কলম্বিয়ার কোকেন-হিপো! কেন উদ্বাস্তু জলহস্তীরা?

ঠিক এই মুহূর্তে ৪০,০০০-এরও বেশি প্রাণী IUCN-এর রেড লিস্টে, ১৬,০০০-এরও বেশি প্রাণী বিলুপ্তির পথে। এদিকে বিগত দশ বছরে জলহস্তীর সংখ্যা সাত থেকে কুড়ি শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ফলে ইতিমধ্যেই জলহস্তীকে অ-সুরক্ষিত প্রাণীদের তালিকাভুক্ত করেছে IUCN।

অথচ এই মুহূর্তে কলোম্বিয়ার ম্যাগডালেনা নদীতে বেড়েই চলেছে জলহস্তীর সংখ্যা। ২০২১ সালে বায়োলজিক্যাল কনজার্ভেশন জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা বলছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কলম্বিয়ার এই জলহস্তীগুলিকে মেরে ফেলা দরকার। যেখানে IUCN-এর তালিকা বলে দিচ্ছে, জলহস্তী অসুরক্ষিত, সেখানে জলহস্তী মেরে ফেলার কথা উঠল কেন? অকারণ প্রাণীহত্যা যেমন অমানবিক একটি কাজ, পাশাপাশি পরিবেশের বর্তমান পরিস্থির কথা মাথায় রেখে এই কাজ কি পরিবেশের জন্যই ক্ষতিকর নয়?

উত্তর হল, না। গবেষকরা কলম্বিয়ার, বিশেষ করে ম্যাগডালেনা নদীর বাস্তুতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই এই কথা বলছেন। এবং ম্যাগডালেনা নদীর জলহস্তীগুলিকে মেরে ফেললে বাস্তুতন্ত্রেরই লাভ। কলম্বিয়ার জলহস্তীগুলি ধীরে ধীরে ইকোলজিক্যাল টাইম-বম্বে পরিণত হচ্ছে। কারণ ধীরে ধীরে এরাই বাস্তুতন্ত্রের অন্যান্য প্রাণীর নির্মূল হয়ে যাওয়ার কারণে পরিণত হচ্ছে।

আরও পড়ুন: নারীদের গলা জিরাফের মতো! সম্মান পেতে গলায় বেড়ি পরতে হয় এই মহিলাদের

এখন পাঠকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, প্রাণীহত্যা করে বাস্তুতন্ত্র কীভাবে রক্ষা করা যায়? এ তো উলটো কথা বলছেন গবেষকরা! দেখে নেওয়া যাক, গবেষকরা কেন অবিবেচকের মতো কথা বলছেন না।

জলহস্তীর মূল বাসস্থান কিন্তু আফ্রিকা। বিশালাকার এই প্রাণীর আদৌ কলম্বিয়াতে থাকার কথা নয়। অথচ আফ্রিকার বাইরে দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়াতেই এত বেশি সংখ্যক জলহস্তীর দেখা মেলে। ২০২১ সালের পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় আশি থেকে একশোকুড়িটি জলহস্তী কলম্বিয়ায় আছে।

তাহলে কীভাবে এল কলম্বিয়াতে এত জলহস্তী?

আপাতত জলহস্তীর প্রসঙ্গ ছেড়ে কিছুক্ষণের জন্য ইতিহাসে ফেরা যাক। আটের দশক কেঁপে উঠেছিল যে ঘটনায়, তা হলো ড্রাগ ওয়ার। আন্তর্জাতিক ড্রাগ মাফিয়া পাবলো এসকোবার সেসময় কলম্বিয়ার ত্রাস।প্রথম পাবলো এসকোবার কুখ্যাত মেডেলিন ড্রাগস কার্টেল প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৮০ সাল নাগাদ।আন্তর্জাতিক ড্রাগ পাচারচক্র, অপহরণ, গুমখুন, হত্যা, বোমা বিস্ফোরণ, এসবই ছিল তাঁর নখদর্পণে। সেই পাবলো এসকোবারের ইচ্ছে হল একটি ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা বানাবেন, যেখানে অন্যান্য প্রাণীর পাশাপাশি থাকবে জলহস্তীও।

সেই ইচ্ছে পূরণের জন্য পাবলো বাইরে থেকে জলহস্তী আমদানিও করেন। সেই থেকেই এই জলহস্তীদের 'কোকেন-হিপো' নামে ডাকা হয়।

১৯৯৩ সালে ডিইএ বা ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির হাতে ধরা পড়ার পর হত্যা করা হয় পাবলোকে। দখল করা হয় দীর্ঘ আড়াইশো কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত বিলাসবহুল এস্টেট 'হেসিয়েন্ডা নেপলস', যার অবস্থান ছিল কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতার উত্তর-পশ্চিমে।

তখনও তাঁর ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানায় ছিল সেই জলহস্তীরা। তাদের তখন ছেড়ে দেওয়া হয় ম্যাগডালেনা নদীতে। আর তখন থেকেই বাড়তে থাকে এদের সংখ্যা।

যেহেতু এদের মূল বাসস্থান কলম্বিয়া নয়, এবং কলম্বিয়াতে এদের জন্ম ও বেড়ে ওঠাও স্বাভাবিক ভাবে হয়নি, তাই সেই তখন থেকেই কলম্বিয়াতে জলহস্তীকে অনুপ্রবেশকারী প্রাণী বা ইনভেসিভ স্পিসিস হিসেবে ধরা হয়। শুধু তাই নয়, ম্যাগডালেনা নদীতে বেড়ে ওঠা এই জলহস্তীগুলি, এই নদীর বাস্তুতন্ত্রেরও যথেষ্ঠ ক্ষতি করছে। তাই ২০২১ সালের প্রকাশিত গবেষণাটির সাথে যুক্ত গবেষক ড. ন্যাটালি ক্যাসেলব্লাঁকোর মতে, বাস্তুতন্ত্রের অন্যান্য প্রাণীর রক্ষার এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে এই অনুপ্রবেশকারী জলহস্তীগুলিকে মেরে ফেলা ছাড়া অন্য উপায় নেই।

সাধারণত একেকটি জলহস্তীর ওজন প্রায় পাঁচ টনের কাছাকাছি। এক টন মানে ৯০৭ গ্রামের থেকে সামান্য বেশি। সেখানে এক-একটি জলহস্তীকে সরিয়ে তাদের স্বাভাবিক বাসস্থানে নিয়ে যাওয়া একটি বৃহদাকার ডাইনোসরকে সরিয়ে অনত্র নিয়ে যাওয়ার সমান। শুধু তাই নয়, জলহস্তী কিন্তু প্রাণী হিসেবে বেশ আক্রমণাত্মক। যদিও ঘুম পাড়িয়ে তাদের স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়, প্রতি জলহস্তী-পিছু স্থানান্তরের খরচ পড়ে পঞ্চাশ হাজার মার্কিন ডলার বা ছত্রিশ হাজার ইউরোর কাছাকাছি।

ড: ক্যাসেলব্লাঁকো বিবিসিকে জানিয়েছেন, কলম্বিয়ার বর্তমান জলহস্তীর একাংশ এখনই হত্যা না করলে আগামী দশ বা বিশ বছরে এদের সংখ্যা নাগালের বাইরে বেরিয়ে যাবে। যেখানে ২০৩৪ সালের মধ্যেই এদের সংখ্যা প্রায় দেড়হাজারের কাছাকাছি পৌঁছবে। গবেষকদের ধারণা, বছরে অন্তত তিরিশটি জলহস্তী না মেরে ফেললে, এই সমস্যা চূড়ান্ত রূপ ধারণ করবে। কিংবা নিদেনপক্ষে তিরিশটি পুরুষ জলহস্তীর শুক্রাশয় কেটে বাদ দিতে হবে।

গবেষকরা জানাচ্ছেন, এই অনুপ্রবেশকারী জলহস্তীগুলি স্থানীয় প্রাণীদের জন্ম ও বেড়ে ওঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, এমনকী, একাধিক স্থানীয় প্রাণীর ক্রমবিলুপ্তির কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে। পাশাপাশি, অতিরিক্ত হারে জলহস্তীর সংখ্যা বেড়ে গেলে জলে উপস্থিত রাসায়নিকের পরিমাণে অস্বাভাবিকতা দেখা যাবে। যার দরুন, মাছ-সমেত অন্যান্য জলজ প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কিন্তু মুশকিল হল, কলম্বিয়াবাসী এ যুক্তি মানতে নারাজ। তারা বড়ই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে যখনই তাদের দেশের জলহস্তীদের হত্যা করার কথা বলা হয়। এমনকি ড. ন্যাটালিও খুনের হুমকি পেতে শুরু করেছিলেন এই গবেষণা-সমেত নিজের মতামত প্রকাশ্যে আনার পর। কিন্তু যেহেতু এই নদী, কলম্বিয়াতে জলপথে যাতায়াতের জন্য প্রধানত ব্যবহার করা হয়, তাই যাতায়াতেও অসুবিধে হয়। স্থানীয় মানুষের ওপর এদের আক্রমণের আশঙ্কা থাকায় ২০০৯ সালে কলম্বিয়ার সেনারা বেশ কিছু জলহস্তীকে মেরেও ফেলে। তখনই বহু কলম্বিয়ান এই ঘটনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।

কলম্বিয়ান এনভায়রনমেন্টাল এজেন্সির জীববিদ ডেভিড এচেভেরির মতে, এখনই কলম্বিয়ার এই জলহস্তীগুলিকে মেরে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও আলোচনা হয়েছে বেশ কিছু জলহস্তীকে মেরে ফেলার, তবে স্থানীয় মানুষের মতামতই এখানে বাধার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। স্থানীয়দের এই আবেগের নেপথ্যে এককালের 'পাইসা রবিনহুড' ওরফে মাফিয়া পাবলো এসকোবারের প্রবল জনপ্রিয়তার রেশও কিছুটা দায়ী। এককালে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হতে চাওয়া, আমেরিকার হাড় হিম করা মাফিয়া পাবলো এসকোবারের মৃত্যু ও তারপর ক‍্যালি কার্টেলের অবসান ঘটার পর শেষ হয়েছিল কলম্বিয়ার দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী ড্রাগ ওয়ার। কিন্তু সেই যুদ্ধের চিহ্ন এখনও বহন করে চলেছে এই ছিন্নমূল জলহস্তীরা।

 

 

 

More Articles

;