যেভাবে বিশ্বের ডায়াবেটিস রাজধানীতে পরিণত হলো ভারত
ভারত এখন বিশ্বের ‘ডায়াবেটিস রাজধানী’। কিন্তু কেন? ডায়াবেটিসকে বলা হয় 'বড়লোকদের রোগ'। এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফলেও নাকি এর শিকার হই আমরা। কিন্তু গবেষণা বলছে, এর সম্পূর্ণ দায়ভার আমাদের নয়। এর পিছনে দোষ রয়েছে রাষ্ট্রেরও।
পাড়ার মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানে "দাদা চিনি ছাড়া একটা লিকার চা" অর্ডার দেওয়ার হুজুগটা খুব পুরনো নয়। সকলে খুব স্বাস্থ্য সচেতন তাই এমনটা হচ্ছে। এরকমই ধারণা। করোনা মহামারির পর সকলে চেষ্টাও করে একটু সচেতন হওয়ার। কিন্তু পাড়ার মোড়ে মোড়ে ওষুধের দোকানের ভিড় আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লম্বা লাইন তো সেই সচেতনতার সুফল পাওয়ার কথা বলছে না।
ভারত এখন বিশ্বের ‘ডায়াবেটিস রাজধানী’। কিন্তু কেন? ডায়াবেটিসকে বলা হয় 'বড়লোকদের রোগ'। এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফলেও নাকি এর শিকার হই আমরা। কিন্তু গবেষণা বলছে, এর সম্পূর্ণ দায়ভার আমাদের নয়। এর পিছনে দোষ রয়েছে রাষ্ট্রেরও।
২০২৩ সালের জুলাই মাসে 'দ্য ল্যানসেট ডায়াবেটিস অ্যান্ড এন্ডোক্রিনোলজি'-তে প্রকাশিত ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR)-ইন্ডিয়ার ডায়াবেটিস স্টাডি অনুযায়ী, আনুমানিক ১০১ মিলিয়ন ভারতীয় বর্তমানে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং আরও ১৩৬ মিলিয়ন মানুষ প্রি-ডায়াবেটিক পর্যায়ে রয়েছেন।
ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের 'ডায়াবেটিস অ্যাটলাস' এই পরিসংখ্যানকে আরও আশঙ্কাজনকভাবে তুলে ধরেছে। তাদের মতে, বর্তমানে রোগ নির্ণয় হওয়া প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর সংখ্যা ৮৯.৮ মিলিয়ন, যা ২০৫০ সালের মধ্যে বেড়ে ১৫৬.৭ মিলিয়নে পৌঁছতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুষ্টিবিদরা বলছেন সুস্থ থাকতে ডিম, দুধ, ফল আর ডাল খান। কিন্তু বাজারের গেলেই জিনিসপত্রের দাম শুনে ছ্যাঁকা লাগে—এই পুষ্টিকর খাবারগুলো এখন সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সস্তায় পেট ভরাতে সাধারণ মানুষ তাই বেছে নিচ্ছে পালিশ করা চাল, সাদা ময়দা আর চিনি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ডায়াবেটোজেনিক ডায়েট’ (Diabetogenic Diet)। অর্থাৎ, পকেটে টাকা কম বলেই মানুষ বাধ্য হয়ে এমন খাবার খাচ্ছে যা তাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ‘ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট ২০২৪’ উল্লেখ করেছে নিয়মিত কর্মীদের গড় প্রকৃত মাসিক মজুরি ২০১২ সালের ১২,১০০ টাকা থেকে কমে ২০২২ সালে ১০,৯২৫ টাকায় নেমে এসেছে।
ভারতের নিম্ন মজুরি হারের বিষয়টি বিবেচনা করলে এই পরিস্থিতির নিষ্ঠুরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ এবং অরিন্দম দাসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী—শ্রম ব্যুরোর (Labour Bureau) গ্রামীণ ভারতের তথ্য বলছে, ২০১৪ সাল থেকে প্রকৃত মজুরি (real wages) কার্যত স্থবির হয়ে আছে।
এর আগের দশকে প্রকৃত মজুরি প্রতি বছর ৫% থেকে ৬% হারে বেশ শক্তিশালীভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী দশকে এই বৃদ্ধির হার শূন্যের কাছাকাছি এসে ঠেকেছে। গত ১০ বছরে জিনিসের দাম যে হারে বেড়েছে, সাধারণ মানুষের আয় বা মজুরি সেই হারে বাড়েনি।
আমাদের কৃষিনীতিও এই বিপর্যয়ের জন্য সমান দায়ী। আমরা ওজনে বেশি ফসল ফলাতে গিয়ে শস্যের গুণমান হারিয়ে ফেলেছি। আইসিএআর (ICAR)-এর গবেষকরা জানাচ্ছেন, গত ৫০ বছরে ধান ও গমের পুষ্টিগুণ ব্যাপক হারে কমেছে।
১৯৬০-এর দশকের তুলনায় চালে জিঙ্ক ৩৩% এবং আয়রন ২৭% কমে গেছে। আমরা পেট ভরে ভাত খাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু সেই ভাত থেকে আমাদের শরীর আগের মতো শক্তি বা পুষ্টি পাচ্ছে না। ২০৪০ সালের মধ্যে এই পুষ্টিগুণ আরও ৪৫% কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডায়াবেটিসকে আমরা বরাবরই ‘লাইফস্টাইল ডিজিজ’ বা বড়লোকের রোগ বলে দেগে দিয়েছি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে এটা আসলে ‘কাঠামোগত সহিংসতা’। একটা দেশের অর্থনীতি ৬-৭% হারে বাড়ে, কিন্তু সেই বৃদ্ধির সুফল শ্রমজীবী মানুষের পকেটে পৌঁছয় না।
কাজের চাপে অনিয়মিত জীবনযাপন, দীর্ঘক্ষণ কাজ আর চাকরির অনিশ্চয়তা থেকে আসা মানসিক চাপ বা ‘মেটাবলিক স্ট্রেস’ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ আমাদের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এখনও ডায়াবেটিস পরীক্ষার জন্য কোনো সার্বজনীন পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
ডায়াবেটিস মানে শুধু রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক ও কৃষিনীতির ব্যর্থতার আয়না। আমরা যদি আজই আমাদের খাদ্য সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঠিক না করতে পারি, তবে আগামী দিনে ভারত এক চরম স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।






