কলকাতা শহরের কোথায় রয়েছে জীবন্ত আগ্নেয়গিরি?
Dhapa dump yard : বিস্ময়ের বিষয়, ধাপা জনমানবহীন নয়। এখানে রয়েছে এক জনবহুল বসতি। প্রায় ৩০,০০০ মানুষ ধাপা ও তার আশেপাশে বসবাস করেন.

কলকাতার একদিকে, সল্টলেকের চকচকে ইমারত আর ই এম বাইপাসের ধাবমান অজস্র যানবাহন পেরিয়ে, অদ্ভুত কিছু পাহাড়ের দেখা মেলে। এইসব পাহাড় কোনও পর্যটনস্থল নয়। তাই স্থানীয় গাইডরাও এখানে নিয়ে আসেন না কাউকে। তবু, এটিই হয়তো কলকাতার সমসাময়িক জীবনের সবচেয়ে অকপট স্মারক, যার নাম ধাপা। শহরের সবচেয়ে বড় এবং পুরনো বর্জ্যভূমি। প্রায় ২৩ হেক্টর জমির ওপর ধাপার মাঠ ছড়িয়ে রয়েছে। এখানে রোজ ৪,৫০০ টনের বেশি বর্জ্য পদার্থ জমা করা হয়। শুধু কলকাতা নয়, সল্টলেক, নিউটাউন, হাওড়া এবং পানিহাটি থেকেও আবর্জনা এসে পড়ে এখানে। কিন্ত ধাপা শুধু আবর্জনা ফেলার স্থান নয়। এটি এক বৈজ্ঞানিক, পরিবেশগত, সামাজিক এবং নৈতিক সংকটেরও নাম।
ধাপা, কলকাতা শহরের এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। এ-কথা বলার কারণ রয়েছে। পাহাড়ের মতো উঁচু এক আবর্জনার স্তূপ। এর নিচে চলতে থাকে নানা রাসায়নিক বিক্রিয়া। সন্ধানী জীবাণু, পচনশীল জৈববস্তু এবং প্রচণ্ড তাপ থেকে তৈরি হয় মিথেন গ্যাস, যা প্রায়শই হঠাৎ জ্বলে ওঠে। শীতকালে এ-ধরনের অগ্নিকাণ্ড বিশেষত বেশি ঘটে, যার ফলে আকাশে উঠতে থাকে বিষাক্ত ধোঁয়া। কলকাতা পৌরসংস্থা (KMC) এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ৯,০০০ লিটার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন জল-ছিটানো ভ্যান এবং ব্যাটারি-চালিত বর্জ্য চেপে রাখার যন্ত্র ধাপায় পাঠিয়েছে। তবুও, আগুন বারবারই ছড়িয়ে পড়ে। এখানকার বায়ুমান PM ২.৫ সূচকে প্রায় চারগুণ বেশি, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার বাইরে। এই দূষিত সূক্ষ্মকণাগুলি ফুসফুসে প্রবেশ করে হাঁপানি, দীর্ঘমেয়াদি ব্রঙ্কাইটিস ও হৃদরোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে।

ধাপায় প্লাস্টিকের স্তূপ
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Tea Leaves Lead Pollution: যারা ভেষজ চা পছন্দ করেন, তারা জানলে হতাশ হবেন যে ক্যামোমাইল চা একেবারেই ভারী ধাতু ছেঁকে নিতে পারে না। কেন?
বিস্ময়ের বিষয়, ধাপা জনমানবহীন নয়। এখানে রয়েছে এক জনবহুল বসতি। প্রায় ৩০,০০০ মানুষ ধাপা ও তার আশেপাশে বসবাস করেন, যাঁদের অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করেন বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিস সংগ্রহ করে। এঁরা পরিচিত ‘র্যাগপিকার’ নামে। প্লাস্টিক বোতল, তার, টিনফয়েল, পুরনো যন্ত্রাংশ খুঁজে বার করে বিক্রি করাই এঁদের কাজ। ধাপার নির্দিষ্ট জমিতে আবর্জনার সার ব্যবহার করে চাষ করা হয় সবজি, যেগুলি পরে শহরের বাজারে বিক্রি হয়। একটি সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী, কলকাতার বাজারে বিক্রি হওয়া সবজির প্রায় ৪০% এই ধাপা অঞ্চল থেকেই আসে।
বায়োমাইনিং প্রকল্পের মাধ্যমে ধাপার বহু বছরের বর্জ্য পরিস্কার করা শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় মাইক্রোবিয়াল অ্যাকশন ব্যবহার করে বর্জ্যকে পৃথক করে জৈব সার এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য পদার্থে রূপান্তর করা হয়। ২০২১ সালে এই প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। কিন্তু ২০২৫-এর মাঝামাঝি এসে, এখনও পর্যন্ত মাত্র ৩০% বর্জ্য সরানো সম্ভব হয়েছে। নানা রকমের স্থানীয় সমস্যা, ঠিকাদারি সংস্থার ব্যর্থতা, এবং সরকারি তহবিল সমস্যা এই ধীরগতির কারণ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Climate Change Conference: বিশ্বের উন্নত ধনী দেশগুলি তাদের তৈরি করা পরিবেশ দূষণের ধ্বংসাত্মক প্রভাব মোকাবিলায় উন্নয়নশীল গরিব দেশগুলিকে ৩০ হাজার কোটি ডলার দিতে সম্মত হয়েছে।

ধাপায় আবর্জনা জমে পাহাড়
এর পাশাপাশি, ধাপার পাশে ৭৩ হেক্টর জমিতে একটি ‘বৈজ্ঞানিক ল্যান্ডফিল’ তৈরির প্রস্তাব রয়েছে—যেখানে থাকবে মিথেন সংগ্রহের ব্যবস্থা, তরল বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, ও অন্যান্য আধুনিক ব্যবস্থাপনা। কিন্তু সেখানে কৃষকদের জমির ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত বিরোধে কাজ এখনও থমকে রয়েছে। এদিকে, ধাপার আরও অন্যান্য পদক্ষেপে রয়েছে ১০০ টন দৈনিক ক্ষমতাসম্পন্ন মেটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি (MRF), প্লাস্টিক ও থার্মোকলের জন্য পৃথক প্রসেসিং প্ল্যান্ট, একটি পরীক্ষামূলক CNG উৎপাদন কেন্দ্র, এবং পুরনো প্লাস্টিক দিয়ে স্কুল বেঞ্চ ও আসবাব তৈরির উদ্যোগ। তবু, প্রতিদিনের ৫,০০০ টনের বেশি বর্জ্যের তুলনায় এই সমস্ত ব্যবস্থা অতি সামান্য বলেই মনে হয়।
শহর পরিকল্পনাবিদ ও বিজ্ঞানীরা বহুবার সতর্ক করেছেন—ধাপা বিপজ্জনক। ২০২৫-এর মার্চে হাওড়ার বেলগাছিয়ায় একটি ভূমিধস ঘটেছিল অতিওজন সম্পন্ন বর্জ্যভূমিতে। ধাপাও একই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে বলে আশঙ্কা। যতদিন না বর্জ্য পৃথকীকরণ, ঘরে-ঘরে কম্পোস্টিং, এবং বর্জ্য সচেতনতা কার্যকরভাবে চালু হচ্ছে, ধাপা কলকাতার বুকে একটি উন্মুক্ত ক্ষত হিসেবেই থেকে যাবে।
ধাপা শুধু কলকাতার সমস্যা নয়। মুম্বইয়ের ডিওনার, দিল্লির গাজিপুর বা চেন্নাইয়ের পেরুঙ্গুড়ি—সকল শহরেরই একই অবস্থা। এই ভাগাড়গুলি আমাদের নাগরিক জীবনের সেই দিকটি তুলে ধরে, যেখানে স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের জন্ম দেয়। তবু, ধোঁয়া আর দুর্গন্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে এক ধরনের মানবিকতা—ধাপার মানুষ, বিজ্ঞানীদের নিরন্তর প্রচেষ্টা, প্রকৌশলীদের পরিকল্পনা। যদি ধাপা আমাদের কিছু শেখায়, তা হল: আমরা আমাদের আবর্জনাকে যদি এভাবেই উপেক্ষা করি, তার ছায়া আমাদের ভবিষ্যতকেও গ্রাস করতে পারে!






