কলকাতা শহরের কোথায় রয়েছে জীবন্ত আগ্নেয়গিরি?

Dhapa dump yard : বিস্ময়ের বিষয়, ধাপা জনমানবহীন নয়। এখানে রয়েছে এক জনবহুল বসতি। প্রায় ৩০,০০০ মানুষ ধাপা ও তার আশেপাশে বসবাস করেন.

inscript
৩ মিনিট
কলকাতা শহরের কোথায় রয়েছে জীবন্ত আগ্নেয়গিরি?

কলকাতার একদিকে, সল্টলেকের চকচকে ইমারত আর ই এম বাইপাসের ধাবমান অজস্র যানবাহন পেরিয়ে, অদ্ভুত কিছু পাহাড়ের দেখা মেলে। এইসব পাহাড় কোনও পর্যটনস্থল নয়। তাই স্থানীয় গাইডরাও এখানে নিয়ে আসেন না কাউকে। তবু, এটিই হয়তো কলকাতার সমসাময়িক জীবনের সবচেয়ে অকপট স্মারক, যার নাম ধাপা। শহরের সবচেয়ে বড় এবং পুরনো বর্জ্যভূমি। প্রায় ২৩ হেক্টর জমির ওপর ধাপার মাঠ ছড়িয়ে রয়েছে। এখানে রোজ ৪,৫০০ টনের বেশি বর্জ্য পদার্থ জমা করা হয়। শুধু কলকাতা নয়, সল্টলেক, নিউটাউন, হাওড়া এবং পানিহাটি থেকেও আবর্জনা এসে পড়ে এখানে। কিন্ত ধাপা শুধু আবর্জনা ফেলার স্থান নয়। এটি এক বৈজ্ঞানিক, পরিবেশগত, সামাজিক এবং নৈতিক সংকটেরও নাম।

ধাপা, কলকাতা শহরের এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। এ-কথা বলার কারণ রয়েছে। পাহাড়ের মতো উঁচু এক আবর্জনার স্তূপ। এর নিচে চলতে থাকে নানা রাসায়নিক বিক্রিয়া। সন্ধানী জীবাণু, পচনশীল জৈববস্তু এবং প্রচণ্ড তাপ থেকে তৈরি হয় মিথেন গ্যাস, যা প্রায়শই হঠাৎ জ্বলে ওঠে। শীতকালে এ-ধরনের অগ্নিকাণ্ড বিশেষত বেশি ঘটে, যার ফলে আকাশে উঠতে থাকে বিষাক্ত ধোঁয়া। কলকাতা পৌরসংস্থা (KMC) এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ৯,০০০ লিটার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন জল-ছিটানো ভ্যান এবং ব্যাটারি-চালিত বর্জ্য চেপে রাখার যন্ত্র ধাপায় পাঠিয়েছে। তবুও, আগুন বারবারই ছড়িয়ে পড়ে। এখানকার বায়ুমান PM ২.৫ সূচকে প্রায় চারগুণ বেশি, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার বাইরে। এই দূষিত সূক্ষ্মকণাগুলি ফুসফুসে প্রবেশ করে হাঁপানি, দীর্ঘমেয়াদি ব্রঙ্কাইটিস ও হৃদরোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে।

ধাপায় প্লাস্টিকের স্তূপ

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চা ভালোবাসেন? ভয়াবহ দূষণ থেকে যেভাবে আপনাকে বাঁচাচ্ছে এক কাপ চা

Tea Leaves Lead Pollution: যারা ভেষজ চা পছন্দ করেন, তারা জানলে হতাশ হবেন যে ক্যামোমাইল চা একেবারেই ভারী ধাতু ছেঁকে নিতে পারে না। কেন?

বিস্ময়ের বিষয়, ধাপা জনমানবহীন নয়। এখানে রয়েছে এক জনবহুল বসতি। প্রায় ৩০,০০০ মানুষ ধাপা ও তার আশেপাশে বসবাস করেন, যাঁদের অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করেন বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিস সংগ্রহ করে। এঁরা পরিচিত ‘র‍্যাগপিকার’ নামে। প্লাস্টিক বোতল, তার, টিনফয়েল, পুরনো যন্ত্রাংশ খুঁজে বার করে বিক্রি করাই এঁদের কাজ। ধাপার নির্দিষ্ট জমিতে আবর্জনার সার ব্যবহার করে চাষ করা হয় সবজি, যেগুলি পরে শহরের বাজারে বিক্রি হয়। একটি সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী, কলকাতার বাজারে বিক্রি হওয়া সবজির প্রায় ৪০% এই ধাপা অঞ্চল থেকেই আসে।

বায়োমাইনিং প্রকল্পের মাধ্যমে ধাপার বহু বছরের বর্জ্য পরিস্কার করা শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় মাইক্রোবিয়াল অ্যাকশন ব্যবহার করে বর্জ্যকে পৃথক করে জৈব সার এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য পদার্থে রূপান্তর করা হয়। ২০২১ সালে এই প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। কিন্তু ২০২৫-এর মাঝামাঝি এসে, এখনও পর্যন্ত মাত্র ৩০% বর্জ্য সরানো সম্ভব হয়েছে। নানা রকমের স্থানীয় সমস্যা, ঠিকাদারি সংস্থার ব্যর্থতা, এবং সরকারি তহবিল সমস্যা এই ধীরগতির কারণ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দরিদ্র দেশের উপর দূষণের অভিশাপ চাপিয়ে দিচ্ছে ধনী দেশ

Climate Change Conference: বিশ্বের উন্নত ধনী দেশগুলি তাদের তৈরি করা পরিবেশ দূষণের ধ্বংসাত্মক প্রভাব মোকাবিলায় উন্নয়নশীল গরিব দেশগুলিকে ৩০ হাজার কোটি ডলার দিতে সম্মত হয়েছে।

ধাপায় আবর্জনা জমে পাহাড়

এর পাশাপাশি, ধাপার পাশে ৭৩ হেক্টর জমিতে একটি ‘বৈজ্ঞানিক ল্যান্ডফিল’ তৈরির প্রস্তাব রয়েছে—যেখানে থাকবে মিথেন সংগ্রহের ব্যবস্থা, তরল বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, ও অন্যান্য আধুনিক ব্যবস্থাপনা। কিন্তু সেখানে কৃষকদের জমির ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত বিরোধে কাজ এখনও থমকে রয়েছে। এদিকে, ধাপার আরও অন্যান্য পদক্ষেপে রয়েছে ১০০ টন দৈনিক ক্ষমতাসম্পন্ন মেটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি (MRF), প্লাস্টিক ও থার্মোকলের জন্য পৃথক প্রসেসিং প্ল্যান্ট, একটি পরীক্ষামূলক CNG উৎপাদন কেন্দ্র, এবং পুরনো প্লাস্টিক দিয়ে স্কুল বেঞ্চ ও আসবাব তৈরির উদ্যোগ। তবু, প্রতিদিনের ৫,০০০ টনের বেশি বর্জ্যের তুলনায় এই সমস্ত ব্যবস্থা অতি সামান্য বলেই মনে হয়।

শহর পরিকল্পনাবিদ ও বিজ্ঞানীরা বহুবার সতর্ক করেছেন—ধাপা বিপজ্জনক। ২০২৫-এর মার্চে হাওড়ার বেলগাছিয়ায় একটি ভূমিধস ঘটেছিল অতিওজন সম্পন্ন বর্জ্যভূমিতে। ধাপাও একই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে বলে আশঙ্কা। যতদিন না বর্জ্য পৃথকীকরণ, ঘরে-ঘরে কম্পোস্টিং, এবং বর্জ্য সচেতনতা কার্যকরভাবে চালু হচ্ছে, ধাপা কলকাতার বুকে একটি উন্মুক্ত ক্ষত হিসেবেই থেকে যাবে।

ধাপা শুধু কলকাতার সমস্যা নয়। মুম্বইয়ের ডিওনার, দিল্লির গাজিপুর বা চেন্নাইয়ের পেরুঙ্গুড়ি—সকল শহরেরই একই অবস্থা। এই ভাগাড়গুলি আমাদের নাগরিক জীবনের সেই দিকটি তুলে ধরে, যেখানে স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের জন্ম দেয়। তবু, ধোঁয়া আর দুর্গন্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে এক ধরনের মানবিকতা—ধাপার মানুষ, বিজ্ঞানীদের নিরন্তর প্রচেষ্টা, প্রকৌশলীদের পরিকল্পনা। যদি ধাপা আমাদের কিছু শেখায়, তা হল: আমরা আমাদের আবর্জনাকে যদি এভাবেই উপেক্ষা করি, তার ছায়া আমাদের ভবিষ্যতকেও গ্রাস করতে পারে!

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এল নিনোর প্রভাবে এশিয়ায় চালের দাম প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ, বাড়ছে খাদ্য মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা

Rice Price Increase: এল নিনোর প্রভাবে এশিয়ায় চালের দাম কেন দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হলো? ভারত ও থাইল্যান্ডে উৎপাদন কমায় কি বিশ্বব্যাপী সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে? ফিলিপাইনে চালের দাম ২১ শতাংশ বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়ছে? খাদ্য মূল্যস্ফীতি কি আরও বাড়বে? ২০২৭ সাল পর্যন্ত দাম কি এভাবেই চড়া থাকবে?

কীভাবে বিশ্ব উষ্ণায়নের দাম দিচ্ছে ভারতের নবজাতকরা?

Heatwave effect on Newborn babies: জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারতে ৮,৮৩০টি শিশুর নির্ধারিত সময়ের আগে অকাল জন্ম হয়েছে। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডে এই সংখ্যা সর্বাধিক। গবেষকদের আশঙ্কা, কিছু বছরের মধ্যে ভারতে এই পরিস্থিতি, আরও বাড়বে।

সাত দিনের ব্যবধানে দুটো ঘূর্ণিঝড়: জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা কি এটাই?

Climate change impact on cyclone: ২৮ অক্টোবরে অন্ধ্র উপকূলে আছড়ে পড়ে অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, ঠিক সাত দিন পর ৩ নভেম্বরে ল্যান্ডফল করে ‘মুরাসু’। আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, এই পিঠোপিঠি ঝড়ের ঘটনাকে বলা হয় ‘ক্লাইমেটোলজিক্যাল অ্যানোমালি'। বঙ্গোপসাগরের এই ‘ওভার-এনার্জাইজড’ অবস্থাই, এখন জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা।

কোথায় আছড়ে পড়ল ঘূর্ণিঝড় মুরাসু, কতটা ক্ষয়ক্ষতি, বাংলায় কী প্রভাব?

Cyclone Murasu: ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাব কাটতে না কাটতেই বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড় মুরাসু। মঙ্গলবার ভোরে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়ে শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড়। নেল্লোর, প্রকাশম ও বাপটলা জেলায় গাছ উপড়ে পড়েছে, নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়েছে। তামিলনাড়ু ও ওড়িশাতেও ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতা জারি হয়েছে। বাংলায় কতটা প্রভাব ফেলবে মুরাসু?

ভুটানে হড়পা বানের জেরে উত্তরবঙ্গে আতঙ্ক, কী পরিস্তিতি এখন?

Bhutan Flash Flood: ভুটানের শিনতাফু হ্রদ ভেঙে হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তা ও পর্যটনকেন্দ্রের পরিকাঠামো। বন্যার আশঙ্কায় আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রামে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরানোর উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। শুক্রবার সকালে সংকোশ নদীর জলস্তর না বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি ফেরে। পরিস্থিতি এখন কেমন?

মাত্র ১০০ বই থেকে ১০ হাজার! অসমের চা-বাগানের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন অনিন্দিতা

Assam Library Initiative: মাত্র ১০০টি বই নিয়ে ২০২০ সালে অসমের চা-বাগান এলাকার শিশুদের জন্য লাইব্রেরি শুরু করেছিলেন অনিন্দিতা গগৈ। আজ তিনটি লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। পরিবারের ৪০ লক্ষ টাকারও বেশি বিনিয়োগে এগিয়ে চলেছে এই উদ্যোগ। কীভাবে শিশুদের পড়াশোনা ও সৃজনশীলতার সুযোগ তৈরি করছেন অনিন্দিতা?

Cyclone Arnab: কোথায় আছড়ে পড়ল অর্ণব, কতটা ক্ষয়ক্ষতি? বাংলায় কতটা প্রভাব?

Cyclone Arnab: অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া, ভারী বৃষ্টি ও জল জমার জেরে বিপর্যস্ত একাধিক এলাকা। ৮৪ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো হয়েছে। বাংলার কোন কোন জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, আর কতটা প্রভাব পড়তে পারে ঘূর্ণিঝড়ের?

অ্যানথ্রোপিকের মতো এআই সংস্থাগুলি যেভাবে হয়ে দাঁড়াচ্ছে জলবায়ু সংকটের কারণ

The AI Carbon Bill: অ্যানথ্রোপিকের আইপিও ফাইলিংয়ে জলবায়ু পরিবর্তনকে বড় ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। ডেটা সেন্টার ঠান্ডা করতে বিদ্যুৎ-জলের ব্যয় বাড়ছে। ২০২৫-এ ডেটা সেন্টারগুলিতে ঘণ্টা প্রতি বিদ্যুৎ ব্যবহার, ৪৪৮ টেরাওয়াটে পৌঁছবে।