নারীদের গলা জিরাফের মতো! সম্মান পেতে গলায় বেড়ি পরতে হয় এই মহিলাদের

জিরাফের মতো লম্বা গলা সব নারীর। দেখতে কী অদ্ভুত! জিরাফের মতো অস্বাভাবিক রকমের লম্বা গলাবিশিষ্ট এই নারীদের কাঁধের ওপর থেকে চিবুকের নিচ পর্যন্ত গলার চারপাশে প্যাঁচানো আছে ২০-২৫টি পিতলের চক্রাকার বলয়। দেখলে মনে হয়, তাদের শরীর এবং মাথার মধ্যে যেন কোনও যোগ নেই, মাথাটা বুঝি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পিতলের রিংয়ের তৈরি ভিত্তির ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে। অথচ এই ভাসমান গলা নিয়েই তারা খুব স্বাভাবিকভাবে হাঁটা-চলা করছে, দৈনন্দিন কাজকর্ম করে যাচ্ছে।

মায়ানমার এবং থাইল্যান্ডের কিছু অঞ্চলে এটি অত্যন্ত পরিচিত একটি দৃশ্য। মায়ানমারের কায়ান উপজাতির এই নারীদের পরিচয় ‘লম্বা গলাবিশিষ্ট নারী’ বা ‘জিরাফ নারী’ হিসেবে।

সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই সারা পৃথিবীর বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের দেহে কৃত্রিমভাবে কিছু পরিবর্তন এনে অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে আলাদা হতে চেয়েছে। কখনও শৈল্পিক ভাবনা থেকে, কখনও ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে, কখনও সম্প্রদায়ের প্রতীক হিসেবে, কখনও বা সৌন্দর্য ও যৌন আবেদন বৃদ্ধির জন্য। কখনও কখনও আবার সমাজ বাধ্য করেছে ঈশ্বরের দেওয়া দেহে পরিবর্তন আনতে। যেমন বাধ্য করেছে মায়ানমারের ‘শান’ প্রদেশের কায়ান উপজাতির নারীদের। যাঁদেরকে বিশ্ব নাম দিয়েছে ‘জিরাফ নারী’।

আরও পড়ুন: বিপুল ধনসম্পদ পাহারা দিচ্ছে বিষধর সাপ! যে কারণে আজও রহস্যময় এই মন্দির

শান প্রদেশের কায়ান উপজাতি
উত্তরদিকে চিন, পূর্বদিকে লাওস, দক্ষিণদিকে থাইল্যান্ড দিয়ে ঘেরা মায়ানমারের শান প্রদেশ। এই প্রদেশের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে বাস করেন কায়ান উপজাতি। প্রাচীনকাল থেকেই কায়ানদের লড়াকু মনোভাব ও নিষ্ঠুরতার কথা বিভিন্ন পরিব্রাজক লিখে গিয়েছেন। কায়ানরা নিজেদের মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন। তাঁদের বৃত্তে বাইরের লোকের প্রবেশ পছন্দ করেন না। নিজস্ব ভাষা আর সংস্কৃতি নিয়ে থাকতে ভালবাসেন। মায়ানমারের এই কায়ানদের এক উপগোষ্ঠী মায়ানমারের জুন্টা বাহিনীর অত্যাচারে প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডে পালিয়ে আসে, ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে। এই কায়ান লাহুই-রা স্থানীয়ভাবে 'পাদাউং' নামেও পরিচিত। স্থানীয় ভাষায় 'পাদাউং' শব্দটির অর্থ ‘লম্বা গলা’। কায়ান লাহুইরা বসতি গড়ে তোলে থাইল্যান্ডের উত্তর সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চল মায় হং সন, মুয়াং ও চিয়াং দাওতে।

কায়ান জিরাফ নারী
কায়ানরা মেয়েদের পাঁচ বছর বয়স হলেই গলায় পরিয়ে দেন ১ কেজি ওজনের ধাতুর তৈরি বলয়ের মতো ভারী হার। ৮ বছর বয়সে ১ কেজি থেকে বাড়িয়ে ২ কেজি, এবং ১২ বছর বয়সে ২ কেজি থেকে বাড়িয়ে ৩ কেজির রিং পরানো হয়। বলয়ের সংখ্যা বাড়তেই থাকে বালিকার কচি গলাটাকে ঘিরে। শিশুকন্যাগুলির গলার ধাতব বলয়গুলি দেখলে মনে হবে, একটির ওপর আরেকটি বসিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলি কোনও পৃথক পৃথক রিং বা বলয় না। বরং একই সঙ্গে জোড়ালাগানো, প্যাঁচানো কুণ্ডলী। পিতলের সঙ্গে সামান্য সোনা মিশিয়ে তৈরি করা হয় বলয়গুলি। কুণ্ডলীর এক পাকের ওজন বয়সভেদে গিয়ে দাঁড়ায় ২৫০ থেকে ৪০০ গ্রাম।

আবার অন্যদিকে, যদি দেখা যায় যে, কায়ান বালিকা আরও বেশি ভার সহ্য করতে পারবে, তাহলে ১৫ বছর বয়সে আরও ২ কেজি ওজনের বলয় যোগ করা হয়। বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্ক কায়ান নারী ৫ কেজি ওজনের ধাতব কুণ্ডলী গলায় পরে থাকতে বাধ্য হন। তবে কোনও কোনও কায়ান নারীকে ১০ কেজি ওজনের রিংও পরে থাকতে দেখা যায়। কেননা, যিনি যত বেশি ওজনের বলয় গলায় পরবেন, কায়ান সমাজ তাঁকে তত মর্যাদাসম্পন্ন নারী বলে গণ্য করবে। ফলে যন্ত্রণার বিনিময়ে সম্মান কিনতে রাজি হয়ে যান অনেক কায়ান নারী।

যখন কায়ান নারী যুবতী হন, কাঁধের ওপর থেকে চিবুকের নিচ পর্যন্ত গলার চারপাশে পেঁচিয়ে ধরে ২০ থেকে ২৫টি বলয়। জিরাফের মতো অস্বাভাবিক লম্বা লাগে কায়ান নারীদের গলা। বলয় পরা অবস্থায় কায়ান নারীদের গলা ১ ফুট বা তার চেয়েও বেশি লম্বা মনে হয়। শুনতে অবাক লাগবে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা গলার দৈর্ঘ্য ১৫.৭৫ ইঞ্চি এবং গলাটি একজন কায়ান নারীর। শুধু তাঁদের গলাতেই নয়, কায়ান নারীদের দুই হাত-পায়েও আমৃত্যু জড়িয়ে থাকে এই ধাতব বেড়ি। যাকে ভদ্র ভাষায় 'অলংকার'-ও বলতে পারেন।

দেখতে রিং বা বলয়ের মতো হলেও কায়ানদের পরিধান করা ধাতব অলংকারগুলো আসলে পৃথক পৃথক রিং বা বলয় না, বরং প‍্যাঁচানো কুণ্ডলী। এগুলো কায়ানদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির পাশাপাশি নারীদের সৌন্দর্য, তাদের পরিবারের সামাজিক মর্যাদা এবং বিত্ত-বৈভবের পরিচয়ও বহন করে। কায়ান নারীদের পরিহিত রিংগুলোকে দেখতে পৃথক পৃথক ২০-২৫টি রিংয়ের মতো মনে হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলো ৩টি থেকে ৫টি কুণ্ডলীর সমন্বয়ে তৈরি হয়ে থাকে। সোজা পিতলের দণ্ডকে কুণ্ডলী পাকিয়ে বিভিন্ন বয়সে পর্যায়ক্রমে গলার চারপাশে পরিয়ে দেওয়া হয়। কুণ্ডলীগুলো হাতেই পরানো হয় বলে এতে প্রচুর সময় ব্যয় হয় এবং অত্যন্ত দক্ষ কারিগর প্রয়োজন হয়। ফলে একবার পরানোর পর সেগুলো বছরের পর বছর ধরে আর খোলা হয় না। কেবলমাত্র পুরনো কুণ্ডলী পাল্টে নতুন এবং বড় আকৃতির কুণ্ডলী প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন হলেই তা খোলা হয়।

পিতলের কুণ্ডলীগুলো অবশ্য প্রকৃতপক্ষে গলা লম্বা করতে পারে না। থাইল্যান্ডে আশ্রয় নেওয়া কায়ান শরণার্থী নারীদের গলা এক্স রে করে ডাক্তাররা দেখতে পান, দীর্ঘদিন ধরে রিং পরলেও তাদের গলার হাড়ের দৈর্ঘ্য বা হাড়গুলোর মধ্যবর্তী ব্যবধানের কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। বরং কুণ্ডলীগুলোর চাপে তাদের বুকের খাঁচা এবং কাঁধ কিছুটা নিচের দিকে বসে যাওয়ার কারণেই তাদের গলাকে লম্বা বলে ভ্রম হয়। আমাদের মতোই তাঁদেরও গলার হাড়ের সংখ্যা ৭টি। দীর্ঘদিন ধরে পিতলের কুণ্ডলী দ্বারা গলা আবৃত থাকার কারণে কায়ান নারীদের গলার চামড়া বিবর্ণ হয়ে যায় এবং পেশিগুলো দুর্বল হয়ে যায়। যাঁরা সর্বোচ্চ সংখ্যক রিংয়ের কুণ্ডলী পরিধান করেন, তাঁদের চিবুক প্রায় সময়ই রিং স্পর্শ করে থাকে। বছরের পর বছর ধরে মাথার ভার রিংয়ের ওপর ন্যস্ত থাকায় তাঁদের গলা দুর্বল হয়ে পড়ে। গলা ও ঘাড়ের পেশিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। স্পাইনাল কর্ড রীতিমতো ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এত ভার নিয়ে হাঁটতে খুবই অসুবিধে হয় তাঁদের। রাতে ঠিকমতো শুতে পারেন না। দীর্ঘদিন ধরে কম ঘুমোনোর ফলে বেশিরভাগ কায়ান নারীই স্বল্পায়ু হন। ফলে একটা বয়সের পরে যখন কোনও নারী তাঁর গলার কুণ্ডলী খুলে ফেলেন, তখন প্রথম কয়েক দিন তার প্রচণ্ড অস্বস্তি হয়। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা সহ্য হয়ে যায়।

বেড়ি পড়ার সংস্কৃতি
গলা লম্বা করার এই সংস্কৃতি কায়ানদের মধ্যে কোথা থেকে এসেছে, সেটা নিয়ে পরিষ্কার কোনও তথ্য পাওয়া যায় না। সাধারণত কায়ানরা নিজেরাও এর উৎপত্তি সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানে না। কায়ান নারীদের অধিকাংশই তাঁদের মা এবং দিদাদের ধারাবাহিকতায় এই সংস্কৃতি পালন করে থাকেন। তাঁদের অনেকেই এটাকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন। তবে অনেক সাংবাদিক এবং গবেষকের বর্ণনায়, এর উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কায়ানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাঁরা ড্রাগনের বংশধর। তাঁরা মনে করেন, অতীতে কোনও এক সময় এক নারী ড্রাগনের সঙ্গে স্বর্গীয় দূতের মিলনের ফলে তাঁদের বংশের আদি পুরুষদের জন্ম হয়েছে। অনেকের মতে, সেই লম্বা গলাবিশিষ্ট আদি মাতা ড্রাগনের সম্মানার্থেই কায়ান নারীদের মধ্যে গলা লম্বা করার সংস্কৃতির প্রচলন হয়েছিল।

ভিন্ন মতও অবশ্য আছে। কেউ কেউ দাবি করেন, এই রিংগুলো পরার প্রচলন হয়েছিল বাঘের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য। বাঘ সাধারণত গলায় বা ঘাড়ে কামড় দেয় বলেই তাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য গলায় ধাতব রিং পরা হত। আবার কারও মতে, প্রাচীনকালে গলায় রিং পরিয়ে মেয়েদেরকে অনাকর্ষণীয় করে রাখা হত, যেন তারা পার্শ্ববর্তী গোত্রের পুরুষদের নজরে না পড়ে। অবশ্য পরবর্তীতে এই রিং পরাটাই সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

কায়ান নারীদের শত শত বছরের এই ঐতিহ্য অবশ্য এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে মায়ানমারের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতেও আধুনিকতার ছোঁয়া পৌঁছে গেছে। সৌন্দর্যের সংজ্ঞাও তাই অনেকটা পাল্টে গেছে। গত কয়েক দশকে অনেক নারীই তাদের রিং বিসর্জন দিয়েছে। তারা এই রিংকে অপ্রয়োজনীয়, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং নারীস্বাধীনতার অন্তরায় হিসেবে দেখছে। গত শতকে যেখানে শুধুমাত্র কায়ান প্রদেশেই ৩০০ থেকে ৪০০ জিরাফ নারী ছিল, সেখানে বর্তমানে সমগ্র মায়ানমারে এদের সংখ্যা ১০০-র চেয়েও কম। তবে তা সত্ত্বেও এখনও অনেক কায়ান নারীই এই সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে আছেন। এঁদের মধ্যে যারা বয়স্ক, তাঁরাই শুধু প্রকৃত ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে ধারণের উদ্দেশ্যে এখনও রিং বিসর্জন দেননি। কিন্তু এর বাইরে একটি বড় অংশ আছে, যারা এখনও এই সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে রেখেছে শুধুমাত্র জীবিকা উপার্জনের স্বার্থে। কায়ান নারীদের অদ্ভুতদর্শন এই ফ্যাশন বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তাই মায়ানমারে এবং পার্শ্ববর্তী থাইল্যান্ডে এই নারীদের পর্যটকদের সামনে প্রদর্শন ব্যবসার উপাদানে পরিণত হয়েছে। থাইল্যান্ডের সরকার তাঁদের আশ্রয় দিয়েছে একটি পর্যটনকেন্দ্রিক গ্রামে, যেখানে এই নারীদের দেখতে যাওয়া পর্যটকদের কাছ থেকে প্রবেশমূল্য হিসেবে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে কর্তৃপক্ষ।

তবে শুধু প্রবেশমূল্য না, পর্যটকদের কাছে হস্তনির্মিত বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয় করেও কায়ানরা বেশ ভালো উপার্জন করতে পারে। যেখানে অন্যান্য গোত্রের শরণার্থীদেরকে সম্পূর্ণই ভাতার ওপর নির্ভর করতে হয়, সেখানে কায়ানরা তাদের এই সংস্কৃতিকে ব্যবসায় রূপ দিয়ে বেশ স্বচ্ছল জীবনধারণ করতে পারছে। কিন্তু এই পর্যটনশিল্প একই সঙ্গে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখেও পড়ছে। জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ধরনের নারীদের মানব চিড়িয়াখানায় বন্দি হিসেবে বর্ণনা করেছে। কায়ান উপজাতি কি তাদের নারীদের কোনও দিন বুঝতে চেষ্টা করেছে! পড়তে চেষ্টা করেছে তাঁদের মন ! তাঁদের যন্ত্রণাকে! যেদিন কায়ানরা তাঁদের নারীদের বুঝবেন, যেদিন তাঁরা তাঁদের নারীদের গলার বেড়ি খুলে দেবেন, সেদিন পৃথিবীর অভিধান থেকে ‘জিরাফ নারী’ নামে নারীত্বের অবমাননাকারী শব্দ-যুগলের মৃত্যু ঘটবে। আরও কিছুদিন বেশি পৃথিবীকে দেখতে পারবেন কায়ান নারীরা। তারই অপেক্ষায় বুঝি দিন গুনছে যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখগুলি।

 

 

 

 

 

 

More Articles

;