সোলো ট্রাভেল কি সত্যিই স্বপ্নের জীবন? দু'বছরের একক ভ্রমণ তরুণীকে কী শিখিয়েছে?
solo travel: সোলো ট্রাভেল কি সত্যিই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা ছবির মতো এতটাই সুন্দর? চাকরি ছেড়ে দু'বছর একা বিশ্বের নানা দেশ ঘুরে বেড়ানোর পর কেন এক তরুণী বলছেন, স্বাধীনতার পাশাপাশি একাকিত্ব, অনিশ্চয়তা ও রুটিনহীন জীবনও এই যাত্রার বড় বাস্তবতা?
ব্যস্ত কর্পোরেট জীবনের ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই চাকরি ছেড়ে পৃথিবী ঘুরে দেখার স্বপ্ন দেখেন। সামাজিক মাধ্যমে ভ্রমণের ঝলমলে ছবি দেখে মনে হতে পারে, ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানোই যেন জীবনের সবচেয়ে সুখের সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাস্তবের দীর্ঘ একক ভ্রমণ সব সময় এতটা সহজ নয়। সম্প্রতি বিজনেস ইনসাইডার-এ প্রকাশিত একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার লেখায় এক তরুণী জানিয়েছেন, প্রায় দু'বছর ধরে বিশ্বের নানা দেশ ঘুরে বেড়ানোর আনন্দের পাশাপাশি কী কী কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে তাঁর জীবন একের পর এক অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। শিকাগোতে কনসালটিং সংস্থার ব্যস্ত চাকরিতে তিনি চরম মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। এর মধ্যেই স্বাস্থ্যগত সমস্যা এবং ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন তাঁকে আরও ভেঙে দেয়। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, সেই বাড়িতে আর থাকবেন না এবং ভাড়ার চুক্তি নবীকরণ করবেন না।
প্রথমে তাঁর পরিকল্পনা ছিল মাত্র তিন মাসের বিরতি নেওয়ার। সেই উদ্দেশ্যে তিনি ভারতে একটি ওয়েলনেস রিট্রিটে যোগ দেন। সেখানে কিছুদিন কাটানোর পর তাঁর মনে হয়, এত তাড়াতাড়ি আগের জীবনে ফিরে যাওয়ার জন্য তিনি এখনও প্রস্তুত নন। এরপর শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। এক দেশ থেকে আরেক দেশ, নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি আর অজানা অভিজ্ঞতা তাঁকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। দেখতে দেখতে সেই তিন মাসের পরিকল্পনা প্রায় দু'বছরের ভ্রমণে পরিণত হয়। এই সময়ে তিনি ন'টি দেশ ঘুরেছেন এবং সাতটি ভিন্ন সময় অঞ্চলে থেকেছেন।
দীর্ঘ এই সফরে তিনি শুধু ভ্রমণই করেননি। নিজের অভিজ্ঞতা নিয়মিত সামাজিক মাধ্যমে ভাগ করে নিতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেই কনটেন্ট তৈরির কাজই তাঁর আংশিক পেশায় পরিণত হয়। অনেকেই তাঁর ভ্রমণের গল্প পড়তে শুরু করেন। ফলে একদিকে যেমন নতুন জায়গা দেখার সুযোগ মিলেছে, অন্যদিকে নিজের অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগিয়ে নতুন ধরনের আয়ের পথ তৈরি হয়েছে।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ভ্রমণের ছবির আড়ালে এমন অনেক বাস্তবতা রয়েছে, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sonabai Rajwar: ১৫ বছর জানালাবিহীন ঘরে বন্দি ছিলেন ছত্তীসগঢ়ের সোনাবাই রাজওয়ার। কিন্তু হার মানেননি। মাটি, খড় ও প্রাকৃতিক রঙে সেই বন্দিশালাকেই গড়ে তুলেছিলেন অনন্য শিল্পভুবন। পরে তাঁর সৃষ্টি জাতীয় স্বীকৃতি পায়, আর তাঁর বাড়ি আজ এক জীবন্ত সংগ্রহশালা হিসেবে পরিচিত।
সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল নিজের বলে কোনো স্থায়ী জায়গা না থাকা। প্রতিনিয়ত এক হোটেল, হোস্টেল বা ভাড়া বাড়ি থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয়েছে। কোথাও কয়েক দিন, কোথাও কয়েক সপ্তাহ। ফলে এমন একটি ঘর, যেখানে নিজের ইচ্ছেমতো জিনিস রেখে নিশ্চিন্তে থাকা যায়, সেই অনুভূতিটাই হারিয়ে গিয়েছিল।
প্রতিবার নতুন শহরে পৌঁছনোর পর আবার নতুন করে মানিয়ে নিতে হয়েছে। কোথায় বাজার, কোথায় খাবার পাওয়া যায়, কীভাবে যাতায়াত করতে হবে—সবই নতুন করে শিখতে হয়েছে। প্রথম দিকে এই অভিজ্ঞতা রোমাঞ্চকর মনে হলেও, দীর্ঘ সময় পরে তা ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে।
আরও একটি বড় সমস্যা ছিল নির্দিষ্ট রুটিনের অভাব। চাকরির জীবনে প্রতিদিনের একটি ছন্দ থাকে। কখন কাজ, কখন বিশ্রাম, কখন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে—সবকিছুরই একটা কাঠামো থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ঘুরে বেড়ালে সেই বাঁধাধরা জীবনযাপন আর থাকে না। প্রতিদিনের পরিকল্পনা বদলে যেতে থাকে। এতে স্বাধীনতা থাকলেও, অনেক সময় মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়।
তিনি লিখেছেন, মানুষ সাধারণত ভ্রমণের সুন্দর মুহূর্তগুলিই অন্যদের সামনে তুলে ধরে। কিন্তু এমনও অনেক দিন এসেছে, যখন তিনি শুধু ক্লান্ত অনুভব করেছেন। বারবার ব্যাগ গোছানো, ট্রেন বা বিমানের অপেক্ষা, দীর্ঘ যাত্রা এবং নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চাপ শরীর ও মন—দুইয়ের উপরেই প্রভাব ফেলেছে।
দীর্ঘ সময় পরিবারের বাইরে থাকাও তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক অনুষ্ঠান, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, পরিচিত মানুষদের পাশে থাকার সুযোগ—সবই ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। ভিডিও কল বা মেসেজ পাঠিয়ে যোগাযোগ রাখা গেলেও, কাছের মানুষের উপস্থিতির বিকল্প কখনও হয় না।
তিনি বুঝতে পারেন, স্বাধীনভাবে পৃথিবী ঘোরা যতটা আনন্দের, ততটাই মূল্য দিতে হয় একাকিত্বের মাধ্যমে। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশ সম্পর্কই সাময়িক। কয়েক দিনের পরিচয়ের পর আবার সবাই নিজের নিজের পথে চলে যায়। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবু এই ভ্রমণ তাঁর জীবনে পরিবর্তন এনে দিয়েছে। তিনি নতুন সংস্কৃতি দেখেছেন, নিজের সীমাবদ্ধতা চিনেছেন এবং জীবনের অগ্রাধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখেছেন। অজানা পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে নেওয়ার আত্মবিশ্বাসও অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন দেশের মানুষের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখে তিনি উপলব্ধি করেছেন, সুখ বা সফলতার সংজ্ঞা সবার কাছে এক নয়।
এই দীর্ঘ সফরের পর আপাতত তিনি নিজের ভ্রমণে বিরতি নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে বাবা-মায়ের বাড়িতে রয়েছেন। সেখানে কিছুদিন বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি নিজের নতুন ব্যবসা শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর মতে, কিছুদিন এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকা এখন তাঁর জন্য প্রয়োজনীয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে তিনি ভ্রমণ পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছেন। বরং তিনি বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতে আবারও নতুন দেশে যাবেন। তবে এবার হয়তো আগের মতো একটানা নয়। তাঁর ইচ্ছা, ভবিষ্যতে নিউ ইয়র্কের মতো কোনো শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন এবং সেখান থেকে সময়ে সময়ে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়বেন। অর্থাৎ স্থায়িত্ব এবং স্বাধীনতা—দুটির মধ্যে একটি ভারসাম্য খুঁজে পেতে চান তিনি।
সামাজিক মাধ্যমে ভ্রমণের জীবন যতই আকর্ষণীয় মনে হোক না কেন, বাস্তবে সেটি শুধু সুন্দর দৃশ্য আর আনন্দে ভরা নয়। সেখানে রয়েছে অনিশ্চয়তা, ক্লান্তি, একাকিত্ব এবং প্রতিনিয়ত নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চাপ। আবার একই সঙ্গে রয়েছে আত্মবিশ্বাস, নতুন অভিজ্ঞতা, নিজের সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ এবং জীবনের অর্থ নতুন করে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা।






