রাষ্ট্র-কর্পোরেট দখলদারি ওড়িশায়! কেন লাঞ্জিগড়ের আদিবাসীরা আন্দোলনে নেমেছেন?

Niyamgiri conflict: আগামী ২০৩৬ সালকে সামনে রেখে ভারতীয় মুদ্রায় ৫০০ বিলিয়ন আর্থিক লক্ষ্য মাত্রা পূরণ করতে নিয়ম পাহাড়ের এই অঞ্চলে বেদান্ত ও সরকারের উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো।

Koyel Saha
৭ মিনিট
রাষ্ট্র-কর্পোরেট দখলদারি ওড়িশায়! কেন লাঞ্জিগড়ের আদিবাসীরা আন্দোলনে নেমেছেন?

এদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্রে ঠাসা সীমানা একের পর পিছনে ঠেলে রেলগাড়ি এগিয়ে চলে। এক নিশ্বাসে অনেকটা বাতাস টেনে নেওয়া খেলার মাঝে হঠাৎ-ই ঘন সবুজ বনাঞ্চল ফাঁকা হয়ে আসে। এলোমেলা খেয়ালখুশির বাতাস উবে যেতে শ্বাস বায়ুতে টান পড়ে। কর্কশ গম্বুজের টোল খাওয়া মিনার থেকে কালো ঘন ধোঁয়ার গাদ আকাশের নীল পর্দায় কালো কয়েক পোচ ধূসর রং লেপে দেয়। রাউরকেল্লা স্টেশনের আশপাশটা এমনই। দরাজ উন্মুক্ত পটভূমিতে চড়ে বেড়ানো মুক্ত স্বাধীন পশুপাখি চলার পথে ঠোক্কর খায়। তারা অন্য পথে পা বাড়াতে চায়। সেখানেও মানুষের আপত্তি। পশুপাখির খেয়াল খুশির সীমানা বাঁধিয়ে দিতে চায় সুরঙ্গের পটভূমিতে। জীব জগৎ প্রকৃতি ও ক্ষমতাহীন মানুষকে উৎখাত ও অধীনস্ত রাখতে বুলডোজার নেমে আসে। এই মাটিতে লোহা নামক খনিজ কিছুটা বেশি থাকার কারণে লাল মাটির তীব্রতা বুঝিয়ে দেয়, এই আবহাওয়া আদিম প্রবণতার বুনো গন্ধ কিংবা দরাজ বাতাস এত সহজে ফিকে হওয়ার নয়।

কুয়াশা লেগে থাকা পাবর্ত্য অভিযান অপার উন্মুক্ত প্রকৃতির ভরসা আশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখতে জীবন অধিকার চায়। চায় মর্যাদা-সমতা-স্বাধীনতা। সভ্যতার শহুরে দাপট প্রকৃতি বিচ্ছিন্ন কৃত্রিম আগ্রাসন। পাহাড়ের পর পাহাড় ডিঙ্গিয়ে ঘন সবুজ জঙ্গল, ছোট নদী (ঝোরা) শব্দ, গন্ধ, সূর্য ডুবলে অন্ধকারের চরম নিস্তব্ধতা, জীবজগত, অখন্ড প্রকৃতি-পরিবেশ এসময় এই উচ্ছেদের সাক্ষী।

বিশ্ব জোড়া উন্নয়নের দাপট অতীত কেড়ে প্রবল ভাবে ক্ষমতার গর্বে জাহির হতে চাইছে। হয়ত সেই কারণেই ক্ষমতা জৌলুসে মাখামাখি হয়ে একরম চোখ ধাঁধাঁনো আধিপত্য এঁটে বসতে চায় বহুতল বাড়ি, ইট, টাইলস, সিন্থেটিক রং ও প্লাসটিকে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে এক রং, এক ঢং, এক মোহময় ইশারার ইঙ্গিত। যে ইঙ্গিতের আকার-আচরণ কর্পোরেট অগ্রাসনের লালারসে জারিত। কর্পোরেট সবই নিজের করে পেতে, কেড়ে নিতে ভেঙে চুরে তছনছ করে দিতে মরিয়া। ফলত, প্রতিটি গ্রাস প্রথমেই ছিনিয়ে নেয় জীবন ও এলাকার শান্তি। অশান্তির বিষাক্ত আবর্ত বিচ্ছেদ ব্যবধানের সীমানা গেঁথে বেদান্তের দানবীয় পাঁচিল ও বন্দুকধারি নিরপত্তার বলয় শত সহস্র বছরের আদিবাসী মানুষকে উন্নয়নের সমানে অজ্ঞ তুচ্ছ অসফল হিসাবে দেগে দিয়ে এককথায় ভাগিয়ে দিতে চায়। অন্যদিকে, আদিবাসী মানুষের জীবনের অর্জিত যা কিছু সবটাই খোলা বাজারে চড়া দামে বিক্রিযোগ্য উন্নত পণ্য।

ঠিক যে ভাবে আফ্রিকার কালো শরীরের মানুষদের দিকে অমর্যাদার নির্লজ্জ নজর ছুঁড়ে দিয়ে সভ্যতার দখলদারি বেনে মনোভাব লাভের ঊর্ধ্বসীমা বাড়িয়ে নিতে শ্রম নিংড়ানো দাস প্রথা ইতিহাসের ভাজে তাজা ঘৃণা-বিদ্বেষ ঠাসা নতুন অধ্যায় শুরু করেছিল। ইতিহাসের সেই অধ্যায় আজ দ্বিগুণ উৎসাহে উদ্দীপনায় প্রযুক্তি বিজ্ঞানের সহযোগিতায় জীবন ও প্রকৃতির গভীরে ভালোবাসার সুর-তাল-ছন্দ লেগে থাকা গান, কবিতার পংক্তিগুলিকে রাতারাতি কেড়ে নিতে চায়। কঠিন-কঠোর দানবীয় আধুনিক নাটুকে উপস্থাপনায় উন্নয়ন উৎযাপনের ট্যাগ ও অশান্তির মন্ত্রণা নিয়ে কর্পোরেট তার কারবার জমাতে শুরু করে।

ওড়িশায় নিয়মগিরিতে সহস্র শতাব্দী পার করা আদিবাসী-মূলবাসী মানুষের অস্তিত্ব প্রকৃতির সাথে সম্পর্কে ঘন বুনোটে জড়িয়ে। আশ্রয় ভরসা জীবন যাপন সবুজ পাহাড় ঘেরা ধুলো মাটি মাখা জীবন প্রবাহকে উন্নয়নের একপোঁচ জৌলুসে দাপট থামিয়ে দিতে চায়। পাঁচশো বছরের দুই সিংহের কারুকাজ খচিত রাজ তোরন রং হারিয়ে ভগ্নপ্রায় হয়ে আদিম প্রকৃতিকে আশ্রয় করা উপস্থিতি এখনও টিকিয়ে রেখেছে। লাঞ্জিগড় রাজপুত ক্ষত্রিয় রাজ পরিবার স্বাধীন দেশে ক্ষমতার প্রতাপ অক্ষুন্ন রাখতে কোনো রকম ব্যবসা বাণিজ্যের পথে পা বাড়ায়নি। কেন কী কারণে এই সংযম? সেসব অন্য আর এক আলোচনার প্রসঙ্গ। এই সময়ের সার সত্য হলো, বর্তমান প্রজন্ম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি রাজা সুরেন্দ্র সিং দেও-এর কাছে অভাব অনটনে জর্জরিত আদিবাসী প্রজাদের খবর থাকে।

ক্ষমতার ভারসাম্য জানে নামে রাজা হলেও তাঁদের বংশ আভিজাত্য সাধারণ মধ্যবিত্ত দৈনন্দিন পরিসর এখন একশো বছরের পুরনো আম গাছের ছায়া জড়ানো উঠোনে ছড়িয়ে রয়েছে। সরকারপক্ষ জমি অধিগ্রহনের সংবিধান স্বীকৃত আইন কানুন নিয়মের পরোয়া না করে রাজার ৭৩৪ হেক্টর বিপুল জমি ও আসবাব গুণ সম্পন্ন গাছ বিনা ক্ষতিপূরণে নিয়ে নিয়েছে। বিচার পেতে রাজাকেও সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করতে হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রবিঠাকুরের পৌষমেলায় গ্রামীণ মানুষ, আদিবাসীরাই এখন সংখ্যালঘু

Poush Mela Shantiniketan: মেলায় ঢুকে পড়েছে কর্পোরেট ব্যবসায়ীরা। বাউল ফকিরদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছে মেলা কর্তৃপক্ষ।

২০০৪ সাল থেকে একতরফা জমি অধিগ্রহণ করার কাজ শুরু করার মধ্যে দিয়ে পূর্বঘাট পর্বতমালার কোল ঘেঁষে থাকা চিরসবুজ এই অঞ্চলে পা রাখে কর্পোরেট সংস্থা বেদান্ত। রাজা তাঁর বাড়ির একাংশ কর্পোরেট বেদান্তকে ভাড়ায় ব্যবহার করতে দেয়। বোঝাই যায়, বিশাল এই বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের খরচ সরকারি চাকরির আয়ে সম্ভব না হওয়ায় বিকল্প এই পথ বাছাই-এর প্রয়োজনীয়তা। এই বাড়ির বৈশিষ্ট্য হলো— রাজপুত ঘরানার পেন্টিং ছাদ থেকে দেওয়াল রঙ্গিন বর্ণময় অতীতকে ধরে রেখেছে। কিছু দিন পেরোতেই দেখা গেল ক্ষমতাশালী ভাড়াটিয়া বেদান্ত সংস্থা রাজপুত ঘরানার পেন্টিং-এর উপর গাঢ় নীল রঙের আস্তারণ লেপে দিয়েছে। অতীত ইতিহাসকে ঢেকে দিতে কুৎসিত নির্মমতা।

ওড়িশার নিয়ম পাহাড়ের কোল ঘিরে থাকা জনজাতির অন্যতম একটি ডোংরিয়া কোন্দ। তাঁরা জীবনে অর্জিত কোনো কিছুর অধিক উৎপাদনে বিশ্বাসী নয়। যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুতেই তৃপ্ত, আস্থাশীল। ফসল থেকে সাজ-সজ্জার উপকরণ, কোনো কিছুই প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত উৎপাদন নয়। ডোংরিয়া জনজাতির নারী-পুরুষ প্রত্যেকেই রুপোর গয়নায় সাজতে পছন্দ করে থাকেন। উন্নত সেঁকরার কারিগরি দক্ষতা দিয়ে চোখ টেনে রাখার মতো গয়না তাঁদের শরীরে জড়িয়ে থাকে। নিজেদের ব্যবহারের জন্য রঙ্গিন সুতোয় নিঁখুত হাতে বয়ন শিল্পীর দক্ষতায় কাপড় বুনে নেন। বর্হিবিশ্বে তাঁদের ব্যবহার্য সামগ্রীর কদর ও চাহিদা বিপুল। স্বভাবে শান্ত লাজুক ডোংরিয়া জনজাতির পুরুষদের ক্ষেত্রে পিঠের সাথে লেপটে থাকা কুঠার গান বাজনার সময় অন্যতম বাদ্য যন্ত্র হয়ে ওঠে। মেয়েদের ক্ষেত্রে মাথার চুলে কারুকাজ করা ছুরি আদতে খোঁপার কাটা হিসাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। শরীরের সাথে জুড়ে থাকা এই হাতিয়ার তাঁদের অস্তিত্বের প্রকাশ। পুরুষদের আছে লম্বা চুলে একপাশ হেলে থাকা খোঁপা। নারী-পুরুষ প্রত্যেকেই তাঁদের লম্বা চুলে বাহারি রঙ্গিন ফুলের সাজ রাখতে পছন্দ করে থাকেন।

লকপদার গ্রামে ডোংরিয়া কন্দ মা ও সন্তান। ছবি- সন্দীপ সাহা।

যাঁদের আরাধ্য দেবতা নিয়ম পাহাড়। এই পাহাড়ের নিচে বক্সাইট নামক খনিজের ভান্ডার। বক্সাইট অ্যালুমিনিয়ামের প্রধান আকরিক। আধুনিক পৃথিবীতে এই অ্যালুমিনিয়াম নামক হালকা ধাতুর কদর ঠিক কতটা সেটা আন্দাজ করতে খুব অসুবিধা হয় না। যেমন অনেক দূরের ইলেকট্রিক সাপ্লাই, বিমান, মহাকাশযান এমনকী আধুনিক বহুতল নির্মাণে এই ধাতুর কদর যথেষ্ট। লোভ ও লাভের ফর্মুলা আদিবাসী জনজাতির আরাধ্য দেবতা নিয়ম পাহাড়কে হত্যা করতে চায়। ঘটনাটির সার হলো বৃহৎ গণতন্ত্র ও সেকুলার দেশে ক্ষমতা না থাকা সংখ্যালঘু মানুষের দেবতা গুরুত্বহীন।

কর্পোরেট বেনেদের প্রতিটি পদক্ষেপে ধুর্তর নেকড়ের ছায়া। দেবতাকে রক্ষা করতে ডোংরিয়া আদিবাসী জনজাতির লাগাতার অহিংস আন্দোলনের ঢেউ সুদূর সুপ্রিম কোর্টকেও প্রকৃতি পরিবেশ ও আদিম জনজাতির সংস্কৃতি রক্ষার পক্ষে রায় দিয়ে কর্পোরেট হানাদারদের রুখতে অবস্থান নিতে হয়েছিল। ভুলে গেলে চলবে না বেদান্তের জল-জঙ্গল-জমি উচ্ছেদ প্রকল্পের বিরোধিতা করে অহিংস পথে বিস্থাপন বিরোধী সাংস্কৃতিক কর্মী শুক্র মাঝি বারিপটাকা শহিদ হন। এখানেই শেষ নয় তারপরও শহিদ হয়েছেন। লকপদা গ্রামে ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ঝাড়খন্ডের শহিদ বিরসা মুন্ডার উত্তরসূরী শহিদ শুক্র মাঝি শহিদ বারিপটাকা-র শহিদ বেদি রাষ্ট্রীয় হত্যা রাজনীতির প্রমাণ। সেই প্রমাণ লোপাট করতে গ্রামে গ্রামে সরকার বন্দুক হাতে পুলিশ মোতায়েন করে থাকে যাতে রাষ্ট্রের দ্বারা পরিচালিত হত্যার কোনো প্রমাণ ভবিষ্যতের হাতে না পৌঁছায়।

নিয়মগিরি পাহাড়ের কোলে ডংরিয়া গ্রামে তিন বীর শহিদ বিরসা মুনডা, শুক্র মাঝি, বাড়ি পিডাকা। পেন্টার- লেনিন কুমার। ছবি- সন্দীপ সাহা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অস্তিত্ব সংকটে অ্যামাজন! তেল আগ্রাসনের বলি ৪০০-রও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠী

Amazonas River : এছাড়া এখানে ৪০০-র বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করে, যাদের মধ্যে অনেকেই এখনো বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগহীন। সুকুরিজু ও আশপাশের অঞ্চলগুলো তাই শুধুমাত্র পরিবেশগত নয়, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক সংকটের মুখে।

২০২০ সালের আগের থেকেই ধারাবাহিক ভাবে দিনে রাতে সংবিধানের ধারা উপধারা বেমালুম বদলে যায়। সুপ্রিম কোর্টের ২০১৩-এর রায় ঘোষণা এভাবেই চোখের সামনে শিথিল হয়ে আসে। দিনের আলোর মতো স্পষ্ট উদ্দেশ্যে নিয়ম পাহাড়কে মাঝে রেখে, সরকারি সহায়তায় বেদান্ত গোষ্ঠীর বিস্তার নীতি এগিয়ে চলছে। আগামী ২০৩৬ সালকে সামনে রেখে ভারতীয় মুদ্রায় ৫০০ বিলিয়ন আর্থিক লক্ষ্য মাত্রা পূরণ করতে নিয়ম পাহাড়ের এই অঞ্চলে বেদান্ত ও সরকারের উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো।

নিয়মগিরি পাহাড়ে, নিয়মগিরি উৎসবে শহিদ বাড়ি পিডাকা-সহ সকল শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এক পরম্পরা হয়ে উঠেছে। ছবি- সন্দীপ সাহা।

মাটির নিচে সঞ্চিত বক্সাইট ভান্ডার নিয়ম পাহাড়ের নদী ঝড়নার জলকে ধরে রাখতে ও পরিস্রুত রাখতে ভূমিকা নিয়ে থাকে। নিয়ম পাহাড়ের ঢাল এই আদিবাসী সমাজের ঘর-বাড়ি ও প্রতিদিনের জীবন সংস্কৃতির আশ্রয়স্থল। সরকারি সহযোগিতায় কর্পোরেট শক্তি এই আশ্রয় ও সংস্কৃতি দিনে-দুপুরে ছিনিয়ে নিতে প্রযুক্তি নির্ভর করাত ব্যবহার করে বিপুল সংখ্যক গাছ কেটে পাহাড়ের উচ্চতাকে ধুলোয় মিশিয়ে উন্নয়নের বারো মাসের পার্বণ পালন হয়ে চলেছে।

চোখে আঙ্গুল দিয়ে আদিবাসী জনজাতিকে সভ্যতা উন্নয়নের হিসাব অসভ্য-অশিক্ষিত এই স্বীকৃতিতে চিহ্নিত করে থাকে। মহৎ কিছু নমুনা রেখে শ্রমিক হিসাবে কাজ দেওয়াকে উপলক্ষ করে সস্তায় শ্রম চুরি জায়েস সেই সাফাইও গেয়ে থাকে। বিশ্বজোড়া এক অক্ষর এক শিক্ষার আধারে চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পাকা দালান ঘেরা ব্যবস্থায় আটক শিক্ষাকে এককমাত্র হিসাবে চাপিয়ে দিয়ে প্রকৃতির সাথে জুড়ে থাকা শিক্ষা-সংস্কৃতির সবটা উচ্ছেদ করে দেউলিয়া ও নাকাল করে দিতে কোন ফাঁকি রাখতে চায় না।

লাঞ্জিগড়ে বেদান্ত কোম্পানির পাহাড় দখলের প্রতিবাদ জমায়েতে ডংরিয়া কন্দ মহিলারা। ছবি- সন্দীপ সাহা।

রবি ঠাকুরের ‘তোতাকাহিনী’-ছোটগল্পে তোতা সভ্যতার অনুশাসন মেনে ক্ষমতায় থাকা শাসকের শিক্ষা ব্যবস্থার ল্যাবরোটারিতে কেবল অসভ্য অশিক্ষিত স্পেসিমেন। যাকে সভ্যতার উপযোগী করে গড়ে নিতে হবে। সভ্যতার কাছে এই ‘তোতা’ জীবন প্রকৃতি বিচ্ছিন্ন শুকনো শিক্ষাব্যবস্থার সংখ্যালঘু প্রতিনিধি। সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষমতার কাছে যে তোতা পরাধীনতা-অমর্যাদা-অসমতা নিয়ে বন্দি। ঠিক তেমনই এই সভ্যতায় সফল হয়ে ওঠা ছাঁচে গড়া শিক্ষাব্যবস্থা আদিবাসী নতুন প্রজন্মকে বিনোদন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ ক্রেতা তৈরির অভিনব কর্মশালায় দাখিল করে নিতে চায়। অনিবার্য চাহিদায় হাতে মোবাইল ও মোটর সাইকেলের গতিতে জীবন গড়িয়ে দিয়ে দূরত্ব অতিক্রম করার অব্যর্থ নেশা আদিবাসী জনজাতিকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। নিজের জীবন থেকে, প্রকৃতি থেকে, সংস্কৃতির থেকে।

জীবন ও এলাকার শান্তি প্রতিষ্টা, প্রকৃতির সজীব সবুজ উপস্থিতিকে ফিরে পেতে কিংবা বেদান্তের মতো কর্পোরেট শক্তির লুঠের বিরোধিতায় যৌথ উচ্চারণ রাখার চেষ্টা হলে পুলিশ প্রশাসন, জলপাই পোশাক, গুলি ভরা বন্দুক হাতে গোটা পৃথিবী থেকে এই অঞ্চল বিচ্ছিন্ন রাখতে চায়। ১২.১০.২০২৫ লাঞ্জিগড়ে আদিবাসী মানুষের প্রতিবাদ মিছিল হয়ে উঠতে পারে এই আশঙ্কায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি ১০০ কিমি দূরের রাস্তাতেই আটক করে। আমদের কাগজ (আই কার্ড) দেখানোর পর কড়া কঠিন জেরার মুখোমুখি হতে হয়। কেন যাব লাঞ্জিগড়? শহরে থেকে আসা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত অর্থনীতি কাঠামোর মানুষকে রক্ষা করার অব্যর্থ উচ্চারণ গোপান না করে সরাসরি বলেই ফেললেন উর্দিধারী,

আদিবাসী মানুষ ভয়ানক হিংস্র। খামোখা বিপদে পড়ে যাবেন। আদিবাসীরা বেদান্তের বিরুদ্ধে একত্রিত হতে চাইছে।

প্রশ্ন হলো, স্বাধীনতা-সমতা-মর্যাদা-র পক্ষে দাঁড়িয়ে বৃহৎ গণতন্ত্রের দেশে কোন পক্ষ সুরক্ষিত? বা কোন পক্ষ বঞ্চিত হচ্ছে?

লেখকের মতামত ব্যক্তিগত দিতে হবে

লিখেছেন
Koyel Saha
Koyel Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?