বিছানায় ফোন = বিছানায় অনিদ্রা

Stimulus Control: বিছানায় বসে পড়লে বা কাজ করলে মস্তিষ্ক কনফিউজড হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে না এটা কি কাজ করার জায়গা নাকি ঘুমের!

inscript
৬ মিনিট
বিছানায় ফোন = বিছানায় অনিদ্রা

ইদানীং অনিদ্রা নিত্যসঙ্গী। বয়সের বাঁধন ভেঙে এ সমস্যা এখন আট থেকে আশি , সকলেরই। মুঠোফোনের দৌলতে মনোরঞ্জন এবং নিদ্রার আপসে, ঘুম বরাবরই অবহেলিত। ফল, রাত ১২টা কিংবা ২টো, ঘড়ির কাঁটা এগোলেও চোখের পাতা এক হতে চায় না। এমতাবস্থায়, স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই হয় আপনি মোবাইলের নোটিফিকেশনে চোখ বোলাবেন, নচেৎ দূর-অদূরের নানা চিন্তায় বিভোর হবেন— এই ঘটনা ঘরে ঘরের। সমস্যাটা তৈরি হয় তখন, যখন এ কাহিনি আপনার অভ্যেসে পরিণত হয়। আপনার অবচেতন মন বিছানাকে ‘ঘুমের জায়গার’ বদলে ‘উদ্বেগ বা বিনোদনের জায়গা’ হিসেবে মানতে শুরু করে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় স্টিমুলাস কন্ট্রোল (Stimulus Control)।

১৯৭০-এর দশকে রিচার্ড বুটজিন (Richard Bootzin) আবিষ্কৃত এই থিওরি বর্তমানে অনিদ্রা চিকিৎসায় বা CBT-I (Cognitive Behavioral Therapy for Insomnia)-এর একটি স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত। সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে ভারতের ‘অনিদ্রা’ এখন আর কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি ‘জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটে’ পরিণত হয়েছে। ২০২৫ এর ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতের ৩৯৩টি জেলায় প্রায় ৮৯,০০০ মানুষের উপর সংঘটিত এই সমীক্ষা বলছে, ভারতের প্রায় ৪৬% মানুষ টানা ৬ ঘণ্টাও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম পায় না। যদিও গত বছরের ৫৯% থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবুও প্রায় ৭০ কোটি মানুষই এই সমস্যায় জর্জরিত। স্রেফ ৮% ভারতীয় রাতে ৮-১০ ঘণ্টা ঘুমোন। বাকিদের মধ্যে ৪২% পান ৬-৮ ঘণ্টা, ২৩% পান ৪-৬ ঘণ্টা কিংবা ৪ ঘণ্টারও কম ঘুম। বিশেষ করে শহুরে জীবনযাত্রায় এই সমস্যা আরও প্রকট।

এখানে ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং তত্ত্বটা দারুণ ভাবে খাটে। বিজ্ঞানে প্যাভলভের কুকুরের প্রয়োগের কথা মনে আছে! ঘণ্টা বাজলেই প্যাভলভের কুকুরের মুখ দিয়ে লালা ঝরত, কারণ সে জানত ঘণ্টার শব্দ মানেই খাবার। এটাই ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং। আমাদের মস্তিষ্কও ঠিক একইভাবে কাজ করে। যদি আপনি বিছানায় শুয়ে ল্যাপটপে কাজ করেন, টানটান উত্তেজনার থ্রিলার পড়েন বা ফোনে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করেন, তবে আপনার মস্তিষ্ক বিছানাকে ঘুমের বদলে বিনোদন বা কাজেরই একটা জায়গা হিসেবে গ্রাহ্য করবে। ফলে ক্লান্ত হয়ে বিছানায় গেলেও ঘুম আসবে না। বিছানা তখন আপনার জন্য আরামের পরিবর্তে হয়ে ওঠে এক ‘ফ্রাস্ট্রেশন চেম্বার’।

কিন্তু বিছানায় স্ক্রিন স্ক্রোলিং বা পড়াশোনা আপনার ঘুমের শত্রু কেন?

তথ্য বলছে, বিছানায় স্ক্রিন স্ক্রোলিং এর সময় ১ ঘণ্টা বাড়ালে অনিদ্রার ঝুঁকি বাড়ে প্রায় ৫৯%। এর পিছনে রয়েছে দুটি বড় কারণ। এক, মেলাটোনিন হরমোনের বাধা– ফোন বা টিভির নীল আলো আমাদের শরীরের ঘুম পাড়ানি হরমোন ‘মেলাটোনিন’ নিঃসরণ কমিয়ে দেয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সাপ্লিমেন্ট নয়, সুস্থ থাকার অব্যর্থ দাওয়াই একটাই

Immunity: ড. রেড্ডি জানান, দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলো, বিশেষ করে সকালের রোদ, মেলাটোনিন-কর্টিসল চক্রকে মজবুত করে এবং রাতের ঘুমের জন্য শরীরের সহায়তা করে।

দুই, অ্যাসোসিয়েশন নষ্ট হওয়া– বিছানায় বসে পড়লে বা কাজ করলে মস্তিষ্ক কনফিউজড হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে না এটা কি কাজ করার জায়গা নাকি ঘুমের! গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪৫% আমেরিকান ঘুম না আসলে ফোনে স্ক্রল করেন, যা আসলে সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।

এখনও প্রশ্ন, এ অভ্যেস বদলাবেন কীভাবে? এক্ষেত্রে আপনাকে সাহায্য করতে পারে বুটজিনের সেই জাদুকরী নিয়মাবলী (Stimulus Control Instructions)।

অনিদ্রা সমস্যায় রিচার্ড বুটজিন কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম দিয়েছেন। এগুলো মেনে চললে মাত্র ১-২ সপ্তাহের মধ্যেই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা সম্ভব। কী সেই নিয়ম:

১.বিছানা শুধু ঘুমের জন্য: ঘুম এবং সেক্স ব্যতীত অন্য কোনো কাজের জন্য বিছানা ব্যবহার করবেন না। খাওয়া, পড়া, টিভি দেখা বা ফোনের কাজগুলো অন্য ঘরে বা সোফায় বসে করুন।

২.২০ মিনিটের নিয়ম: বিছানায় যাওয়ার ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে ঘুম না আসলে জোর করবেন না। বিছানা ছেড়ে উঠে অন্য ঘরে চলে যান। সেখানে মৃদু আলোয় এমন কিছু করুন যা ক্লান্তি আনে (যেমন- হালকা বই পড়া)। যখন আবার ঘুম পাবে, ঠিক তখনই বিছানায় ফিরুন।

৩. অ্যালার্মের কড়াকড়ি: রাতে আপনার যত কমই ঘুম হোক না কেন, প্রতিদিন সকালে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিছানা ত্যাগ করুন। এটি আপনার শরীরের ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’ সেট করতে সাহায্য করে।

৪. দিনের ঘুমকে ‘না’ বলুন: রাতে ভালো ঘুমের জন্য দিনের বেলা ন্যাপ বা দিবানিদ্রা পুরোপুরি পরিহার করুন।

৫. জোর করে ঘুম নয়: ঘুম না পাওয়া পর্যন্ত বিছানায় যাবেন না। শরীরকে তার স্বাভাবিক ছন্দে চলতে দিন।

স্টিমুলাস কন্ট্রোল থিওরির কার্যকারিতা নিয়ে করা ২৩টি ট্রায়ালের মেটা-অ্যানালাইসিস বলছে, রিচার্ড বুটজিনের এই ‘নিয়মাবলী’ সাধারণ চিকিৎসার তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। তবে শুরুতে এই নিয়মগুলো মেনে চলা কিছুটা কষ্টের মনে হলেও এর সুফল কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি। প্রসঙ্গত, বিছানায় যাওয়ার অন্তত ৩০-৬০ মিনিট আগে সব ধরনের মোবাইল নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিন, সম্ভব হলে ফোনটি অন্য ঘরে রাখুন।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

করোনা সেরে গেলেও পিছু ছাড়ছে না ক্লান্তি! লং কোভিড নিয়ে নতুন গবেষণায় কী জানা গেল?

Long COVID: করোনা সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়ার পরেও অনেকের শরীরে থেকে যাচ্ছে ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট ও স্মৃতিশক্তির সমস্যা। লং কোভিড নিয়ে নতুন মার্কিন গবেষণায় দেখা গেল, তিন বছরে প্রায় অর্ধেক রোগীর উপসর্গ কমেছে এবং এক-চতুর্থাংশ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন। কিন্তু কোন ধরনের উপসর্গ থাকলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি? কী বলছে গবেষণা?

কলকাতা বন্দরে উদ্ধার সাড়ে ১৩ কোটি টাকার ই-সিগারেট, শরীরের কী কী ক্ষতি করে এই ইলেকট্রনিক সিগারেট?

E-Cigarette Side Effects: কলকাতা বন্দরে প্রায় ৫৫ হাজার ই-সিগারেট উদ্ধার করেছে রাজস্ব গোয়েন্দা দফতর (DRI)। উদ্ধার হওয়া পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য ১৩.৫ কোটি টাকা। ভারতে নিষিদ্ধ এই ইলেকট্রনিক সিগারেট শরীরের কী কী ক্ষতি করতে পারে?

ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় DT-109 কতটা কার্যকর হতে পারে?

Fatty liver: ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় DT-109 কতটা কার্যকর? অন্ত্রের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে এই পরীক্ষাধীন ওষুধ লিভারের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে? প্রাণীর শরীরে আশাব্যঞ্জক ফল মিললেও মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা কি প্রমাণিত হয়েছে? ভবিষ্যতে কি গুরুতর ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় নতুন দিশা দেখাতে পারবে DT-109?

ইউক্রেনকে বিসর্জন দিয়ে পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প?

Trump Putin relationship: ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠতা বর্তমান বিশ্বরাজনীতির জটিল সমীকরণকে নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে?

বাংলার স্বাস্থ‍্যরক্ষায় সরকারি স্বাস্থ্যব‍্যবস্থা সংহত হওয়া জরুরি: অভিজিৎ চৌধুরী

Abhijit Chowdhury Interview: তিনি বাঙালির ‘লিভারের ডাক্তারবাবু’ বলেই সমধিক পরিচিত। দীর্ঘদিন সরকারি ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। অবসরের পরেও জড়িয়ে রয়েছেন চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে। সোনারপুরে গড়ে তুলেছেন ‘লিভার ফাউন্ডেশন’। সহযোদ্ধাদের সঙ্গে মিলে তাঁর পরবর্তী স্টেশন ‘স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়’।

হঠাৎ হৃদযন্ত্র বন্ধ হলে কী করবেন? নানা পাটেকরের মৃত্যুর পর জেনে নিন CPR-এর জরুরি নিয়ম

How to perform CPR: ধরুন, হঠাৎ কেউ জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। ডাকলেও সাড়া দিচ্ছেন না, স্বাভাবিকভাবে শ্বাসও নিচ্ছেন না। এমন অবস্থায় আতঙ্কিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময় নেই। তাহলে, কী করবেন তখন?

থালায় খাবার, নাকি বিষ? খাদ্যব্যবস্থার ভিতরে যেভাবে ঢুকছে কীটনাশক ও কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ

Poison on the Plate: বায়ার-মনসান্টো ও সিনজেনটার মতো 'বিগ সিক্স' কর্পোরেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে বিশ্বের বীজ বাজার। ২০২৩ সালে ভারতে ১০,৭৮৬ জন খাদ্য উৎপাদক কৃষক ও কৃষিশ্রমিকের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২৮ শতাংশ খাদ্য নমুনায় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যাচ্ছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত গ্লাইফোসেটকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ক্ষতিকারক ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবুও এর ব্যবহার থামেনি। অন্যদিকে, প্রচারের অন্তরালে সিকিম আমাদের দেশের প্রথম শতভাগ জৈব কৃষির রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সারা বিশ্বজুড়ে কৃষিবিদ বন্দনা শিবার ‘পয়জন-ফ্রি ফুড অ্যান্ড ফার্মিং ২০৩০’ অভিযানের ডাক আমাদের খাবারের থালাকে বিষমুক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছে।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।