হরমুজ সংকটে তেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হলে...
Hormuz Strait crisis: হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হলে ভারতের তেল সরবরাহে কী হবে? মজুত কতদিন চলবে, আর দীর্ঘমেয়াদে কি তেলের দাম, মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনীতি বড় সংকটে পড়বে? জ্বালানি, পরিবহন, কৃষি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব কতটা গুরুতর হতে পারে?
পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় ভারতে উদ্বেগ বাড়ছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ যায়। ভারত তার আমদানি করা ক্রুড তেলের ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ এই পথেই পায়। দেশের ৮৫-৯০ শতাংশ তেল বিদেশ থেকে আসে। জনমানসে প্রশ্ন, সরবরাহ একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে ঠিক কী হতে পারে?
যুক্তি বলছে, প্রথমে সরকারি স্ট্র্যাটেজিক মজুত (বর্তমানে মাত্র ৫-৬ দিনের) এবং বাণিজ্যিক মজুত (মোট মিলিয়ে প্রায় ৭৪ দিনের) দিয়ে কিছুটা সময় কাটানো যাবে। কিন্তু দীর্ঘদিন চললে তেলের দাম হু হু করে বাড়বে, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধাক্কা লাগবে।
সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব
তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে ভারতের মুদ্রাস্ফীতি ০.২-০.২৫ শতাংশ বাড়ে এবং জিডিপি বৃদ্ধি ০.১-০.২ শতাংশ কমে। এই সংকটে তেলের দাম ১০০-১৫০ ডলারে পৌঁছলে জিডিপি বৃদ্ধি ০.৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। টাকার দাম পড়বে, আমদানির খরচ বাড়বে এবং সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার মিশ্রণ (স্ট্যাগফ্লেশন) দেখা দিতে পারে।
কোন ক্ষেত্রে কী প্রভাব
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত
তেল-গ্যাস সরবরাহ কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে। যা আমরা ইতোমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। এলপিজি আমদানির বড় অংশ হরমুজ হয়ে আসে। ফলে রান্নার গ্যাসের সংকট তৈরি হবে। চাপ বাড়বে হেঁশেলে, খাবারের দোকানে। ছোট-বড় কারখানা ও কৃষি সেচে ডিজেল জেনারেটরের খরচ বাড়বে।
রোজের পণ্য
পরিবহন খরচ বাড়লে দৈনন্দিন পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে। হোটেল, রেস্তোরাঁ ও অনলাইন ডেলিভারি সার্ভিসের খরচ বেড়ে মুনাফা কমবে। সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি পাবে।
পরিবহন ও লজিস্টিকস খাত
ডিজেল ও বিমান জ্বালানির দাম বাড়লে ট্রাক, বাস, ট্রেন ও উড়ানের খরচ বৃদ্ধি পাবে। পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়বে। বাড়বে চালানি মাছ, দুধ, ডিমের দাম।
শিল্প ও উৎপাদন খাত
প্লাস্টিক, রাসায়নিক, টায়ার, পেইন্টের মতো তেল-নির্ভর কাঁচামালের দাম বাড়বে। ছোট ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উৎপাদন খরচ বেড়ে অনেক ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বড় কোম্পানিগুলি কিছুটা সামলাতে পারলেও ছোট ইউনিটগুলির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।
কৃষি খাত
সার তৈরিতে গ্যাস লাগে। সারের দাম বাড়লে চাষের খরচ বৃদ্ধি পাবে। ডিজেল-চালিত ট্র্যাক্টর ও পাম্পের খরচ বেড়ে ফসলের উৎপাদন খরচ বাড়বে। খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ মানুষের খাবারের খরচ বাড়বে। ছোট চাষিরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বেন।
আর্থিক ও বৈদেশিক খাত
টাকার দাম পড়লে আমদানি আরও ব্যয়বহুল হবে। সরকারকে জ্বালানি ভর্তুকি বাড়াতে হলে রাজকোষ ঘাটতি বৃদ্ধি পাবে। এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ছোট ব্যবসায়ী, চাষি, পরিবহনকর্মী ও সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। সরকার যদি দ্রুত বিকল্প তেলের উৎস (রাশিয়া, আফ্রিকা) খুঁজে এবং মজুত সঠিকভাবে ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দেয়, তাহলে ধাক্কা অনেকটা কমানো সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সংকট হলে অর্থনীতিতে মন্দা ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হবে। আগামী কয়েকটা দিন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তারও বড় পরীক্ষা।






