কোন শর্তে কাকে ভোট দেয় বাংলার মেয়েরা?
পশ্চিমবঙ্গে নারী ভোটারদের ভূমিকা ক্রমশই নির্ধারক হয়ে উঠছে। ২০১৯ সাল থেকে মহিলাদের ভোটদানের হার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, আর ২০২৬-এর প্রথম দফায় তা অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে— বিশেষত যাঁদের নাম বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR)-এর পরেও তালিকায় রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফাতেই নজির গড়েছে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ। ২৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় ভারতের নির্বাচন কমিশন-এর প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের প্রথম দফায় রেকর্ড হারে ভোট পড়েছে; মোট ভোটের হার দাঁড়িয়েছে ৯১.৭৮ শতাংশ। লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যান আরও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রেস ইনফর্মেশন ব্যুরো (PIB)-র তথ্য বলছে, পুরুষ ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল ৯০.৯২ শতাংশ, সেখানে নারী ভোটারদের হার ছুঁয়েছে ৯২.৬৯ শতাংশ অর্থাৎ স্পষ্টভাবে এগিয়ে মহিলারা। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের অংশগ্রহণের হার ৫৬.৭৯ শতাংশ।
এই বিপুল ভোটদানের হার এবং বিশেষ করে নারী ভোটারদের সক্রিয় উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও জোর চর্চা শুরু হয়েছে। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী ভারতীয় জনতা পার্টি— উভয়ই এই প্রবণতাকে ‘ইতিবাচক’ বলে দাবি করছে। যদিও দুই পক্ষই নিজেদের পক্ষে জনসমর্থনের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছে এই উচ্চ ভোটদানের হারকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী ভোটারদের এই বিপুল অংশগ্রহণ কেবল সংখ্যার নিরিখে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং তা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে প্রথম দফার এই পরিসংখ্যান আগামী পর্যায়ের ভোটের আগে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। যে কারণে রাজনৈতিক দলগুলি ইশতেহারে এবং প্রচার মহিলাদের ভাতা দেওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্বও দিচ্ছেন। ভোটের মুখে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার-এর ভাতা বাড়িয়ে ১৫০০ টাকা করেছে এবং তপশিলি জাতি, উপজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির জন্য ১৭০০ টাকা করেছে তৃণমূল। পাল্টা বিজেপি বলছে ক্ষমতায় এলে ৩ হাজার টাকা দেবে। কিন্তু ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে কে কত টাকা দিচ্ছে, সেটাই কি মহিলাদের একমাত্র বিচার্য বিষয়?
Sabar Institute-এর বিশ্লেষণ বলছে, বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া বা নিষ্পত্তি না হওয়া ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৬১.৮ শতাংশই নারী। এর ফলে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় ৬১.৯৩ লক্ষ যোগ্য নারী ভোট দিতে পারবেন না। রাজ্যের ২৯৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ২১৯টিতেই বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। বিশেষ করে মুসলিম, তফসিলি জনজাতি ও মতুয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। ট্রাইব্যুনালে যদিও খুবই কম সংখ্যক ভোটারের নিষ্পত্তি হয়েছে প্রথম দফার ভোটের আগে; ১৩৮ জনের নিষ্পত্তি হয়েছে আর ভোটার তালিকায় উঠেছে ১৩৬ জনের নাম। দ্বিতীয় দফার আগে কতজন ভোটারের নিষ্পত্তি হয়, এখন সেটাই দেখার।
পশ্চিমবঙ্গে নারী ভোটারদের ভূমিকা ক্রমশই নির্ধারক হয়ে উঠছে। ২০১৯ সাল থেকে মহিলাদের ভোটদানের হার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, আর ২০২৬-এর প্রথম দফায় তা অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে— বিশেষত যাঁদের নাম বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR)-এর পরেও তালিকায় রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইনস্ক্রিপ্ট-এর পডকাস্ট ‘ক্যালকাটা ডায়লগস’-এ উপস্থিত ছিলেন সমাজকর্মী শতাব্দী দাস, রিমঝিম সিনহা এবং থিয়েটার কর্মী মধুরিমা গোস্বামী। নারী ভোটের প্রবণতা, SIR বিতর্ক এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের মত তুলে ধরলেন তাঁরা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সবথেকে ভয়ের বিষয় হলো, যখন কোনো প্রচারকে দেখে আর প্রচার বলে মনে হয় না। সম্প্রতি শালিনী মুখার্জি ব্যানার্জি নামে এক ইনফ্লুয়েন্সার একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করেছেন, যেখানে দেখা যাচ্ছে বিজেপি প্রতিটি রিল ভিডিওর জন্য ২০,০০০ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
SIR: আতঙ্ক, বঞ্চনা এবং নীরব ক্ষোভ
শতাব্দী দাসের মতে, SIR প্রক্রিয়াকে ঘিরে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা ভোটের আচরণে প্রভাব ফেলতেই পারে। তাঁর বক্তব্য, “যে দল এই প্রক্রিয়ার জন্য দায়ী বলে মানুষ মনে করছে, তাদের পক্ষে নারী ভোট যাওয়ার সম্ভাবনা কম।” ইঙ্গিত স্পষ্টভাবেই বিজেপির দিকে।
তবে রিমঝিম সিনহার যুক্তি, যাঁদের বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও নাম বাদ পড়েছে, তাঁরা তো ভোটই দিতে পারবেন না— ফলে তাঁদের ক্ষোভ ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ, বঞ্চনার একটি বড় অংশ নির্বাচনী ফলাফলে সরাসরি ধরা পড়বে না।
ভাতা বনাম উন্নয়ন
নারীদের জন্য ভাতা প্রকল্প নিয়ে আলোচনায় উঠে আসে দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি। শতাব্দী দাস মনে করেন, ভাতা দেওয়া খারাপ নয়, কিন্তু সেটাই শেষ কথা হতে পারে না। তাঁর কথায়, “উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ভাতার পর সুরক্ষা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়া উচিত ছিল।”
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Election 2026: তৃণমূল, বিজেপি, বাম ও কংগ্রেস—কে কী প্রতিশ্রুতি দিল ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ ভোটে? কার ইস্তাহারে রয়েছে বেশি চাকরির আশ্বাস, মহিলাদের জন্য ভাতা, অনুপ্রবেশ রোধ বা শিল্পের প্রতিশ্রুতি? ভোটারদের মন জিততে কোন দল সবচেয়ে বড় বাজি ধরল?
অন্যদিকে, মধুরিমা গোস্বামী বলেন, এই ভাতা বহু মহিলার কাছে আর্থিক স্বাধীনতার প্রথম দরজা খুলে দিয়েছে। একইসঙ্গে তিনি জোর দেন সচেতনতার উপর— মহিলাদের বোঝাতে হবে যে এই ভাতা তাঁদের অধিকার, দয়া নয়।
নারী ভোট: ‘ডিসাইডিং ফ্যাক্টর’, কিন্তু কোন দিকে?
আলোচনায় একাধিকবার উঠে আসে, নারী ভোটই হতে পারে নির্বাচনের ‘ডিসাইডিং ফ্যাক্টর’। কিন্তু সেই ভোট কোন দিকে যাবে, তা সরল সমীকরণে মেলে না। শতাব্দী দাসের পর্যবেক্ষণ, “শুধু কোনও একক ইস্যু নয়, মহিলারা ভাববেন কে তাঁদের বেশি সুযোগ দেবে। শেষ পর্যন্ত ‘কম খারাপ’ বিকল্পকেই বেছে নেওয়ার প্রবণতা কাজ করবে।”
রিমঝিম সিনহা আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, “২০১১-তে মানুষ সিপিএমকে চাইছিল না বলে তৃণমূল জিতেছিল। এখন তৃণমূল জিতছে, কারণ মানুষ বিজেপিকে চাইছে না।” তাঁর মতে, বিকল্পের অভাবই বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার মূল চাবিকাঠি।
আন্দোলন, অভয়া ও বাস্তব ভোট-রাজনীতি
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সকলের মতের, ইচ্ছের পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে মোটামুটি সকলেই একমত— পরিবর্তন দরকার। কিন্তু ধর্মের রাজনীতি জায়গা ভারতবর্ষ নয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মৌলিকার কথায়, "একই সরকার ৫ বছর থাকার পর অন্য কাউকে সুযোগ দেওয়া উচিত। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে দুর্নীতি তারা করবেই।"
‘অভয়া’ আন্দোলন প্রসঙ্গেও ভিন্ন মত উঠে আসে। মধুরিমা গোস্বামীর মতে, এই ধরনের আন্দোলন জনমনে আলোড়ন তুললেও দীর্ঘমেয়াদে ভোটে তার প্রভাব সীমিত। তাঁর মতে, “ভাতা ও আর্থিক বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়।”
রিমঝিম সিনহার বক্তব্য আরও তীব্র। তাঁর দাবি, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বৃহত্তর ন্যায়বিচার, কিন্তু তা একক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। শতাব্দী দাসও মনে করেন, এই আন্দোলন নারীদের সংগঠিত হওয়ার এক সূচনাবিন্দু হলেও, নেতৃত্বের অভাব ও ভিন্ন মতাদর্শের কারণে তা পূর্ণ শক্তিতে এগোতে পারেনি।
মিডিয়া, পুরুষতন্ত্র ও প্রান্তিক কণ্ঠ
আলোচনায় উঠে আসে মিডিয়ার ভূমিকাও। রিমঝিম সিনহার অভিযোগ, “মেয়েদের কথা শোনার ধৈর্য মিডিয়া বা সমাজের খুব কমই আছে। পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনও প্রভাব ফেলছে।” তাঁর মতে, সংগঠিত পরিকাঠামোর অভাবে নারীদের আন্দোলন সহজেই প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবই নির্ধারক
আলোচনার সারমর্মে একটি বিষয় স্পষ্ট— রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিশ্রুতি বা ম্যানিফেস্টো নিয়ে আস্থা খুব কম। অংশগ্রহণকারীদের মতে, সংসদীয় রাজনীতিতে বারবার হতাশার অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। ফলে নারী ভোটাররা আবেগ নয়, বাস্তব প্রয়োজন— সুযোগ, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেবেন।
২০২৬-এর নির্বাচনে তাই নারী ভোট শুধু সংখ্যার নিরিখে নয়, রাজনৈতিক বার্তাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে সেই বার্তা কোনও একমুখী নয়— বরং জটিল, বহুমাত্রিক এবং অনেক ক্ষেত্রেই ‘কম খারাপ’ বেছে নেওয়ার বাস্তব রাজনীতির প্রতিফলন।






