মাথার দাম ছিল দু'হাজার কোটি, দুনিয়ার কাছে ত্রাস হয়ে উঠেছিল লাদেনের এই ছায়াসঙ্গী
২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার পর আমেরিকার মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় উঠে আসে জাওয়াহিরির নাম। সেই ওয়ান্টেড লিস্টে ওসামা বিন লাদেনের পরেই নাম ছিল জাওয়াহিরির।

মার্কিন মুলুকে আল-কায়দা বরাবরই শাসকের ত্রাস। এবার সেই আল-কায়দাকেই পাল্টা আঘাত করল মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন ড্রোন হামলায় আল কায়দা প্রধান আল-জাওয়াহিরিকে খতম করল জো বাইডেন সরকার। আল-জাওয়াহিরি ছিলেন আল-কায়দা সংগঠনে আমেরিকার আরেক ‘মাথা ব্যথা’ ওসামা বিন লাদেনের উত্তরসূরি। মার্কিন হামলার পরেই আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন এক সরকারি বিবৃতিতে জানিয়েছেন, "মার্কিন এনকাউনটারে সন্ত্রাসবাদী নেতা আল-জাওয়াহিরির মৃত্যু হয়েছে। ৯/১১-র অন্যতম মূল চক্রী জাওয়াহিরিকে নিকেশ করে সেই সন্ত্রাসবাদী হামলায় নিহত ৩০০০ ব্যক্তির পরিবারকে আমরা সুবিচার দেওয়ার চেষ্টা করলাম।"
২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার পর আমেরিকার মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় উঠে আসে জাওয়াহিরির নাম। সেই ওয়ান্টেড লিস্টে ওসামা বিন লাদেনের পরেই নাম ছিল জাওয়াহিরির। মার্কিন প্রশাসনের তরফে তার মাথার মূল্য ঘোষণা করা হয়েছিল আড়াই কোটি ডলার।
কে এই আল-জাওয়াহিরি?
১৯৫১ সালের ১৯ জুন মিশরের রাজধানী শহর কায়রোর এক শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আল-জাওয়াহিরি। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই চরমপন্থী ইসলামিক আদর্শের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। মাত্র ১৫ বছর বয়সে নিষিদ্ধ মুসলিম সংগঠন ব্রাদারহুডের সদস্যপদ নেওয়ায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। মিশরের লেখক সৈয়দ কুতুবের একটি বই ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে জাওয়াহিরির ব্যক্তিগত জীবনকে। এরপরে ১৯৭৪ সালে কায়রো ইউনিভার্সিটি থেকে মেডিক্যাল পরীক্ষায় স্নাতক হন জাওয়াহিরি। ব্যক্তিগত জীবনে চোখের চিকিৎসক হিসেবেই দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এই বিরাট কাজ নীরবে করে গিয়েছিলেন গান্ধীবাদী মানুষটি। জাতীয় পতাকার কোনও কৃতিত্বই নিতে চাননি। ফলে শেষ জীবন তাঁর খুব একটা সুখের হয়নি।
ইসলামিক মৌলবাদে হাতে খড়ি
জাওয়াহিরি পেশাগতভাবে চিকিৎসক হিসেবেই নিজের কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু তারপরেই খুব দ্রুত বদলাতে থাকে মিশরের রাজনৈতিক পরিবেশ। মিশরের তৎকালীন সরকারকে ফেলে দেওয়ার ডাক দেয় কিছু চরমপন্থী ইসলামিক সংগঠন। তাদের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন জাওয়াহিরি। ১৯৭৩ সালে ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদ প্রতিষ্ঠার পরে সেখানে সদস্য হিসেবে যোগদান করেন জাওয়াহিরি। ১৯৮১ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের ওপর হামলা চালানোর দায়ে গ্রেফতার হন জাওয়াহিরি। ততদিনে তাঁর ইসলামিক স্টেট তৈরির জেদ আরও দৃঢ় হয়েছে। ইসলামিক জিহাদের অন্যতম নেতা হিসেবে সংগঠন গড়ে তোলার কাজ করতে থাকেন জাওয়াহিরি। ১৯৮৫ সালে জেল থেকে ছাড়া পাবার পর পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তানে চলে যান জাওয়াহিরি। সেখানে ইসলামিক জিহাদের একটি শাখা তৈরি করেন তিনি।আফগানিস্তানের ওপর যখন সোভিয়েত রাশিয়ার চরম আগ্রাসন নেমে আসছে, তখন চিকিৎসক হিসেবে আফগানিস্তনের মানুষদের সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব নিয়েছিলেন আল-জাওয়াহিরি।
কীভাবে লাদেনের সেকেন্ড-ইন কমান্ড হয়ে ওঠা?
সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় আহত মুজাহিদিন কর্মীদের চিকিৎসার দায়ভার সামলাতে গিয়েই জাওয়াহিরির সঙ্গে আলাপ হয় ওসামা বিন লাদেনের। মিশরে জাওয়াহিরির ইসলামিক সংগঠনের কাজ সম্পর্কে আগেই অবগত ছিলেন লাদেন। সেই সূত্রে দু'জনের যোগাযোগের ভিত্তি তৈরি হয়। লাদেনের জীবৎকালে জাওয়াহিরি তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীকালে, নয়ের দশকে সবক'টি বিরোধী ইসলামিক সংগঠনকে এক করে ওসামা বিন লাদেন ও আল-জাওয়াহিরি তৈরি করেন ইসলামিক ফ্রন্ট। ইসলামিক ফ্রন্টে লাদেনের ডানহাত ছিলেন জাওয়াহিরি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যে কোনও আক্রমণের ক্ষেত্রেই অন্যতম মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করতেন জাওয়াহিরি।
১৯৯৮ সালে লাদেন-জাওয়াহিরির যৌথ পরিকল্পনায় কেনিয়া ও তানজানিয়ার আমেরিকান দূতাবাসে হামলা চালায় ইসলামিক সংগঠন। এর ঠিক তিন বছর পর আমেরিকার টুইন টাওয়ার ধ্বংস করে লাদেন-জাওয়াহিরির জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট। শুধু তাই নয়, আমেরিকায় জৈব হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন আল-জাওয়াহিরি। সেই পরিকল্পনামাফিক আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেটের মূল ঘাঁটিতে তৈরি করা হয় একটি ল্যাবরেটরি। বিজ্ঞানীদের সাহায্য নিয়ে অ্যানথ্রাক্স ব্যাকটেরিয়া কাজে লাগিয়ে মার্কিন মুলুকে আঘাত হানার পরিকল্পনা করেন জাওয়াহিরি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেই পরিকল্পনা বাতিল করে বিমান হামলা চালানো হয় টুইন টাওয়ারে। মৃত্যু হয় তিন হাজারেরও বেশি লোকের। এরপর মার্কিন হামলায় নিহত হন জাওয়াহিরির স্ত্রী।
তখন থেকেই আমেরিকার মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় জায়গা করে নেন ওসামা বিন লাদেন ও আল-জাওয়াহিরি। আমেরিকার চোখ এড়িয়ে এরপর ২০০৮ সালে পাকিস্তানের উপজাতি-অধ্যুষিত এলাকায় আশ্রয় নেন জাওয়াহিরি। ২০০৬ ও ২০০৮ সালেও জাওয়াহিরির বাড়িতে হামলা চালায় আমেরিকা, কিন্তু জাওয়াহিরির সন্ধান পাওয়া যায়নি। ২০১১ সালে মার্কিন সেনার হাতে ইসলামিক স্টেট ও আল-কায়দার কমান্ডার ইন চিফ ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যু হলে লাদেনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহকর্মী হিসেবে আল-কায়দার দায়িত্ব নেন জাওয়াহিরি।
লাদেনের মৃত্যুর প্রায় ১১ বছর পর কাবুলে ড্রোন হামলায় আল-কায়দা প্রধান আল-জাওয়াহিরিকে নিকেশ করে বাইডেন প্রশাসন।







