সারাদিন ঘুম পায়, এনার্জির অভাব? এই বিরল রোগে ভুগছেন না তো?

অনেকে আবার ইমসমনিয়ার বদলে অন্য এক ধরনের ঘুম-সংক্রান্ত সমস্যায় ভোগেন, যার নাম হাইপারসমনিয়া। এক্ষেত্রে ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ, এই সমস্যা দেখা দিলে মানুষ সারাদিনই প্রায় ঘুমিয়ে থাকে।

Piya Saha
৩ মিনিট
সারাদিন ঘুম পায়, এনার্জির অভাব? এই বিরল রোগে ভুগছেন না তো?

বর্তমান সময় অনেকেরই ঘুমের সমস্যা দেখা যায়। কারও কারও রাতের বেলা ঘুম আসতে চায় না, আবার সকালে ঘুম ভাঙতে চায় না। ফলে শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। নিদ্রাহীনতার চিকিৎসার জন্য অনেক ধরনের ওষুধ আজ বাজারে রয়েছে। অনেকে আবার ইমসমনিয়ার বদলে অন্য এক ধরনের ঘুম-সংক্রান্ত সমস্যায় ভোগেন, যার নাম হাইপারসমনিয়া। এক্ষেত্রে ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ, এই সমস্যা দেখা দিলে মানুষ সারাদিনই প্রায় ঘুমিয়ে থাকে।

হাইপারসমনিয়া কী?

ক্লিভেল অ্যাণ্ড ক্লিনিক অর্গানাইজেশনের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ঘুমের পরেও অনেকে জেগে থাকতে বা পারিপার্শ্বিক দৈনন্দিন পরিবেশ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে পারেন না। এই অবস্থাকে হাইপারসমনিয়া বলা হয়। এর ফলে কর্মজীবন, সামাজিক এবং সাধারণ জীবনযাপনে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় ওই ব্যক্তিকে। অনুমান করা হয় এই মুহূর্তে পৃথিবীর প্রায় ৫% মানুষ হাইপারসমনিয়ায় আক্রান্ত । এটি সাধারণত বয়ঃসন্ধিকালে এবং যৌবনকালে ধরা পড়ে। তবে আমেরিকান স্লিপ অ্যাসোসিয়েশনের মতে মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে হাইপারসমনিয়া বেশি দেখা যায়। যারা নিয়মিত ধূমপান বা মদ্যপান করেন তাঁদের মধ্যে হাইপারসমনিয়া হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এছাড়া বিভিন্ন ওষুধের কারণে হাইপারসমনিয়ার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।

হাইপারসমনিয়া মূলত দু'ধরনের হয়, প্রাইমারি হাইপারসমনিয়া এবং সেকেন্ডারি হাইপারসমনিয়া।

প্রাইমারি হাইপারসমনিয়ার ক্ষেত্রে অন্য কোনও শারীরিক রোগ থাকে না। আক্রান্ত ব্যক্তি কেবল অত্যধিক মাত্রায় ক্লান্তি অনুভব করেন। অন্যদিকে সেকেন্ডারি হাইপারসমনিয়া অন্য কোনও রোগের কারণে হয়ে থাকে। এর ফলে রাতে ঘুম হয় না, যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি দিনের বেলা ক্লান্ত বোধ করেন।

হাইপারসমনিয়া বিকাশের কারণ:

একাধিক কারণে হাইপারসোমনিয়ায় আক্রান্ত হয় মানুষ। যেমন,

১. দৈনন্দিন জীবনে স্ট্রেস বা মানসিক চাপ একাধিক রোগের কারণ। হাইপারসমনিয়া এদের মধ্যে অন্যতম।

২. দীর্ঘ সময়ের জন্য অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন করলেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৩. বহুদিন ভাইরাল সংক্রমণের কারণে হাইপারসমনিয়ায় ভুগতে পারেন অনেকে।

৪. ছোটবেলায় কোনও মানসিক ট্রমার কারণেও এই রোগ দেখা দিতে পারে।

৫. আমাদের সকলের জীবনকে জিন অনেকখানি প্রভাবিত করে। জিনগত কোনও নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে ঘুম-সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেয়।

৬. মানসিক রোগ, যেমন ডিপ্রেশন, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, অ্যালজাইমার বা পারকিনসন রোগের কারণেও সব সময় ঘুম পেতে পারে।

রোগের লক্ষণ:

এই রোগের কিছু সাধারন লক্ষণ হলো,

১. এনার্জির অভাবে দিনের বেশ কয়েকবার ঘুমিয়ে পড়তে পারেন কোনও ব্যক্তি।

২. কাজের ফাঁকে অল্প সময়ের জন্য ঘুম বা ন্যাপ নিলেই এনার্জি ফেরত পাওয়া সম্ভব, কিন্তু ঘুমের পরও কোনওভাবেই এনার্জি ঠিক না লাগলে হতে পারে, হাইপারসমনিয়ায় আক্রান্ত ওই ব্যক্তি।

৩. রাতের ৯ ঘণ্টা ঘুমের পরও কিছুতেই শরীরে এনার্জি পাওয়া যায় না এক্ষেত্রে।

৪. পর্যাপ্ত ঘুমের বড় দিনের পর দিন ঘুম ভাঙতে চায় না অনেক সময়।

৫. ঘুম থেকে ওঠার সময় বিভ্রান্তি বা কাউকে ঘুম থেকে তোলা মানে লড়াইয়ের সমান হলে সে হাইপারসমনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন।

৬. উদ্বেগ, বিরক্তি ও অস্থিরতা।

৭. মনোনিবেশ করতে সমস্যা হয় এক্ষেত্রে। এমনকী, স্মৃতি-সংক্রান্ত সমস্যাও দেখা যায়।

৮. মাথা ব্যথা।

৯. ক্ষুধামান্দ্য।

১০. হ্যালুসিনেশন।

রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি

একজন চিকিৎসক আপনার লক্ষণ, চিকিৎসার ইতিহাস পর্যালোচনা এবং শারীরিক পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন কোনও ব্যক্তির হাইপারসমনিয়া আছে কিনা। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা ঘুমের ডায়েরি মেনে চলার কথা বলেন। অর্থাৎ, আপনার ঘুমনোর সময়গুলি ও জেগে থাকার সময়গুলিকে একটি ডায়রিতে লিখে রাখার কথা বলেন। এতে চিকিৎসকের পক্ষে সহজ হয় কাজ।

পলিসমনোগ্রাম এই রোগ নির্ণয়ের অন্যতম একটি পদ্ধতি। এক্ষেত্রে আপনি রাত কাটাবেন পরীক্ষার ল্যাবে। একটি মেশিনের সাহায্যে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ, চোখের নড়াচড়া, হৃদস্পন্দন, অক্সিজেনের মাত্রা এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখা হয়।

চিকিৎসা

হাইপারসমনিয়ার চিকিৎসায় একাধিক ওষুধ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা। এর মধ্যে রয়েছে অ্যামফিটামিন, মিথাইলফেনিডেট, মোডাফিনিলের মতো ওষুধগুলি। এই ওষুধগুলি আপনাকে বেশি সময় ধরে জেগে থাকতে সাহায্য করবে।

জীবনধারার পরিবর্তন চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমোতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তাছাড়া ঘুমোতে যাওয়ার আগে ফোন ঘাঁটার মতো কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেন তাঁরা। আক্রান্ত ব্যক্তির অ্যালকোহল বা ধূমপান করা উচিত নয় এক্ষেত্রে। এছাড়া প্রাকৃতিকভাবে শরীরে শক্তির যোগান পেতে উচ্চ পুষ্টিসম্পন্ন খাবারগুলি খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।