদের সঙ্গেই আমার বসবাস। আমি প্রকৃতির সব আপন করে নিয়েছি। ওরাও আমাকে আপন করে নিয়েছে‌।"

এই সবকিছুর পাশাপাশি আম্মা কবিতা এবং নাটক লেখেন। স্থানীয় লোকসংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। এছাড়াও আম্মা সংস্কৃত চর্চা করেন। এখানকার আদিবাসীদের জীবনযাপন নিয়ে আম্মা বলেন, "আমার বড় ছেলে হাতির আক্রমণে মারা যায়। কিন্তু আদিবাসীরা জানে কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে বেঁচে থাকা যায়। প্রাকৃতিক যে কোনও বিপর্যয়ের সঙ্গে আদিবাসীরা যেভাবে মোকাবিলা করতে পারে সেরকম কেউই পারে না। কারণ আমরা প্রকৃতির মেজাজমর্জি সবচেয়ে ভালো বুঝি।"

আম্মার যে ছেলে রেলে কাজ করে, সে মাকে তাঁর কাছে নিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু এতে আম্মার ঘোর আপত্তি। আম্মা বলেন, "আমি এখান থেকে শহরে গিয়ে বাস করতে পারব না। আর আমার মনে হয়, আমি যদি প্রকৃতির কোনও ক্ষতি না করি, প্রকৃতিও আমাদের কোনও ক্ষতি করবে না। এই সহাবস্থানের ওপরেই আমরা বেঁচে আছি।"

চারপাশে যখন প্রতিনিয়ত বৃক্ষনিধন যজ্ঞ চলছে , 'শহরের অসুখ যখন হাঁ করে কেবল সবুজ খায়' তখন লক্ষ্মীকুট্টি আম্মা বুকে আগলে জঙ্গল রক্ষা করেন মায়ের মমতায়।

 

 

More Articles

;