বিষের বাষ্পের পুড়ছে শহর কলকাতা! এখনই সতর্ক না হলে বড় বিপদ

Satyaki Tat
৩ মিনিট
বিষের বাষ্পের পুড়ছে শহর কলকাতা! এখনই সতর্ক না হলে বড় বিপদ

যাদবপুরের বাসিন্দা কল্যাণ সেন। বয়স ৪৩, পেশায় একজন আইনজীবী। হাইকোর্টের সুপারস্টার তিনি। কিন্তু এই দুঁদে আইনজীবীর কোনো বদ অভ্যাস নেই। না তিনি ধূমপান করেন, না তিনি মদ্যপান করেন। রোজ সকালে নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রাতভ্রমণে যান, শরীর চর্চা করেন। কিন্তু এই গত পরশু তার পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বেশ কিছুদিন ধরেই তার কাশি হচ্ছিল, সারা দিন ধরে বুক খুশ খুশ করছিলো। ডাক্তার দেখিয়েছেন, ডাক্তার প্রথমে ভেবেছিলেন ঠান্ডা লাগার জন্যে হয়তো। কি একটা সন্দেহ হওয়ায় তিনি পরীক্ষা করতে বলেন, এবং তার আশঙ্কা সত্যি হয়ে রিপোর্ট এসেছে, ক্যান্সার। লাং ক্যান্সার। দ্বিতীয় স্টেজ। জীবনে একদিন ও ধূমপান না করা কল্যাণবাবুর ফুসফুসে গভীর ক্ষত। কারণ? কলকাতার বায়ুদূষণ।

কল্যাণ সেন কাল্পনিক চরিত্র, ঘটনাটিও কাল্পনিক, কিন্তু বিষয়বস্তু কিন্তু একেবারেই কাল্পনিক নয়। ঘোর বাস্তব। ভয় পাচ্ছেন? হ্যাঁ ভয় তো পেতেই হবে, তার আগে শেষ অবধি প্রতিবেদনটা পড়বেন। একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান দি, গত বছর, ২০২১ সালে ৭৪০০ধু মাত্র বায়ুদূষণের কারণে জনের মৃত্যু হয়েছে।

Kolkata Air Quality Index (AQI) today, অর্থাৎ আজ কলকাতায় বাতাসের অবস্থা কেমন? উত্তরটা দেখে চমকে যাবেন না, এটাই এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

কলকাতার এই মুহূর্তের AQI হল 128। রিপোর্ট বলছে একশোর নিচে শহরের বেশিরভাগ জায়গাতেই খুব কম যায়। PM 2.5, যা আমাদের শরীরের জন্যে খুবই ক্ষতিকর, তার পরিমাণ এই মুহূর্তে ৩৫ µg/m³ যা WHO এর নির্ধারিত নির্দেশিকার প্রায় সাত গুণ।

Air Quality Index কী?

এইটি হল একটি লেখচিত্র, একটি মাপকাঠি যা বাতাসে থাকা বিভিন্ন পদার্থ, যেমন ধুলিকণা, কার্বন মনোঅক্সাইড, সালফার-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন-ডাই-অক্সাইড ইত্যাদি পরিমাপ করে বাতাসের মান নির্ধারণ করে। মার্কিন সংস্থা Environmental Protection Agency একটি মাপ নির্ধারণ করেছে, যাকে মান্যতা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO ও। তাদের কথা অনুযায়ী, 0-50 AQI হল নিরাপদ (Good), 51-100 হল সন্তোষজনক (satisfactory), 101-200 AQI মাঝারি দূষিত (Moderately Polluted), 201-300 খারাপ (Poor), 301-400 খুব খারাপ (Very Poor)।

আমরা রোজ কতটা দূষিত বায়ু নিজেদের শরীরের ভিতরে নিই এটা বুঝতে পারছেন? এবার আসি World Air Quality এর রিপোর্টের কথায়। গতকাল এই রিপোর্টটি বেরিয়েছে এবং রিপোর্টের ফলাফল নিয়ে কারোরই বিশেষ মাথাব্যথা দেখা যাচ্ছেনা, যদিও এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, মাথাব্যথা থাকলে প্রতিবাদ হতো, শাসকেরা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হতেন, যেভাবে পশ্চিমের দেশগুলিতে নেওয়া হয়। যাই হোক, রিপোর্টে ফিরে আসি। যদিও রিপোর্টটা গোটা বিশ্বের, কিন্তু আমরা দেশের প্রেক্ষিতেই আলোচনা করব কারণ আপনি বিদেশের বায়ু নিজের ফুসফুসে গ্রহণ করেন না।

রিপোর্ট অনুযায়ী, দিল্লী গত বছরের মত এই বছরও তার শিরোপা ধরে রেখেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত রাজধানীর শিরোপা। এই নিয়ে টানা চার বছর এই শিরোপা পেলো আমাদের দেশের রাজধানী। রাজধানীর সাথে পাল্লা দিয়ে আরো খারাপ হয়েছে গোটা দেশের বায়ু দূষণের চিত্র। এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহর হল রাজস্থানের ভিয়াড়ি। দ্বিতীয় স্থানেও ভারত। উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদ। পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত দেশগুলির মধ্যে ভারত রয়েছে পঞ্চম স্থানে।

লেখার শুরুতে জানিয়েছি কলকাতায় বায়ুতে PM 2.5 এর পরিমাণ নির্দেশিকার চেয়ে সাত গুণ বেশি, দেশের ক্ষেত্রে সেটা কত জানেন? দশ গুণ। হ্যাঁ, দেশের বাতাসের গড় PM 2.5 এর পরিমাণ প্রতি কিউবিক মিটারে 58.1 মাইক্রোগ্রাম। রিপোর্ট বলছে, দেশের কোনো শহরই WHO এর গাইডলাইনের নিচে PM 2.5 বা PM 10 কনার সংখ্যা রাখতে পারেনি। আরো মারাত্মক বিষয় হল, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার পনেরোটি সবথেকে দূষিত শহরের মধ্যে দশটিই আমাদের দেশের।

এই মুহূর্তে আমাদের দেশ প্রায় কোভিড পূর্ববর্তী জায়গায় ফিরে গেছে। মহামারী আইন আর কার্যকর নয়, দেশের মানুষও মাস্ক পড়েন না আর। দারুণ বিষয় তাই না? কিন্তু একটি বিষয় খুব গুরুতর। আমাদের দেশের দূষণের পরিমাণও সেই কোভিড পূর্ববর্তী জায়গায় পৌঁছে গেছে।

একথা আমাদের কারোরই অজানা নয় যে দূষিত বায়ু আমাদের মানব শরীরের জন্যে কতটা ক্ষতিকর। দেশের অনেক মানুষ শুধু যে এই কারণে অসুস্থ হন এবং মারা যান তা নয়, দেশের আর্থিক ক্ষতিও হয় চরম। তার অঙ্ক ২০২১ সালে ১৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই মুহূর্তে প্রায় আটত্রিশটি আলাদা কারণে আমাদের দেশে বায়ুদূষণ হয়, এবং দুঃখের বিষয়, তার মধ্যে একটিকেও বন্ধ করার কাজ কোনো সরকারই সফল ভাবে করতে পারেনি।

যে হারে জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানো হয় তাতে বায়ুদূষণের হার কমানো একেবারেই সম্ভব নয়। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী কপ-২৬ সম্মেলনে বলে এসেছেন, ২০৭০ সালের মধ্যে আমাদের দেশ জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানো বন্ধ করবে। তাছাড়াও ফসলের গোড়া, জঞ্জাল পোড়ানো এগুলোও অন্যতম কারণ।

কিন্তু এগুলো বন্ধ করবে কে? কার দায়িত্ব? সরকারের, তাই তো? কিন্তু সরকারের কি বিশেষ মাথাব্যথা আছে এই বিষয়টি ঠিক করার? দূষণের পরিমাণ কমানোর? এই মহামারীর কোনো সমাধান কেন বেরোচ্ছেনা? প্রশ্ন সাধারণ মানুষকেও। ভুক্তভোগী তারাই, কিন্তু এই বিষয়টা কেন ভোটের ইস্যু হয়না? কেন বিক্ষোভ দেখা যায়না? কেন তারা সরকারের কাছে দাবি করেন না উপযুক্ত পদক্ষেপ? উত্তর জানা নেই।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।