ধুঁকতে থাকা ইন্ডাস্ট্রিকে অক্সিজেন দিয়েছিলেন অভিষেক, বিনিময়ে জুটেছিল অশেষ বঞ্চনা

একের পর এক নক্ষত্রপতনের আখ্যান রচনা চলছে বাংলা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। অভিষেক চট্টোপাধ্যায় যে এত অল্প বয়সে চলে যাবেন, তা কেউ ভাবতেই পারেনি। দীর্ঘ বিরতির পর অভিনয় জীবনে ফিরে এসে জমিয়ে অভিনয় করছিলেন। নানা জনপ্রিয় সিরিয়ালে হয়ে উঠছিলেন মধ্যমণি। তারই মধ্যে ইন্দ্রপতন। আচমকাই গত রাতে ১টা বেজে ১০ মিনিটে চলে গেলেন তারকা অভিনেতা। বুধবার রাতে একটি টিভি চ্যানেলের শুটিং চলাকালীন অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। ফিরে আসেন আনোয়ার শাহ রোডের বাড়িতে। সেখানেই গত রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। মৃত্যুকালে তাঁর বয়েস হয়েছিল মাত্র ৫৭ বছর। দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির পর যেভাবে ফিরে এসেছিলেন, তাতে এ কথা বলার অবকাশ থাকে আরো অনেক কাজের সুযোগ ছিল। কিন্তু সব পথ বন্ধ হয়ে গেল।

অভিষেকের অভিনয় জীবনের শুরু ১৯৮৬-তে তরুণ মজুমদারের ছবি ‘পথভোলা’র হাত ধরে। সমাজবিরোধী এক বখে যাওয়া চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অভিষেক। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, তাপস পালের মতো সে সময়ের প্রথম সারির অভিনেতাদের সঙ্গে প্রথম ছবিতে অভিনয় জীবনে খুব একটা মামুলি ব্যাপার নয়। এরপর নিজের অভিনয় ক্ষমতার দ্বারা নব্বইয়ের দশকের অন্যতম ব্যস্ত অভিনেতাদের মধ্যে জায়গা করে নেন অভিষেক। উৎপল দত্ত, সন্ধ্যা রায়ের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। কাজ করেছেন শতাব্দী রায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের মতো সে সময়ের প্রথম সারির নায়িকাদের সঙ্গেও। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলি হল, 'মধুর মিলন' , 'মায়ের আঁচল', 'আলো','নীলাচলে কিরীটি’, ‘সুরের আকাশে’, ‘লাঠি’, ‘সবার উপরে মা’, ‘তুফান’, ‘ইন্দ্রজিৎ’, ‘সখী তুমি কার’, ‘দান প্রতিদান’, ‘ভাই আমার ভাই’, ‘মায়ার বাঁধন’, ‘আপন হল পর’, ‘প্রাণের চেয়েও প্রিয়’, ‘গীত সংগীত’, ‘তুফান’, ‘সুজন সখী’, ‘অমর প্রেম’ ইত্যাদি। বেশিরভাগ ছবিই অত্যন্ত জনপ্রিয়। একক নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বহু ছবিতে। তবে ধীরে ধীরে পার্শ্বচরিত্রেই বেশি দেখা যেতে থাকে তাঁকে। ঋতুপর্ণের বহু ছবিতে অভিনয় করেছেন। 'দহন', 'বাড়িওয়ালি' ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ‘রাজমহল’ ছবিটিও অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। যদিও ছবির জগতে ধীরে ধীরে যাতায়াত কমছিল তাঁর।‌

১৯৬৪ সালের ৩০ এপ্রিল জন্ম অভিষেকের। বরানগর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম হাইস্কুলে তিনি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর শেঠ আনন্দরাম জয়পুরিয়া কলেজের স্নাতক। বয়েস খুব একটা বেশি হয়নি তাঁর। যদিও অভিনয় জীবনে অধুনা অভিনেতাদের থেকে তিনি অনেকটাই সিনিয়র। সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন সময়, নিজেকে নিয়ে নানান কথা বলেছেন। নিজের সাফল্য নিয়ে অকপটে বলেছিলেন, "আমার জীবনের সবচেয়ে বড় হিট ছবি অঞ্জন চৌধুরীর হাত ধরেই। 'গীতসংগীত' আমার জীবনের অন্যতম ছবি যেখানে আমাকে একক নায়কের চরিত্রে দেখা গিয়েছে। 'গীতসংগীতে'র সিলেকশনের সময় একটি স্বয়ম্বর সভার মতো হয়েছিল। উনি সব হিরোদের ডেকেছিলেন।"

এক সময় সাফল্যের শিখরে থাকলেও কাস্টিং কাউচের শিকার হতে হয় তাঁকে। প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা জুটির নেপোটিজম নিয়েও মাঝে সরব হয়েছিলেন অভিষেক। জীবনে তাঁর একটা বড় আক্ষেপ ছিল এই টলিউডের ক্ষমতাতন্ত্রের শিকার হওয়া নিয়ে। তেমন কোনও ভালো রোল হাতে না থাকায় বড় পর্দা থেকে সরে গিয়েছিলেন নিঃশব্দে। গত কয়েক বছর ছোট পর্দায় আবার ফর্মে ফিরছিলেন অভিষেক। চুটিয়ে অভিনয় করেছেন, ‘ইচ্ছেনদী’, ‘অপুর সংসার’, ‘কুসুম দোলা’, ‘ফাগুন বউ’, ‘খড়কুটো’ এর মতন হিট ধারাবাহিকে। জনপ্রিয় হচ্ছিল তাঁর চরিত্র গুলিও। এ সবের মধ্যে আকস্মিক এই প্রয়াণ। সমস্ত টলিউড শোকস্তব্ধ। ভরত কলের বয়ানে জানা গিয়েছে, মূলত ফুড পয়জনিং  হয়েছিল তাঁর। মঙ্গলবারই খাবারে বিষক্রিয়া হয়। এরপরেও বুধবার স্টার জলসার 'ইসমার্ট জোড়ি' রিয়্যালিটি শো-তে শ্যুট করতে আসেন। সেখানেই আচমকা প্রেসার নেমে আসে ৮০-তে। সঙ্গে সঙ্গে কালো কফি দেওয়া হয় তাঁকে। আন্দাজ দুপুর আড়াইটে নাগাদ বাড়িও পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।

শোকাহত অভিনেত্রী শতাব্দী রায়  বলছিলেন, "বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থতায় ভুগছিলেন অভিষেক। আমি তাঁকে হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিই। আমি মেনে নিতে পারছি না যে মিঠুদা আর নেই!” অভিনয় জগতে সবার কাছে মিঠুদা বলেই পরিচিত ছিলেন অভিষেক। শুটিং ফ্লোরে সবার সঙ্গেই তাঁর ছিল অত্যন্ত আন্তরিক ব্যবহার। অথচ এই টলিউড তাঁকে দিনের পর দিন বঞ্চনার বেশি কিছু দেয়নি। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে একের পর এক কাজ হারিয়েছেন। সে সময় যাত্রা করে, মাচা করে সংসার চালাতে হয়েছিল তাঁকে। প্রচলিত ধারার ছবিতে রোমান্সধর্মী চড়া সুরের অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর একটু অন্যধারার কাজগুলি লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় অভিনয়ে কতটা সাবলীল ছিলেন অভিষেক।

তথাকথিত সিনেমা সমালোচকদের কাছে অথবা বুদ্ধিজীবীদের কাছে অভিষেকের দু একটি কাজ ছাড়া বাকি অভিনয় জীবন হয়তো তেমন গুরুত্ব পাবে না, কিন্তু সাধারণ মানুষ মনে রাখবে তাঁকে। এক সময় প্রবল গ্রীষ্মের দুপুরে যখন গ্রামের রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ ফাঁকা, কোনও গেরস্ত বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে বাড়ির কিশোর যুবকদের চিৎকার শোনা যেত, “মার মার, আরো মার”। ব্যাপার আর কিছুই না, নব্বইয়ের দশকের কোনও বাংলা ছবির অ্যাকশন চলছে। বিনোদন বলতে সাধারণ মানুষ কিন্তু তখনও ঐ ছবিগুলিকেই বুঝত। হতেই পারে আজকের প্রযুক্তি, শিল্পচর্চা, নান্দনিক বোধের কাছে সে সমস্ত ছেলেখেলা মাত্র, কিন্তু মনে রাখা উচিত সে সময় মূলধারার ছবি গুলিকে তেমন কোনও সাহায্যই করত না সরকার। তখন বোদ্ধারা শুধুমাত্র আর্ট ফিল্মের চর্চা করতেন। ধুঁকতে ধুঁকতে চলা একটা গোটা ইন্ডাস্ট্রি সে সময় হাতে গোনা যে কয়েকজন টেনে নিয়ে চলেছিলেন ‘অভিষেক’ তাঁদের মধ্যে অন্যতম নাম। আজও গ্রামে , মফস্‌সলের মানুষ বাড়ির ছোট পর্দায় তাঁকে দেখে চিনতে পারে, পুরনো দিনের আলোচনা করে, ভালোবাসে। সেই সমস্ত মানুষের চোখের ঔজ্জ্বল্যটুকু আরেক পর্দা ম্লান হয়ে এল। বিদায় অভিষেক, বিদায়।

More Articles

;