বিক্ষিপ্ত অশান্তি আর রেকর্ড ভোটদান | প্রথম দফায় যা দেখল বাংলা
West Bengal polls 2026: সারাদিন কী ঘটল প্রথম দফার ভোটে? সকাল থেকে কোথায় কোথায় সংঘর্ষ, হামলা ও অশান্তির অভিযোগ উঠল? কেন এত উত্তেজনার মধ্যেও ৯১ শতাংশের বেশি ভোট পড়ল? আর সামশেরগঞ্জে রেকর্ড অংশগ্রহণ কী ইঙ্গিত দিচ্ছে—ভয়, ক্ষোভ নাকি প্রতিবাদের ভোট?
পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটে দিনভর যে ছবি উঠে এল, তা একদিকে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের, অন্যদিকে উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও অভিযোগে ভরা এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভোটের যে চিত্র দেখা গেল, তা ভোটগ্রহণের সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক উত্তাপেরও ইঙ্গিত দিল।
ভোর হতেই রাজ্যের একাধিক জেলায় ভোটারদের লম্বা লাইন চোখে পড়ে। গ্রামাঞ্চল হোক বা শহর, সাধারণ মানুষ সকাল সকাল বুথে পৌঁছে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে শুরু করেন। প্রথম কয়েক ঘণ্টায় ভোটের হারও যথেষ্ট ভালো ছিল, যা স্পষ্ট করে যে অশান্তির আশঙ্কা থাকলেও ভোটারদের উৎসাহ কমেনি। তবে এই ইতিবাচক ছবির পাশাপাশি দিনের শুরু থেকেই একাধিক জায়গায় অশান্তির খবরও সামনে আসে।
মুর্শিদাবাদের নওদা বিধানসভা কেন্দ্র দিনভর আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। কংগ্রেস প্রার্থী হুমায়ূন কবীরকে ঘিরে সকাল থেকেই উত্তেজনা ছড়ায়। তিনি বুথে পৌঁছতেই তৃণমূল কর্মীদের ‘গো ব্যাক’ স্লোগান পরিস্থিতিকে দ্রুত উত্তপ্ত করে তোলে। মুহূর্তের মধ্যে দু'পক্ষের মধ্যে বচসা, ধস্তাধস্তি এবং হাতাহাতি শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, কেন্দ্রীয় বাহিনীর সামনেই এই সংঘর্ষ চলতে থাকে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। ওই ঘটনায় তিন জনকে আটক করা হয়েছে বলে খবর।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন তৃণমূল কর্মীরা রাস্তা অবরোধ করে বসে পড়েন, যার ফলে হুমায়ুন কবীরের কনভয় আটকে যায়। পাল্টা প্রতিবাদে তিনিও মাঝরাস্তায় বসে পড়েন। এই টানটান পরিস্থিতি দীর্ঘক্ষণ ধরে চলার পর পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু এই ঘটনা ভোটের দিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।
দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জেও একই রকম উত্তেজনার ছবি সামনে আসে। বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সরকারকে ঘিরে সংঘর্ষের অভিযোগ ওঠে। একটি বুথে বিজেপির পোলিং এজেন্টকে বসতে দেওয়া হয়নি, এই অভিযোগ পেয়ে তিনি সেখানে গেলে তর্কাতর্কি শুরু হয়। পরে অভিযোগ ওঠে, একদল দুষ্কৃতী তাঁকে ঘিরে ধরে মারধর করে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং কমিশন তদন্ত শুরু করেছে। যদিও শাসকদলের তরফে এই অভিযোগ নিয়ে সরাসরি প্রতিক্রিয়া মেলেনি, তবুও ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
ভোটের আগের রাতেও উত্তেজনা থামেনি। মুর্শিদাবাদের ডোমকল এলাকায় তৃণমূল ও সিপিএম কর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ধারাল অস্ত্রের কোপে একাধিক ব্যক্তি জখম হন এবং তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। এলাকায় রাতভর পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহলদারি চলে। এই ঘটনার পরদিন সকাল থেকেই ভোট শুরু হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছিল চোখে পড়ার মতো।
পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্রেও ভোটের দিন অশান্তির ছবি সামনে আসে। বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালের গাড়িতে হামলার অভিযোগ ওঠে। বুথ পরিদর্শন সেরে ফেরার পথে তাঁর গাড়িতে পাথর ছোড়া হয়, এতে গাড়ির কাচ ভেঙে যায়। তিনি এই ঘটনাকে পরিকল্পিত হামলা বলে দাবি করেন এবং থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে।
প্রথম দফার ভোটগ্রহণ পর্বের শেষ দিকে বীরভূমের সাঁইথিয়া বিধানসভা কেন্দ্রের সিউড়ি ২ ব্লকে উত্তেজনা ছড়ায়। তৃণমূল এবং বিজেপির সংঘর্ষ। এই ঘটনা ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। ওই এলাকায় ২৮১ নম্বর বুথে বিজেপি একটি সহায়তাকেন্দ্র খুলেছিল বলে খবর স্থানীয় সূত্রে। তৃণমূল সেখানে হামলা করে ওই সহায়তাকেন্দ্র বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ। ওই ঘটনা কেন্দ্র করেই সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয় দু’পক্ষের মধ্যে।
বহরমপুরের কংগ্রেস প্রার্থী অধীররঞ্জন চৌধুরীর পোলিং এজেন্টের পরিবারের সদস্যদের উপরও হামলার অভিযোগ উঠল। কংগ্রেসের অভিযোগ, বহরমপুরের পীরতলা (কান্তনগর) এলাকায় তাদের পোলিং এজেন্টের পরিবারের সদস্যদের মারধর করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, এই হামলা চালিয়েছে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা। ঘটনাস্থলে পৌঁছন অধীর। সেখানে গিয়ে তিনি বলেন, তৃণমূলদের টার্গেট শেষ বেলায় কিছু বুথ লুট করা। সেখানে ধীরে ভোট হচ্ছিল বলেও অভিযোগ তাঁর। বহু মানুষ ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও কিছু বুথকে তৃণমূল শেষ বেলায় দখল করার চেষ্টা করছে বলেই পরিকল্পিত ভাবে এজেন্টের গায়ে হাত দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ অধীরের।
কোচবিহারের সিতাই বিধানসভা এলাকায় আবার বিজেপি কর্মীকে খুনের চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। ওই দুষ্কৃতী তৃণমূল আশ্রিত বলে অভিযোগ।
পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ে এক তৃণমূল কর্মীকে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ‘বিনা কারণে মারধর’-এর অভিযোগ। ‘আক্রান্ত’ ওই ব্যক্তি তৃণমূলের প্রাক্তন বুথ সভাপতি বলে দাবি তৃণমূল প্রার্থী মানস ভুঁইয়ার। সবংয়ের সাউতপাড়া এলাকার ১৪৫ নম্বর বুথে ভোট দিতে যাওয়ার সময় বিনা প্ররোচনায় তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ।
বীরভূমের দুবরাজপুর বিধানসভায় খয়রাশোল ব্লকের ৬৫ নম্বর বুথেও ভোটারদের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায়। অভিযোগ, ইভিএমে গোলমালের জেরে প্রায় আধ ঘণ্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল খয়রাশোলে। তার জেরেই বিক্ষোভ এবং সেই বিক্ষোভ থেকেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে ভোটারদের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ। উত্তেজিত জনতার একাংশ বাহিনীর দিকে তেড়ে যায় এবং ইট ছু়ড়তেও উদ্যত হন তাঁরা। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কয়েকজন জওয়ান জখম হয়েছেন এই ঘটনায়। পুলিশকে পিস্তল বের করতে হয় পরিস্থিতি সামলাতে।
অন্যদিকে, আবার রাজনীতির সৌজন্যের এক টুকরো ছবি ধরা পড়ল। পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুর সদরে রাজ্যের প্রথম দফা ভোটের দিন হঠাৎই মুখোমুখি হয়ে গেলেন দুই প্রার্থী। তৃণমূলের প্রদীপ সরকার এবং বিজেপির দিলীপ ঘোষ। দেখা হতেই হাসিমুখে হাত মেলালেন তাঁরা। প্রদীপ সরকারকে পাশে নিয়ে দিলীপ ঘোষ বলেন, এটাই তাঁদের রাজনীতি এবং এটাই সারা পশ্চিমবঙ্গে হোক। প্রদীপ সরকারও বলেন, মানুষ যাঁকে পছন্দ করবে, তাঁকে ভোট দেবে।
ভোট দিতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুও হয়েছে পাঁচ জনের। পূর্ব ও পশ্চিম দুই মেদিনীপুর, কেশপুর, মালদহ ও বীরভূমে সবমিলিয়ে পাঁচ জন ভোটার প্রাণ হারিয়েছেন বলে খবর।
বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, ভোটের পরিবেশকে অশান্ত করে তুলতেই বিভিন্ন ধরনের হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, ভোটারদের মধ্যে ভয় তৈরি করে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে শাসকদলের পক্ষ থেকেও পাল্টা অভিযোগ তোলা হয়েছে যে বিরোধীরাই ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য।
এই অশান্তির আবহে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও সামনে আসে। বহরমপুর কেন্দ্রের কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী মন্তব্য করেন,
“ধর্মের কল বাতাসে নড়ে” অর্থাৎ এত অভিযোগের পেছনে কিছু না কিছু সত্যতা থাকতেই পারে। তিনি জোর দেন, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত এবং সত্য সামনে আনা জরুরি।
অন্যদিকে হুমায়ুন কবীর অভিযোগ করেন যে তাঁকে এবং তাঁর সমর্থকদের পরিকল্পিতভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছে এবং তাঁর সমর্থকদের উপর অযথা কড়া ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রতিবাদেই তিনি রাস্তার মাঝখানে বসে ধর্না দেন এবং আরও নিরাপত্তার দাবি জানান।
এই সমস্ত ঘটনার মধ্যেও ভোটদানের হার কিন্তু কমেনি। সারাদিনে রাজ্য জুড়ে ৯২.৩৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ কথাও বলতেই হয়, সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে সামসেরগঞ্জ আসনে। সেখানে ভোটদানের হার ৯৫.৩৪ শতাংশ। অথচ এই সামশেরগঞ্জই এমন একটি এলাকা, যেখানে এসআইআর প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। দুপুর ১টার মধ্যেই মুর্শিদাবাদে ভোট পড়েছিল প্রায় ৭১.৭ শতাংশ। গত লোকসভা নির্বাচনে এসআইআর প্রক্রিয়া ছিল না। সেই সময় দুপুর একটা পর্যন্ত যে পরিমাণ ভোট পড়েছিল, তার তুলনায় এবার অনেক বেশি ভোট পড়েছে একই সময়সীমার মধ্যে। শুধু তাই নয়, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সারাদিনে ৭৯.৯২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। ফলে স্পষ্ট, এবারের ভোটে অংশগ্রহণের আগ্রহ এবং তাগিদ দুই-ই বেড়েছে।
ভোটের এই উচ্চ হারকে ঘিরে রাজনৈতিক মহল ও বিশ্লেষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা ব্যাখ্যা। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ভোটাধিকার হারানোর ভয়ই এই হারে ভোট পড়ার কারণ। তাঁদের মতে, এই ভোট শুধুই উপস্থিত ভোটারদের অংশগ্রহণ নয়, এর মধ্যে রয়েছে এক ধরনের প্রতিবাদের সুরও। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, যাঁরা ভোট দিতে পারছেন, তাঁদের অনেকেই যেন ভোট দিচ্ছেন শুধু নিজের জন্য নয়, তাঁদের জন্যও, যাঁরা এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। মুর্শিদাবাদের সুতি বিধানসভা কেন্দ্রের দেবীপুর এলাকার ভোটাররা পড়শিদের ‘নাম বাদ যাওয়ার’ প্রতিবাদে জামায় কালো ব্যাজ এঁটে ভোট দিতে যান।
প্রসঙ্গত, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনায় স্পষ্ট প্যাটার্ন দেখা গিয়েছে—সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা, মালদহ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব বর্ধমানে, যেখানে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা বেশি। নির্বাচন কমিশন বলছে এটি মৃত, ডুপ্লিকেট ও অযোগ্য ভোটার বাদ দেওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করা হয়েছে। তৃণমূলের দাবি এতে তাদের ভোটে প্রভাব পড়ছে, বিজেপি বলছে এতে নির্বাচন আরও স্বচ্ছ হয়েছে। এই বিতর্কের মাঝেই সামশেরগঞ্জে সর্বোচ্চ ভোটদানের হার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
সামনে রয়েছে আরও এক দফার ভোট। প্রথম দিনের এই অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, আগামী দিনগুলিও সমানভাবে উত্তপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।






