যেভাবে বিশ্বের ডায়াবেটিস রাজধানীতে পরিণত হলো ভারত

ভারত এখন বিশ্বের ‘ডায়াবেটিস রাজধানী’। কিন্তু কেন? ডায়াবেটিসকে বলা হয় 'বড়লোকদের রোগ'। এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফলেও নাকি এর শিকার হই আমরা। কিন্তু গবেষণা বলছে, এর সম্পূর্ণ দায়ভার আমাদের নয়। এর পিছনে দোষ রয়েছে রাষ্ট্রেরও।

inscript
৫ মিনিট
যেভাবে বিশ্বের ডায়াবেটিস রাজধানীতে পরিণত হলো ভারত

পাড়ার মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানে "দাদা চিনি ছাড়া একটা লিকার চা" অর্ডার দেওয়ার হুজুগটা খুব পুরনো নয়। সকলে খুব স্বাস্থ্য সচেতন তাই এমনটা হচ্ছে। এরকমই ধারণা। করোনা মহামারির পর সকলে চেষ্টাও করে একটু সচেতন হওয়ার। কিন্তু পাড়ার মোড়ে মোড়ে ওষুধের দোকানের ভিড় আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লম্বা লাইন তো সেই সচেতনতার সুফল পাওয়ার কথা বলছে না।

ভারত এখন বিশ্বের ‘ডায়াবেটিস রাজধানী’। কিন্তু কেন? ডায়াবেটিসকে বলা হয় 'বড়লোকদের রোগ'। এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফলেও নাকি এর শিকার হই আমরা। কিন্তু গবেষণা বলছে, এর সম্পূর্ণ দায়ভার আমাদের নয়। এর পিছনে দোষ রয়েছে রাষ্ট্রেরও।

২০২৩ সালের জুলাই মাসে 'দ্য ল্যানসেট ডায়াবেটিস অ্যান্ড এন্ডোক্রিনোলজি'-তে প্রকাশিত ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR)-ইন্ডিয়ার ডায়াবেটিস স্টাডি অনুযায়ী, আনুমানিক ১০১ মিলিয়ন ভারতীয় বর্তমানে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং আরও ১৩৬ মিলিয়ন মানুষ প্রি-ডায়াবেটিক পর্যায়ে রয়েছেন।

ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের 'ডায়াবেটিস অ্যাটলাস' এই পরিসংখ্যানকে আরও আশঙ্কাজনকভাবে তুলে ধরেছে। তাদের মতে, বর্তমানে রোগ নির্ণয় হওয়া প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর সংখ্যা ৮৯.৮ মিলিয়ন, যা ২০৫০ সালের মধ্যে বেড়ে ১৫৬.৭ মিলিয়নে পৌঁছতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুষ্টিবিদরা বলছেন সুস্থ থাকতে ডিম, দুধ, ফল আর ডাল খান। কিন্তু বাজারের গেলেই জিনিসপত্রের দাম শুনে ছ্যাঁকা লাগে—এই পুষ্টিকর খাবারগুলো এখন সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সস্তায় পেট ভরাতে সাধারণ মানুষ তাই বেছে নিচ্ছে পালিশ করা চাল, সাদা ময়দা আর চিনি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ডায়াবেটোজেনিক ডায়েট’ (Diabetogenic Diet)। অর্থাৎ, পকেটে টাকা কম বলেই মানুষ বাধ্য হয়ে এমন খাবার খাচ্ছে যা তাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ‘ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট ২০২৪’ উল্লেখ করেছে নিয়মিত কর্মীদের গড় প্রকৃত মাসিক মজুরি ২০১২ সালের ১২,১০০ টাকা থেকে কমে ২০২২ সালে ১০,৯২৫ টাকায় নেমে এসেছে।

ভারতের নিম্ন মজুরি হারের বিষয়টি বিবেচনা করলে এই পরিস্থিতির নিষ্ঠুরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ এবং অরিন্দম দাসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী—শ্রম ব্যুরোর (Labour Bureau) গ্রামীণ ভারতের তথ্য বলছে, ২০১৪ সাল থেকে প্রকৃত মজুরি (real wages) কার্যত স্থবির হয়ে আছে।

এর আগের দশকে প্রকৃত মজুরি প্রতি বছর ৫% থেকে ৬% হারে বেশ শক্তিশালীভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী দশকে এই বৃদ্ধির হার শূন্যের কাছাকাছি এসে ঠেকেছে। গত ১০ বছরে জিনিসের দাম যে হারে বেড়েছে, সাধারণ মানুষের আয় বা মজুরি সেই হারে বাড়েনি।

আমাদের কৃষিনীতিও এই বিপর্যয়ের জন্য সমান দায়ী। আমরা ওজনে বেশি ফসল ফলাতে গিয়ে শস্যের গুণমান হারিয়ে ফেলেছি। আইসিএআর (ICAR)-এর গবেষকরা জানাচ্ছেন, গত ৫০ বছরে ধান ও গমের পুষ্টিগুণ ব্যাপক হারে কমেছে।

১৯৬০-এর দশকের তুলনায় চালে জিঙ্ক ৩৩% এবং আয়রন ২৭% কমে গেছে। আমরা পেট ভরে ভাত খাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু সেই ভাত থেকে আমাদের শরীর আগের মতো শক্তি বা পুষ্টি পাচ্ছে না। ২০৪০ সালের মধ্যে এই পুষ্টিগুণ আরও ৪৫% কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডায়াবেটিসকে আমরা বরাবরই ‘লাইফস্টাইল ডিজিজ’ বা বড়লোকের রোগ বলে দেগে দিয়েছি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে এটা আসলে ‘কাঠামোগত সহিংসতা’। একটা দেশের অর্থনীতি ৬-৭% হারে বাড়ে, কিন্তু সেই বৃদ্ধির সুফল শ্রমজীবী মানুষের পকেটে পৌঁছয় না।

কাজের চাপে অনিয়মিত জীবনযাপন, দীর্ঘক্ষণ কাজ আর চাকরির অনিশ্চয়তা থেকে আসা মানসিক চাপ বা ‘মেটাবলিক স্ট্রেস’ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ আমাদের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এখনও ডায়াবেটিস পরীক্ষার জন্য কোনো সার্বজনীন পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি।

ডায়াবেটিস মানে শুধু রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক ও কৃষিনীতির ব্যর্থতার আয়না। আমরা যদি আজই আমাদের খাদ্য সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঠিক না করতে পারি, তবে আগামী দিনে ভারত এক চরম স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।