গাড়ির হর্ন ডেকে আনছে মারাত্মক বিপদ, শব্দেই লুকিয়ে মরণফাঁদ

আপনি যদি শহরে বাস করেন, তাহলে শব্দদানব একটু একটু করে ক্ষতিগ্রস্ত করছে আপনার মস্তিস্ককে, আপনার হৃদযন্ত্রকে।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
গাড়ির হর্ন ডেকে আনছে মারাত্মক বিপদ, শব্দেই লুকিয়ে মরণফাঁদ

মণীশবাবুর বয়স মাত্র ৪৫। তিনি কলকাতা ট্র্যাফিক পুলিশের একজন সার্জেন্ট। নিয়ম অনুযায়ী আরও অন্তত দশ বছর চাকরি আছে তাঁর। কিন্তু হঠাৎ তাঁর শারীরিক সমস্যা দেখা দিল। দেখা গেল, তাঁর হৃদপিন্ডে সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রথমে ভাবা হয়েছিল, অতিরিক্ত দূষিত বায়ু এবং ধকলের কারণে এমন হয়েছে। কিন্তু ডাক্তাররা এক চাঞ্চল্যকর বিষয় আবিষ্কার করলেন। মণীশবাবুর এই বিপত্তির কারণ মাত্রাতিরিক্ত শব্দদূষণ, হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়ছেন। শহরের শব্দদূষণ মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে তাঁর হৃদযন্ত্রে। এখন অবসর নেওয়া ছাড়া তাঁর সামনে আর কোনও পথ খোলা নেই।

এই কাল্পনিক চরিত্র এবং ঘটনার আশ্রয় নেওয়া হলো বটে, কিন্তু যে বিপদের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে তা একেবারেই কাল্পনিক নয়। শব্দদূষণ আর শুধু মাত্র কোনও বিশেষ দিনে সীমাবদ্ধ নেই, তা এখন প্রাত্যহিক জীবনের অঙ্গ। আপনি যদি শহরে বাস করেন, তাহলে এই শব্দদানব একটু একটু করে ক্ষতিগ্রস্ত করছে আপনার মস্তিস্ককে, আপনার হৃদযন্ত্রকে। যতক্ষণ না রাত গভীর হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ৮৫ ডেসিবেল শব্দমাত্রা থাকছে গড় হিসেবে। অনেক জায়গাতেই তার থেকে বেশি। দুঃখের বিষয়, যাহবা বায়ুদূষণ, জলদূষণ নিয়ে একটু কথা হয়, সরকার একটু লোকদেখানো পদক্ষেপ গ্রহণ করে, শব্দদূষণের ক্ষেত্রে তারও প্রয়োজন মনে করা হয় না। কারণ ৯৯ শতাংশ মানুষের কাছে এটা কোনও সমস্যাই নয়। এই সমস্যা তাঁরা ঠাহরই করে উঠতে পারেন না।

কিন্তু একটা মজার বিষয় কি আপনি ভেবে দেখেছেন? আপনি এখন হেডফোন কিনতে গেলে আপনাকে নয়েজ ক্যান্সেলেশন হেডফোন দেখানো হয় না? বা ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলির বিজ্ঞাপনে থাকে না যে, 'শহরের কোলাহল থেকে দূরে কাটিয়ে আসুন কিছুদিন। পাহাড়ের কোলে, নিরিবিলি শান্ত জঙ্গলে দু'রাত তিন দিন'?

আমাদের আধুনিক সভ্যতা আমাদের এমন একটা জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে যেখানে নিস্তব্ধতা এখন ব্যবসার পণ্য, আর আপনি যদি শহরের বাসিন্দা হন, তাহলে সেই পণ্য নিজের জ্ঞানত বা অজ্ঞানত আপনি ক্রয় করবেনই।

আবার অন্যদিকে খবরের চ্যানেলগুলি খুলে দেখুন। চারদিকে শব্দদূষণ। সবাই সারাক্ষণ চিৎকার করছেন। সঞ্চালক চিৎকার করছেন, তাঁর অতিথিরাও সমান তালে চিৎকার করছেন। সবাই ভাবছেন, চিৎকার করে অন্যকে নিজের বক্তব্য শোনাবেন, দর্শককে প্রভাবিত করবেন। কিন্তু তিনি নিজেই নিজের কথা শুনতে পাচ্ছেন না, অন্যের কথা শোনা তো অনেক দূরের বিষয়। রাস্তায় বেরোলে দেখবেন গাড়ি, বাস, বাইক সবাই হর্ন মেরে চলেছে। কারণে-অকারণে, সবাই নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছেন। সবার গন্তব্যে যাওয়ার ভীষণ তাড়া। হর্ন দিয়েও কাজ না হওয়ায় চিৎকার করছেন। অ্যাম্বুল্যান্সকে বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন সাইরেন লাগাতে হচ্ছে, যাতে তার আওয়াজ সহনাগরিকদের কানে পৌঁছয়।

রাস্তা অবধিও যেতে হবে না। নিজের বাড়িতেই তারস্বরে স্পিকারে গান বাজাচ্ছেন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক। অন্যদিকে খুব বেশি বুদ্ধি না থাকা, একটু বেশি ধার্মিক মানুষজন নিজের ভগবানের প্রার্থনা গোটা পাড়াকে শোনাতে চাইছেন। বিবাহ অনুষ্ঠানেও মানুষ চাইছেন তাঁদের পারিপার্শ্বিক, তাঁদের প্রতিবেশীরা অবহিত হোন সেই শুভ অনুষ্ঠানের বিষয়ে। সবাই কোনও না কোনও উপায়ে বিভিন্ন ধরনের শব্দ সৃষ্টি করছেন, নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছেন। এই সবকিছুর মাঝে এখনও ভোটাধিকার না পাওয়া জেনএক্স এই শব্দদূষণ থেকে বাঁচতে বহু দাম দিয়ে Noise Cancelation Headphones কিনছে এবং সেখানে শব্দমাত্রা ১০০ করে দিয়ে নিজের পছন্দের গান শুনছে।

রিপোর্ট বলছে, শুধুমাত্র ইউরোপে প্রতি বছর দশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় শব্দ দূষণের কারণে। ৪৮,০০০ মানুষের হৃদযন্ত্রে সমস্যা দেখা দেয়, ৬৫ লক্ষ মানুষ আর শান্তিতে ঘুমোতে পারেন না। সেই সঙ্গে হাইপারটেনশন, উচ্চ রক্তচাপ তো আছেই।

অবাক হওয়ার মতো তথ্য হলেও এটাই বাস্তব। শব্দদূষণের কারণে শুধুমাত্র আমাদের কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। তা আমাদের মস্তিষ্কের কোশগুলিকেও মেরে ফেলে। কমে যায় আমাদের স্মৃতিশক্তি। প্রবল চাপ সৃষ্টি করে আমাদের হৃদপিন্ডের ওপর। সেই সঙ্গে শব্দদূষণ প্রভাব ফেলে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরেও। তিলে তিলে কমিয়ে দেয় আমাদের আয়ু। আমরা বুঝতে পারি না। আপনি যদি খেয়াল করেন যে, ইদানীং আপনি একটু বেশি খিটখিটে হয়ে গেছেন, খুব সহজেই মেজাজ হারাচ্ছেন, তাহলে বুঝবেন, এর কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম শহরের এই শব্দদূষণ। এই সব কারণ খতিয়ে দেখেই American Academy of Nursing ঘোষণা করেছিল, শব্দদূষণ বাকি আর সমস্ত দূষণের মতোই মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর।

কিছুদিন আগে মুম্বই পুরসভা একটি নিয়ম প্রবর্তন করে। যে নিয়ম অনুযায়ী, সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন কোনও একটি গাড়িও যদি হর্ন বাজায়, তাহলে অপেক্ষা করার সময়সীমা তিরিশ সেকেন্ড বেড়ে যাবে। যতবার হর্ন বাজবে, ততবার এই কাণ্ড ঘটবে। দেশের সব শহরেই এই ধরনের নিয়ম চালু করার সময় এসে গেছে। মানুষ নিজে থেকে সচেতন হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখাচ্ছে না। কঠোর শাস্তি ছাড়া কোনও গতি নেই এই বিপুল দূষণ আটকানোর।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?