১০ বছরে নবম প্রেসিডেন্ট, কী হচ্ছে পেরুর নির্বাচনে?

Peru election 2026: দশ বছরে নবম প্রেসিডেন্ট, কেন এমন পরিস্থিতি হলো পেরুতে ? এত প্রার্থী, তীব্র অসন্তোষ আর অনিশ্চয়তার মাঝে ভোটাররা কাকে বেছে নেবেন? এই নির্বাচন কি স্থিতিশীলতা আনবে, নাকি সংকট আরও গভীর করবে?

inscript
৩ মিনিট
১০ বছরে নবম প্রেসিডেন্ট, কী হচ্ছে পেরুর নির্বাচনে?

দশ বছরের কম সময়ে নবম প্রেসিডেন্ট, এই বাক্যটাই আজকের পেরুর রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটি আবারও ভোটের মুখে দাঁড়িয়ে। রবিবার (১২ এপ্রিল ২০২৬) পেরুতে অনুষ্ঠিত হলো প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রায় ২৭ মিলিয়ন ভোটার এই নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। দেশজুড়ে আমাজন অঞ্চল থেকে আন্দেস পর্বতমালা—সব জায়গাতেই ভোটগ্রহণ হয়েছে।

এই নির্বাচনকে বিশেষ করে তুলেছে একাধিক কারণ। প্রথমত, গত এক দশকে পেরুতে আটজন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এসেছেন এবং এখন নবম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পালা। রাজনৈতিক অস্থিরতা এখানে এতটাই যে অনেক প্রেসিডেন্টই পদত্যাগ করেছেন, আবার অনেককে সংসদ সরিয়ে দিয়েছে বা দুর্নীতির মামলায় নাম রয়েছে।

বর্তমান নির্বাচন সেই অস্থিরতারই ধারাবাহিকতা। নির্বাচনে মোট ৩৫ জন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা পেরুর ইতিহাসে একটি রেকর্ড। ভোটারদের হাতে যে ব্যালট দেওয়া হয়েছে, সেটি এত বড় যে প্রায় আধা মিটার লম্বা।

এই বিপুল সংখ্যক প্রার্থী আসলে একটি বড় সংকটেরই কারণ। দেশে কোনো একক শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব নেই। ফলে ভোট বিভক্ত হয়ে পড়েছে অসংখ্য প্রার্থীর মধ্যে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে প্রথম দফায় কোনো প্রার্থীই ৫০ শতাংশ ভোট পাবেন না, ফলে দ্বিতীয় দফার ভোট প্রায় নিশ্চিত।

এই নির্বাচনে ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দুটি, অপরাধ এবং দুর্নীতি। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পেরুতে খুন, চাঁদাবাজি এবং সংগঠিত অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এই পরিস্থিতিতে বেশ কিছু প্রার্থী কঠোর আইন-শৃঙ্খলা নীতির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী নামানো হবে, আবার কেউ প্রস্তাব দিচ্ছেন বিশাল কারাগার তৈরি করার, এমনকী মৃত্যুদণ্ড ফিরিয়ে আনার কথাও উঠছে।

এই নির্বাচনে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কনজারভেটিভ রাজনীতিবিদ কেইকো ফুজিমোরি, যিনি চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট পদে লড়ছেন। এছাড়া রয়েছেন প্রাক্তন মেয়র রাফায়েল লোপেজ আলিয়াগা, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রিকার্ডো বেলমন্ট এবং কমেডিয়ান থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা কার্লোস আলভারেজ। তবে এই প্রতিযোগিতায় কেউই খুব বেশি এগিয়ে নেই। অধিকাংশ প্রার্থীই ১৫ শতাংশের নিচে সমর্থন পাচ্ছেন। ফলে নির্বাচনের ফলাফল অত্যন্ত অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনে রয়েছে পেরুর দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা। প্রেসিডেন্টদের বিরুদ্ধে সংসদ খুব সহজেই ‘নৈতিক অযোগ্যতা’র অভিযোগ এনে অভিশংসন করতে পারে। এই আইনি কাঠামোই বারবার সরকার পরিবর্তনের পথ খুলে দিয়েছে।

২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট হোসে জেরি দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত হন। তার আগে দিনা বলুয়ার্তেকেও সরানো হয়েছিল। এরপর কংগ্রেসের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন হোসে মারিয়া বালকাজার। এই ধারাবাহিক পরিবর্তন মানুষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছে। অনেক ভোটারই মনে করেন, যে-ই ক্ষমতায় আসুক, তিনি শেষ পর্যন্ত একই দুর্নীতি ও ক্ষমতার রাজনীতির মধ্যে জড়িয়ে পড়বেন।

তবে এই নির্বাচনে আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটছে। দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি সময় পর পেরুতে আবার দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ (বাইক্যামেরাল কংগ্রেস) ফিরছে। নতুনভাবে একটি সিনেট গঠন করা হচ্ছে, যা প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নতুন ব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একদিকে এটি গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে পারে, অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জনগণের মনোভাব। অনেকেই হতাশ এবং বিভ্রান্ত। একদিকে তারা পরিবর্তন চান, অন্যদিকে কার উপর ভরসা করবেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না।

গ্রামের ভোটার থেকে শহরের তরুণ প্রজন্ম, সবাই যেন এক ধরনের রাজনৈতিক ক্লান্তিতে ভুগছে। কেউ কেউ নতুন মুখের দিকে ঝুঁকছেন, আবার কেউ পুরনো রাজনৈতিক শক্তির উপরেই আস্থা রাখছেন।

দশ বছরে নয়জন প্রেসিডেন্ট, এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, দেশটি কতটা অস্থির সময় পার করছে।

এখন প্রশ্ন একটাই, এই নির্বাচনের মাধ্যমে কি পেরু স্থিতিশীলতার পথে ফিরতে পারবে? নাকি রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও দীর্ঘ হবে?

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?