হাতে তির-ধনুক, না মাওবাদী নন, অস্ত্র হাতে গাছ বাঁচাচ্ছেন এই আদিবাসী মেয়েরা

আজ গ্রামে গ্রামে সচেতনতা বৃদ্ধির ভাষণ দেন যমুনা। গড়ে তুলেছেন প্রায় ১৫০টিরও বেশি জঙ্গল প্রতিরক্ষা কমিটি।

Sindhu Som
৪ মিনিট
হাতে তির-ধনুক, না মাওবাদী নন, অস্ত্র হাতে গাছ বাঁচাচ্ছেন এই আদিবাসী মেয়েরা

“গাঁও ছোড়াব নেহি, জঙ্গল ছোড়াব নেহি, মায় মাটি ছোড়াব নেহি লড়াই ছোড়াব নেহি”- এক সময় দলিত-আদিবাসী নারী-পুরুষের মুখে মুখে এই গান ভাসত। আদিবাসীদের জঙ্গল দখল, বাসস্থান দখল এদেশে নতুন না। প্রসঙ্গত মনে করা যেতে পারে চিপকো আন্দোলনের কথা। মীরা বেনই প্রথম লক্ষ করেন, পাহাড়ে বন্যা-পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়ংকর হয়ে উঠছে। তার অন্যতম কারণ ছিল স্থানীয় ওক জাতীয় গাছপালা কেটে সাফ করে বিদেশি পাইনজাতীয় বন তৈরি করা। এই ব্যবসাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে পঙ্গু করে দিচ্ছিল স্থানীয় জনজীবন। ‘গোপাল আশ্রম’ নামে একটি নতুন আশ্রম খোলেন মীরা বেন, শুরু হয় চিপকো আন্দোলন। গাছ জড়িয়ে গাছ কাটতে দেব না বলার পদ্ধতি কিন্তু নতুন নয়, ৩০০ বছর আগে রাজস্থানের বিসনোই কৌমের মধ্যেও এর চল ছিল। তাঁদের পবিত্র গাছ ‘খেজরি’ কাটার বিরুদ্ধে সেবারও মহিলারা অমৃতা দেবীর নেতৃত্বে প্রতিবাদ করেন। গাছ জড়িয়ে থেকেই প্রাণ দেন তাঁরা। এইসব ঘটনা ভারতে ইকো-ফেমিনিজমের পথ প্রশস্ত করে। সেই পথই আরও মজবুত করলেন ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী নারীরা।

ঝাড়খণ্ডের পূর্বি সিংভূম জেলার মুতুরখাম গ্রামের গরিব আদিবাসী নারীরা রুখে দাঁড়ালেন অরণ্য ধ্বংসের বিরুদ্ধে। হাতে শুধু জলের বোতল আর লাঠি। মনোবলের কাছে বাকি সমস্ত অস্ত্র তুচ্ছ। এই নিয়েই রোজ শালবনের ভেতর কয়েক মাইল টহল দেন তাঁরা। চোরাচালানকারীদের হাতে কোনওমতেই নিজেদের প্রিয় অরণ্য তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতে দেবেন না– এই তাঁদের পণ। এই যাত্রায় তাদের সঙ্গী একটিমাত্র কুকুর। রক্ষীও বলা যায় তাকে। জঙ্গলের মধ্যে একের পর এক অভিযান চালিয়েছে এই দলটি। এক মন এক প্রাণ হয়ে আদিবাসী নারীদের এই দলটি বছরের পর বছর পঞ্চাশ হেক্টরের ওপর বন্যজমি সংরক্ষণ করতে সফল হয়েছে। সরকার এবং মাওবাদীদের সংঘর্ষের একদম কেন্দ্রে থেকেও দিনের পর দিন যে অসীম সাহসের পরিচয় দিয়ে চলেছেন এই নিরস্ত্র মহিলারা, তা সত্যিই শ্রদ্ধা জাগায়।

দলটি যিনি নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন, তাঁর নাম যমুনা টুডু। বয়স ৩৭। গত দুই দশক ধরে বন কেটে ফেলার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। ১৯৯৮ সালে বিয়ে হয় যমুনার। এরপর থেকেই জঙ্গলের অধিকার সম্বন্ধে গ্রামের লোককে সচেতন করে তুলতে শুরু করেন তিনি। বনাঞ্চল রক্ষা করতে এ তাঁর মরিয়া পণ। তিলে তিলে গড়ে তোলা এই ‘বন সুরক্ষা সমিতি’-তে এখন ষাট জন সদস্যা। তাঁরা প্রতিদিন সকাল, দুপুর, সন্ধে তিনবেলা জঙ্গলে টহল দেন। এই টহলে অতিষ্ঠ হয়ে কাঠ চুরি করতে পারে না মাফিয়ারা। শোধ তুলতে রাতের অন্ধকারে তারা বন জ্বালিয়ে দেয় মাঝে মাঝেই।

এত সবকিছুর মাঝেই জঙ্গল টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন যমুনারা। পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও। খোদ রাষ্ট্রপতি তাঁকে সম্মান জানিয়েছেন। একটি সাক্ষাৎকারে নিজের লড়াই সম্বন্ধে যমুনা বলেন, “বিয়ের কিছুদিন পরই আমার শাশুড়ি, ননদ আরও কয়েকজন মেয়ের সঙ্গে আমাকে নিয়ে গেল কাঠ কাটতে, ওই জঙ্গলে। কাঠ কেটে সেই কাঠে রান্নাবান্না হবে। কাটতে কাটতেই আমার মনে হল এভাবে চললে তো সব গাছ শেষ হয়ে যাবে একদিন না একদিন। জঙ্গল আর থাকবে না।”

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অরণ্য রক্ষা করতে রুখে দাঁড়িয়েছিল মানুষ! কেরলের সাইলেন্ট ভ্যালির আন্দোলন কেন আজও জরুরি

‘সাইলেন্ট ভ্যালি’ কেরলের উত্তরাঞ্চলে পালাক্কাড় জেলার অন্তর্ভুক্ত কান্ধিপূজা নদীর উপত্যকায় অবস্থিত। সমগ্র অঞ্চলটি অরণ্যসংকুল।

শাল কাঠের যেমন চাহিদা, তেমনই দাম। ফলে দিনের পর দিন শালবন কেটে সাফ করে দিচ্ছে মাফিয়ারা। সেই চুরিই নিজেদের এলাকায় আটকে দিয়েছেন যমুনা। আদিবাসী সমাজের নিয়মেও গাছ কাটা হারাম। একান্ত প্রয়োজনে কুটোকাটা কুড়িয়ে আগুন জ্বালে লোকে। কিন্তু গাছ কাটা একেবারেই নিষিদ্ধ। কিন্তু আদিবাসী নিয়মের পরোয়া পুলিশ করবে কেন? বনবিভাগও এসব চুরি থেকে উপকৃতই হয়। অচিরেই যমুনা বুঝতে পারেন এদের কাছ থেকে কোনওরকম সাহায্যই পাওয়া যাবে না। ভেতর ভেতর যোগসাজশ রয়েছে। মন্ত্রী, সরকার কারও থেকেই সাহায্যের কোনও আশা নেই। কাজেই নিজেই দায়িত্ব নেন যমুনা।

কিন্তু কাজটা সহজ ছিল না। কিছু মহিলার সঙ্গে কথা বলে দেখলেন কেউই রাজি হচ্ছে না। তাদের চিন্তা, এই কাজ করলে গ্রামের পুরুষদের সঙ্গেও ঝামেলা হবে, তাই রাজি হচ্ছে না তারা। টেন পাশ যমুনার চোখে তখন বনহীন ধূসর মরুভূমির ভবিষ্যৎ ভাসছে। যেভাবেই হোক জঙ্গল সংরক্ষণ করতেই হবে। তাদেরকে একটু ঝাঁঝের সঙ্গেই প্রশ্ন করলেন, “জঙ্গল ছাড়া বাঁচতে পারবে তো?” যমুনার স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি এবার ধীরে ধীরে গ্রামের মহিলা থেকে পুরুষ সবাইকেই প্রভাবিত করল। “আমার বেড়ে ওঠা গাছপালার মধ্যেই। সেখান থেকেই পরিবেশকে ভালোবাসতে শেখা। উড়িষ্যায়, আমার বাপের বাড়িতে বাবা প্রচুর গাছ লাগাতেন। পরিবেশ সবুজ রাখার গুরুত্ব সেখান থেকেই বুঝতে শিখি,” বলেছিলেন যমুনা।

নিজেদের মদের টাকা জোগাড়ের জন্য জঙ্গল কেটে সাফ করে দেবে মাফিয়ারা, আর মানুষ চুপ করে দেখবে— কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি যমুনা। গ্রামের মহিলাদের কাছে আবেদন করেছেন বারবার। বসেছেন সবাইকে নিয়েই। বুঝিয়েছেন জঙ্গলের গুরুত্ব কতখানি! জনাপঁচিশেক মহিলাদের একটি দল নিয়ে, হাতে সড়কি, তির-ধনুক-সহ জঙ্গলে টহল দিতে শুরু করেন যমুনা। ক্রমে পুরুষরাও এতে যোগ দেয়। কিন্তু যমুনা মনে করেন, মূল চেষ্টা নারীদেরই হওয়া উচিত।

বহু বাধা-বিপত্তি হেলায় পেরিয়েছেন তাঁরা। আরও কত পেরনো বাকি। “গ্রামের লোক কি কম ভুগেছে এই নিয়ে? মাফিয়াদের সঙ্গে ঝামেলা প্রায়দিন লেগেই থাকত। মেয়েদের আমি বলেইছিলাম, এই লড়াইয়ে ভালো দিন যেমন আসবে, খারাপ দিনও আসবে, লড়াই ছাড়া যাবে না,” জানান যমুনা। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে রেলের মাধ্যমে কাঠ পাচার আটকাতে সম্মত করেন তাঁরা। যমুনার বয়ানে, “২০০৮-'০৯ নাগাদ মাফিয়ারা মারাত্মক আক্রমণ করেছিল আমাদের, স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে কথা বলে বাড়ি ফিরছি, এই বড় বড় পাথর, কারও মাথায় লাগল, কারও গায়ে।"

এতেও দমেননি তাঁরা। বরং বেড়েছে তাঁদের পরিচিতি। আজ গ্রামে গ্রামে সচেতনতা বৃদ্ধির ভাষণ দেন যমুনা। গড়ে তুলেছেন প্রায় ১৫০টিরও বেশি জঙ্গল প্রতিরক্ষা কমিটি। তাতে ৬০০০ জনেরও অধিক সদস্য রয়েছেন। ভারতের ইকো-ফেমিনিজমের ইতিহাসে যমুনা টুডুর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। লেখা থাকবে মাটি কামড়ে থেকে এই লড়াই গড়ে তোলার ইতিহাস। নিজের প্রাপ্য সম্মান যে আদিবাসী নারী নিজে ছিনিয়ে নিয়েছেন, তাঁকে অপার শ্রদ্ধা।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।