হাতে তির-ধনুক, না মাওবাদী নন, অস্ত্র হাতে গাছ বাঁচাচ্ছেন এই আদিবাসী মেয়েরা

“গাঁও ছোড়াব নেহি, জঙ্গল ছোড়াব নেহি, মায় মাটি ছোড়াব নেহি লড়াই ছোড়াব নেহি”- এক সময় দলিত-আদিবাসী নারী-পুরুষের মুখে মুখে এই গান ভাসত। আদিবাসীদের জঙ্গল দখল, বাসস্থান দখল এদেশে নতুন না। প্রসঙ্গত মনে করা যেতে পারে চিপকো আন্দোলনের কথা। মীরা বেনই প্রথম লক্ষ করেন, পাহাড়ে বন্যা-পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়ংকর হয়ে উঠছে। তার অন্যতম কারণ ছিল স্থানীয় ওক জাতীয় গাছপালা কেটে সাফ করে বিদেশি পাইনজাতীয় বন তৈরি করা। এই ব্যবসাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে পঙ্গু করে দিচ্ছিল স্থানীয় জনজীবন। ‘গোপাল আশ্রম’ নামে একটি নতুন আশ্রম খোলেন মীরা বেন, শুরু হয় চিপকো আন্দোলন। গাছ জড়িয়ে গাছ কাটতে দেব না বলার পদ্ধতি কিন্তু নতুন নয়, ৩০০ বছর আগে রাজস্থানের বিসনোই কৌমের মধ্যেও এর চল ছিল। তাঁদের পবিত্র গাছ ‘খেজরি’ কাটার বিরুদ্ধে সেবারও মহিলারা অমৃতা দেবীর নেতৃত্বে প্রতিবাদ করেন। গাছ জড়িয়ে থেকেই প্রাণ দেন তাঁরা। এইসব ঘটনা ভারতে ইকো-ফেমিনিজমের পথ প্রশস্ত করে। সেই পথই আরও মজবুত করলেন ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী নারীরা।

ঝাড়খণ্ডের পূর্বি সিংভূম জেলার মুতুরখাম গ্রামের গরিব আদিবাসী নারীরা রুখে দাঁড়ালেন অরণ্য ধ্বংসের বিরুদ্ধে। হাতে শুধু জলের বোতল আর লাঠি। মনোবলের কাছে বাকি সমস্ত অস্ত্র তুচ্ছ। এই নিয়েই রোজ শালবনের ভেতর কয়েক মাইল টহল দেন তাঁরা। চোরাচালানকারীদের হাতে কোনওমতেই নিজেদের প্রিয় অরণ্য তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতে দেবেন না– এই তাঁদের পণ। এই যাত্রায় তাদের সঙ্গী একটিমাত্র কুকুর। রক্ষীও বলা যায় তাকে। জঙ্গলের মধ্যে একের পর এক অভিযান চালিয়েছে এই দলটি। এক মন এক প্রাণ হয়ে আদিবাসী নারীদের এই দলটি বছরের পর বছর পঞ্চাশ হেক্টরের ওপর বন্যজমি সংরক্ষণ করতে সফল হয়েছে। সরকার এবং মাওবাদীদের সংঘর্ষের একদম কেন্দ্রে থেকেও দিনের পর দিন যে অসীম সাহসের পরিচয় দিয়ে চলেছেন এই নিরস্ত্র মহিলারা, তা সত্যিই শ্রদ্ধা জাগায়।

দলটি যিনি নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন, তাঁর নাম যমুনা টুডু। বয়স ৩৭। গত দুই দশক ধরে বন কেটে ফেলার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। ১৯৯৮ সালে বিয়ে হয় যমুনার। এরপর থেকেই জঙ্গলের অধিকার সম্বন্ধে গ্রামের লোককে সচেতন করে তুলতে শুরু করেন তিনি। বনাঞ্চল রক্ষা করতে এ তাঁর মরিয়া পণ। তিলে তিলে গড়ে তোলা এই ‘বন সুরক্ষা সমিতি’-তে এখন ষাট জন সদস্যা। তাঁরা প্রতিদিন সকাল, দুপুর, সন্ধে তিনবেলা জঙ্গলে টহল দেন। এই টহলে অতিষ্ঠ হয়ে কাঠ চুরি করতে পারে না মাফিয়ারা। শোধ তুলতে রাতের অন্ধকারে তারা বন জ্বালিয়ে দেয় মাঝে মাঝেই।

আরও পড়ুন: অরণ্য রক্ষা করতে রুখে দাঁড়িয়েছিল মানুষ! কেরলের সাইলেন্ট ভ্যালির আন্দোলন কেন আজও জরুরি

এত সবকিছুর মাঝেই জঙ্গল টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন যমুনারা। পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও। খোদ রাষ্ট্রপতি তাঁকে সম্মান জানিয়েছেন। একটি সাক্ষাৎকারে নিজের লড়াই সম্বন্ধে যমুনা বলেন, “বিয়ের কিছুদিন পরই আমার শাশুড়ি, ননদ আরও কয়েকজন মেয়ের সঙ্গে আমাকে নিয়ে গেল কাঠ কাটতে, ওই জঙ্গলে। কাঠ কেটে সেই কাঠে রান্নাবান্না হবে। কাটতে কাটতেই আমার মনে হল এভাবে চললে তো সব গাছ শেষ হয়ে যাবে একদিন না একদিন। জঙ্গল আর থাকবে না।”

শাল কাঠের যেমন চাহিদা, তেমনই দাম। ফলে দিনের পর দিন শালবন কেটে সাফ করে দিচ্ছে মাফিয়ারা। সেই চুরিই নিজেদের এলাকায় আটকে দিয়েছেন যমুনা। আদিবাসী সমাজের নিয়মেও গাছ কাটা হারাম। একান্ত প্রয়োজনে কুটোকাটা কুড়িয়ে আগুন জ্বালে লোকে। কিন্তু গাছ কাটা একেবারেই নিষিদ্ধ। কিন্তু আদিবাসী নিয়মের পরোয়া পুলিশ করবে কেন? বনবিভাগও এসব চুরি থেকে উপকৃতই হয়। অচিরেই যমুনা বুঝতে পারেন এদের কাছ থেকে কোনওরকম সাহায্যই পাওয়া যাবে না। ভেতর ভেতর যোগসাজশ রয়েছে। মন্ত্রী, সরকার কারও থেকেই সাহায্যের কোনও আশা নেই। কাজেই নিজেই দায়িত্ব নেন যমুনা।

কিন্তু কাজটা সহজ ছিল না। কিছু মহিলার সঙ্গে কথা বলে দেখলেন কেউই রাজি হচ্ছে না। তাদের চিন্তা, এই কাজ করলে গ্রামের পুরুষদের সঙ্গেও ঝামেলা হবে, তাই রাজি হচ্ছে না তারা। টেন পাশ যমুনার চোখে তখন বনহীন ধূসর মরুভূমির ভবিষ্যৎ ভাসছে। যেভাবেই হোক জঙ্গল সংরক্ষণ করতেই হবে। তাদেরকে একটু ঝাঁঝের সঙ্গেই প্রশ্ন করলেন, “জঙ্গল ছাড়া বাঁচতে পারবে তো?” যমুনার স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি এবার ধীরে ধীরে গ্রামের মহিলা থেকে পুরুষ সবাইকেই প্রভাবিত করল। “আমার বেড়ে ওঠা গাছপালার মধ্যেই। সেখান থেকেই পরিবেশকে ভালোবাসতে শেখা। উড়িষ্যায়, আমার বাপের বাড়িতে বাবা প্রচুর গাছ লাগাতেন। পরিবেশ সবুজ রাখার গুরুত্ব সেখান থেকেই বুঝতে শিখি,” বলেছিলেন যমুনা।

নিজেদের মদের টাকা জোগাড়ের জন্য জঙ্গল কেটে সাফ করে দেবে মাফিয়ারা, আর মানুষ চুপ করে দেখবে— কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি যমুনা। গ্রামের মহিলাদের কাছে আবেদন করেছেন বারবার। বসেছেন সবাইকে নিয়েই। বুঝিয়েছেন জঙ্গলের গুরুত্ব কতখানি! জনাপঁচিশেক মহিলাদের একটি দল নিয়ে, হাতে সড়কি, তির-ধনুক-সহ জঙ্গলে টহল দিতে শুরু করেন যমুনা। ক্রমে পুরুষরাও এতে যোগ দেয়। কিন্তু যমুনা মনে করেন, মূল চেষ্টা নারীদেরই হওয়া উচিত।

বহু বাধা-বিপত্তি হেলায় পেরিয়েছেন তাঁরা। আরও কত পেরনো বাকি। “গ্রামের লোক কি কম ভুগেছে এই নিয়ে? মাফিয়াদের সঙ্গে ঝামেলা প্রায়দিন লেগেই থাকত। মেয়েদের আমি বলেইছিলাম, এই লড়াইয়ে ভালো দিন যেমন আসবে, খারাপ দিনও আসবে, লড়াই ছাড়া যাবে না,” জানান যমুনা। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে রেলের মাধ্যমে কাঠ পাচার আটকাতে সম্মত করেন তাঁরা। যমুনার বয়ানে, “২০০৮-'০৯ নাগাদ মাফিয়ারা মারাত্মক আক্রমণ করেছিল আমাদের, স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে কথা বলে বাড়ি ফিরছি, এই বড় বড় পাথর, কারও মাথায় লাগল, কারও গায়ে।"

এতেও দমেননি তাঁরা। বরং বেড়েছে তাঁদের পরিচিতি। আজ গ্রামে গ্রামে সচেতনতা বৃদ্ধির ভাষণ দেন যমুনা। গড়ে তুলেছেন প্রায় ১৫০টিরও বেশি জঙ্গল প্রতিরক্ষা কমিটি। তাতে ৬০০০ জনেরও অধিক সদস্য রয়েছেন। ভারতের ইকো-ফেমিনিজমের ইতিহাসে যমুনা টুডুর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। লেখা থাকবে মাটি কামড়ে থেকে এই লড়াই গড়ে তোলার ইতিহাস। নিজের প্রাপ্য সম্মান যে আদিবাসী নারী নিজে ছিনিয়ে নিয়েছেন, তাঁকে অপার শ্রদ্ধা।

 

More Articles

;