মাথার দাম ছিল দু'হাজার কোটি, দুনিয়ার কাছে ত্রাস হয়ে উঠেছিল লাদেনের এই ছায়াসঙ্গী

২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার পর আমেরিকার মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় উঠে আসে জাওয়াহিরির নাম। সেই ওয়ান্টেড লিস্টে ওসামা বিন লাদেনের পরেই নাম ছিল জাওয়াহিরির।

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
মাথার দাম ছিল দু'হাজার কোটি, দুনিয়ার কাছে ত্রাস হয়ে উঠেছিল লাদেনের এই ছায়াসঙ্গী

মার্কিন মুলুকে আল-কায়দা বরাবরই শাসকের ত্রাস। এবার সেই আল-কায়দাকেই পাল্টা আঘাত করল মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন ড্রোন হামলায় আল কায়দা প্রধান আল-জাওয়াহিরিকে খতম করল জো বাইডেন সরকার। আল-জাওয়াহিরি ছিলেন আল-কায়দা সংগঠনে আমেরিকার আরেক ‘মাথা ব্যথা’ ওসামা বিন লাদেনের উত্তরসূরি। মার্কিন হামলার পরেই আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন এক সরকারি বিবৃতিতে জানিয়েছেন, "মার্কিন এনকাউনটারে সন্ত্রাসবাদী নেতা আল-জাওয়াহিরির মৃত্যু হয়েছে। ৯/১১-র অন্যতম মূল চক্রী জাওয়াহিরিকে নিকেশ করে সেই সন্ত্রাসবাদী হামলায় নিহত ৩০০০ ব্যক্তির পরিবারকে আমরা সুবিচার দেওয়ার চেষ্টা করলাম।"

২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার পর আমেরিকার মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় উঠে আসে জাওয়াহিরির নাম। সেই ওয়ান্টেড লিস্টে ওসামা বিন লাদেনের পরেই নাম ছিল জাওয়াহিরির। মার্কিন প্রশাসনের তরফে তার মাথার মূল্য ঘোষণা করা হয়েছিল আড়াই কোটি ডলার।

কে এই আল-জাওয়াহিরি?

১৯৫১ সালের ১৯ জুন মিশরের রাজধানী শহর কায়রোর এক শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আল-জাওয়াহিরি। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই চরমপন্থী ইসলামিক আদর্শের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। মাত্র ১৫ বছর বয়সে নিষিদ্ধ মুসলিম সংগঠন ব্রাদারহুডের সদস্যপদ নেওয়ায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। মিশরের লেখক সৈয়দ কুতুবের একটি বই ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে জাওয়াহিরির ব্যক্তিগত জীবনকে। এরপরে ১৯৭৪ সালে কায়রো ইউনিভার্সিটি থেকে মেডিক্যাল পরীক্ষায় স্নাতক হন জাওয়াহিরি। ব্যক্তিগত জীবনে চোখের চিকিৎসক হিসেবেই দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তাঁর হাতেই তৈরি জাতীয় পতাকার নকশা, তবু শেষ জীবন কেটেছিল চরম দারিদ্রে

এই বিরাট কাজ নীরবে করে গিয়েছিলেন গান্ধীবাদী মানুষটি। জাতীয় পতাকার কোনও কৃতিত্বই নিতে চাননি‌। ফলে শেষ জীবন তাঁর খুব একটা সুখের হয়নি।

ইসলামিক মৌলবাদে হাতে খড়ি

জাওয়াহিরি পেশাগতভাবে চিকিৎসক হিসেবেই নিজের কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু তারপরেই খুব দ্রুত বদলাতে থাকে মিশরের রাজনৈতিক পরিবেশ। মিশরের তৎকালীন সরকারকে ফেলে দেওয়ার ডাক দেয় কিছু চরমপন্থী ইসলামিক সংগঠন। তাদের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন জাওয়াহিরি। ১৯৭৩ সালে ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদ প্রতিষ্ঠার পরে সেখানে সদস্য হিসেবে যোগদান করেন জাওয়াহিরি। ১৯৮১ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের ওপর হামলা চালানোর দায়ে গ্রেফতার হন জাওয়াহিরি। ততদিনে তাঁর ইসলামিক স্টেট তৈরির জেদ আরও দৃঢ় হয়েছে। ইসলামিক জিহাদের অন্যতম নেতা হিসেবে সংগঠন গড়ে তোলার কাজ করতে থাকেন জাওয়াহিরি। ১৯৮৫ সালে জেল থেকে ছাড়া পাবার পর পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তানে চলে যান জাওয়াহিরি। সেখানে ইসলামিক জিহাদের একটি শাখা তৈরি করেন তিনি।আফগানিস্তানের ওপর যখন সোভিয়েত রাশিয়ার চরম আগ্রাসন নেমে আসছে, তখন চিকিৎসক হিসেবে আফগানিস্তনের মানুষদের সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব নিয়েছিলেন আল-জাওয়াহিরি।

কীভাবে লাদেনের সেকেন্ড-ইন কমান্ড হয়ে ওঠা?

সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় আহত মুজাহিদিন কর্মীদের চিকিৎসার দায়ভার সামলাতে গিয়েই জাওয়াহিরির সঙ্গে আলাপ হয় ওসামা বিন লাদেনের। মিশরে জাওয়াহিরির ইসলামিক সংগঠনের কাজ সম্পর্কে আগেই অবগত ছিলেন লাদেন। সেই সূত্রে দু'জনের যোগাযোগের ভিত্তি তৈরি হয়। লাদেনের জীবৎকালে জাওয়াহিরি তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীকালে, নয়ের দশকে সবক'টি বিরোধী ইসলামিক সংগঠনকে এক করে ওসামা বিন লাদেন ও আল-জাওয়াহিরি তৈরি করেন ইসলামিক ফ্রন্ট। ইসলামিক ফ্রন্টে লাদেনের ডানহাত ছিলেন জাওয়াহিরি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যে কোনও আক্রমণের ক্ষেত্রেই অন্যতম মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করতেন জাওয়াহিরি।

১৯৯৮ সালে লাদেন-জাওয়াহিরির যৌথ পরিকল্পনায় কেনিয়া ও তানজানিয়ার আমেরিকান দূতাবাসে হামলা চালায় ইসলামিক সংগঠন। এর ঠিক তিন বছর পর আমেরিকার টুইন টাওয়ার ধ্বংস করে লাদেন-জাওয়াহিরির জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট। শুধু তাই নয়, আমেরিকায় জৈব হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন আল-জাওয়াহিরি। সেই পরিকল্পনামাফিক আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেটের মূল ঘাঁটিতে তৈরি করা হয় একটি ল্যাবরেটরি। বিজ্ঞানীদের সাহায্য নিয়ে অ্যানথ্রাক্স ব্যাকটেরিয়া কাজে লাগিয়ে মার্কিন মুলুকে আঘাত হানার পরিকল্পনা করেন জাওয়াহিরি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেই পরিকল্পনা বাতিল করে বিমান হামলা চালানো হয় টুইন টাওয়ারে। মৃত্যু হয় তিন হাজারেরও বেশি লোকের। এরপর মার্কিন হামলায় নিহত হন জাওয়াহিরির স্ত্রী।

তখন থেকেই আমেরিকার মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় জায়গা করে নেন ওসামা বিন লাদেন ও আল-জাওয়াহিরি। আমেরিকার চোখ এড়িয়ে এরপর ২০০৮ সালে পাকিস্তানের উপজাতি-অধ্যুষিত এলাকায় আশ্রয় নেন জাওয়াহিরি। ২০০৬ ও ২০০৮ সালেও জাওয়াহিরির বাড়িতে হামলা চালায় আমেরিকা, কিন্তু জাওয়াহিরির সন্ধান পাওয়া যায়নি। ২০১১ সালে মার্কিন সেনার হাতে ইসলামিক স্টেট ও আল-কায়দার কমান্ডার ইন চিফ ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যু হলে লাদেনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহকর্মী হিসেবে আল-কায়দার দায়িত্ব নেন জাওয়াহিরি।

লাদেনের মৃত্যুর প্রায় ১১ বছর পর কাবুলে ড্রোন হামলায় আল-কায়দা প্রধান আল-জাওয়াহিরিকে নিকেশ করে বাইডেন প্রশাসন।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।