ময়ূরাক্ষীর গল্প

Ganesh Bhattacharya
৪ মিনিট
ময়ূরাক্ষীর গল্প

না, আমি কোনও লেখক কিংবা কবি নই, নেহাতই সাধারণ একজন খেটে খাওয়া মানুষ- যার জীবনে প্রায় বত্রিশ বছর তীব্র লড়াই করার পর একটু হলেও সচ্ছলতা এসেছে। সচ্ছলতা বলতে ছোট একটা গাড়ি, নিজস্ব ফ্ল্যাট, আর সংসার যেমন হয়, বউ-ছেলে, তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে চলা। জীবনের নানা ওঠানামা, অ্যাডজাস্টমেন্ট ইত্যাদি একঘেয়ে গল্প তো আছেই। সে সব বলতে গেলে একটা মহাভারত লিখতে হবে, আর আমার এই অপেশাদারী ভাষায় ও সব হয় না। তবে জীবনের প্রথম লেখা গল্পটা প্রথম শোনাবো ভাবছি আমার বউকে, সে বেচারা একটু লম্বা কিছু শোনাতে গেলে, তা সে আমার জীবনের যে কোনও অতীত কথা কিংবা অফিসের যে কোনও কাহিনি, খুব উৎসাহ নিয়ে শুনতে শুরু করে, আমিও বলতে শুরু করি, তার একটু পরেই তাকালে আপনিও স্পষ্ট দেখবেন ও ঘুমোচ্ছে, একটু খেয়াল করলেই শুনতে পারবেন ফুরফুর করে নাকও ডাকছে ওর; আমি হয়তো জানতে চাইলাম, কী গো শুনছো? ও একটু জড়ানো গলায় বলবে, শুনছি তো, খুব মন দিয়ে শুনছি, তুমি বলো না, বলো!

দেখলেন তো এই এক দোষ আমার মতো লোকের, কিছু বলতে গেলেই সংসারী মানুষ সংসারে ঢুকে পড়ে আর বউয়ের কথা বলতে শুরু করলে শেষ করতে পারে না। ওই জন্যই তো আগেই বলেছি লেখক নই, লেখক হলে নিশ্চয়ই এ ধরনের ভ্যানতাড়া দিয়ে গল্প শুরুই করতাম না!

অনেক দিন আগে পুরীর সমুদ্রের সামনে রাতের দিকে আমি আর আমার বন্ধু গৌতম দুটো আমাদের বয়সী মেয়েকে পটাতে গিয়েছিলাম। তখন অল্প বয়স, আর গৌতমের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করেছি ওর পছন্দের মেয়েটির সঙ্গে ওর আলাপ করাবো। গেলাম। দু'জন যুবতী, দু'জন যুবক। গৌতমের পছন্দের মেয়েটি ছাড়া আর যে মেয়েটি সে কুচকুচে কালো তবে মুখশ্রী ভারী সুন্দর। ভালো লাগল আমারও। একটু কাব্য করে বললাম , আমার না বলা বাণী ঘন যামিনীর মাঝে... ওরা বেশ ইমপ্রেসড হল, তারপরেও অনেক দিন সম্পর্ক ছিল। তারপর কেটেও গেল একদিন, কিন্তু যে কথাটি বলবার সেটি হল কয়েক দিন আগে করোনা ভাইরাস তাড়িত লকডাউনের একঘেয়েমি কাটাতে গীতবিতানের পাতা খুলে দেখি সেখানে লেখা আছে , আমার না বলা বাণীর ঘন যামিনীর মাঝে... ওই একটি 'র' মিস করার জন্য এতদিন পরেও আমার কেমন খারাপ লাগছিল। মনে হচ্ছিল, মেয়ে দু'টি কি আমার ওই সামান্য ভুল বুঝতে পেরেছিল তখন! সমুদ্রের সামনে আমি একটি ভুল পংক্তি উচ্চারণ করেছিলাম। এ জন্য ওরা কি হাসাহাসি করেছে পরে ? যদিও এ সব ভাবনার কোনও অর্থই হয় না, ওদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই বহু দিন, তবু আমি ভাবছি !

পৃথিবী এখন প্রবল অনিশ্চয়তায় দুলছে। একটি প্রায় অদৃশ্য ভাইরাস মানবজীবনকে প্রশ্নচিহ্নের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। অন্তত আমার মতো সাধারণ মানুষের সেটাই মনে হচ্ছে। যদিও এই ভাবনার কোনও ভবিষ্যৎ নেই। আর আমরা তো বর্তমান-কণ্টকিত মানুষ। প্রায় দিন আনি দিন খাই-এর দলে। এই অতিমারির সময়ে এই দলের যে কী করুণ অবস্থা, তার খবর কে রাখে!

এতক্ষণে নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে আমার অপারগতা। গল্প বলার যে স্টাইল পাঠককে টেনে রাখে, সামনের দিকে নিয়ে যায় তা বপন করে চলা আমার পক্ষে অসম্ভব। যদিও অন্যদের গল্প পড়তে পড়তে অনেক সময়েই আমার মনে হয়েছে লেখক গল্পটা বানাচ্ছে, কিন্তু তাঁর লেখনির অসামান্য প্রসাদগুণ গল্পকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে পরিণতির দিকে। আমি সেটা পারছি না; কিন্তু আমার মধ্যে উঁকি দিয়েছে একটি গল্প লেখার ইচ্ছা, সেখানেও ঢুকে পড়ছে অন্য অপ্রাসঙ্গিক বিষয়। যে কথাটি বলবার জন্য এত উদ্যোগ সেটা এখনও শুরুই করতে পারিনি, সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে আমি কেমন গল্প-লিখিয়ে! তবু বলি।

ময়ূরাক্ষীর সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছিল। মেয়েকে নিয়ে থাকে। মেয়েটা ছোট। নাইনে পড়ে। ময়ূরাক্ষী এক সময়ে প্রেম করে মা-বাবার সম্পূর্ণ অমতে বিয়ে করেছিল দেবায়নকে। আর বিয়ের পর-পরই বাস্তবের প্রচন্ড ধাক্কা, সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া দেবায়ন ওর স্বপ্নকে ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়েছিল। বিধ্বস্ত ময়ূরাক্ষী অনেক রাতে বেরিয়ে পড়েছিল রাস্তায়। সুনসান রাস্তায় স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া মন নিয়ে হাঁটছিল। একটু দূরেই একটা সেতু। সেতুটা নীচে থেকে ঢাল বেয়ে উঠে গেছে উপরে। সেতুর অনেকটা নীচে ছুটে গেছে রেললাইন। একটা আলো টিমটিম করে জ্বলছে সেতুর মুখটাতে । ময়ূরাক্ষী জানত সেতুর মাঝামাঝি কোনও আলো নেই , তবু ও এগোচ্ছিল। কেননা একটু পরেই ওই রেললাইন ধরে ছুটে যাবে মেল ট্রেন... ময়ূরাক্ষী হাঁটছিল । একটা প্রাইভেট কার হুশ করে ওর পাশ দিয়ে বেরিয়ে সেতুর মুখে দাঁড়িয়ে পড়ল। খুব দ্রুত গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়ল তিনটে ছেলে, ওরা দৌড়ে আসছিল ময়ূরাক্ষীর দিকে। ডান দিকে একটা গলি। সেই গলিতে ঢুকে পড়ল ময়ূরাক্ষী। ছেলেগুলো ছুটে আসছিল। একটু দূরে ভাঙা দেওয়াল, কারও বাড়ির। ঝোপঝাড় আছে জায়গাটায়, তারই আড়ালে ঢুকে পড়ল ময়ূরাক্ষী। ছেলেগুলো ওকে খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছিল খুব কাছাকাছি... ঠিক তখনই ঝমঝম করে মেল ট্রেনটা পেরিয়ে যাচ্ছিল রেললাইন। একটা দীর্ঘশ্বাস ময়ূরাক্ষীর বুকের ভিতর থেকে বেরিয়ে মিশে গিয়েছিল অন্ধকারে। সেই যে অন্ধকারে চলে যাওয়া, তা থেকে আজও বেরোতে পারে না ও। সারারাত ঘুম আসে না। মেয়েটা অকাতরে ঘুমোয়। ময়ূরাক্ষীর মনেই পড়ে না শেষ কবে সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে।

আসলে নিজের কথা ছেড়ে ময়ূরাক্ষীর কথা বলবার একটাই উদ্দেশ্য সেটা হল গল্প বলা। কিন্তু আমি যেটা শোনাচ্ছি তার এক বর্ণও বানানো কিংবা অতিরঞ্জিত নয়। ময়ূরাক্ষীর জীবন। ও রকমই ঘটেছিল ওর জীবনে এবং বিয়ের পরে পরেই। ওর ডিভোর্স হয়ে যাবার বহু বছর পরে আমি তা শুনেছিলাম। যেটা আমার সব থেকে আশ্চর্য লেগেছিল সেটা হল ওর বলবার স্টাইল, গতিশীলতা।এতগুলো বছর পেরিয়ে জীবনের আরও নানা অভিজ্ঞতায় চেরাই হতে হতেও আজও সেই দিনের সেই স্মৃতি এক বর্ণ ভোলেনি ও। একটুও মলিন হয়নি সেই রাত ওর কাছে, চোখ বুজলেই সেই রাতটাকে চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পায়। দেবায়ন এখনও পুরনো হয়নি ওর মনে, আশ্চর্য!

-কী করছ গো ?

বউ মোবাইলে উঁকি মারল। আজকাল আমাকে একটু সন্দেহ করে।

বললাম, গল্প লিখছি। শুনবে?

হাঁ করে আমার দিকে তাকাল, তারপর বলল, তোমার মতো কাঠখোট্টা লোক গল্প লিখবে ?

ওর বিস্মিত দৃষ্টি থামিয়ে দিয়ে বললাম, ইয়েস, একটা আস্ত গল্প!

বউ বলল, আজকাল অবশ্য ফেসবুকে অনেকেই গল্প-কবিতা লেখে। দেখেছি। খুব একটা পড়া হয় না।

আমি একটু গম্ভীর মুখে ওর কথা শুনছিলাম। লেখকরা একটু গম্ভীর প্রকৃতির হলেই মানায় ।

হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে কৌতুক মিশিয়ে বউ জানতে চাইল, তা তোমার গল্পটা নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে!

আমি একইরকম গাম্ভীর্য মাখানো স্বরে বললাম, না, তোমার নয়। এটা ময়ূরাক্ষীর গল্প।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।