তাঁর হাতেই তৈরি জাতীয় পতাকার নকশা, তবু শেষ জীবন কেটেছিল চরম দারিদ্রে

এই বিরাট কাজ নীরবে করে গিয়েছিলেন গান্ধীবাদী মানুষটি। জাতীয় পতাকার কোনও কৃতিত্বই নিতে চাননি‌। ফলে শেষ জীবন তাঁর খুব একটা সুখের হয়নি।

Sindhu Som
৩ মিনিট
তাঁর হাতেই তৈরি জাতীয় পতাকার নকশা, তবু শেষ জীবন কেটেছিল চরম দারিদ্রে

প্রতিটি জাতির একটি জাতীয় পতাকা প্রয়োজন। লক্ষ লক্ষ মানুষ এই পতাকার জন্য রক্ত দিয়েছেন। এই পূজার মূল্য না দেওয়া পাপ। ইউনিয়ন জ্যাক ইংরেজদের বুকে যে আবেগ, শক্তি জাগিয়ে তোলে তা অমূল্য, অতুলনীয়। আমেরিকানদের কাছে তাদের পতাকার মূল্য অসীম। আবার ইসলামের সাহস তাদের নিশানের সামনে শতগুণ বেড়ে যায়।

—মহাত্মা গান্ধী

জাতীয় পতাকা জাতির চিহ্ন। জাতির পরিচয়। স্বাধীন জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার তাগিদ যখন অনুভব করল ভারত, সেই জাতীয়তাবাদকে মূর্তরূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন হল জাতীয় পতাকার। বিশ্বের মোটামুটি সব দেশেরই নিজস্ব জাতীয় পতাকা রয়েছে। তবে ভারতের তিরঙ্গার যিনি জন্ম দিয়েছিলেন, তাঁকে একেবারেই মনে রাখেনি ভারত। পিঙ্গলি ভেঙ্কাইয়া। প্রথম তিরঙ্গা তিনি তৈরি করেছিলেন তিরিশটি দেশের জাতীয় পতাকা খুঁটিয়ে দেখে। তৈরি করেছিলেন অনেকগুলি নকশা। অথচ সেই প্রচণ্ড পরিশ্রম যথাযথ মূল্য পায়নি কালের নিরিখে। কেবল ফসল নিয়েই মাতামাতি বর্তমানের, সেই মাতামাতির গহিনে একলা অর্থকষ্টে তিলে তিলে শেষ হয়ে গিয়েছে চাষি। তাঁকে নিয়ে তেমন মাথাব্যথাও নেই কারও।

এদেশে পতাকার ইতিহাস কম দিনের না। নানা জনজাতি থেকে কৌম, ধর্মীয় হোক, রাজনৈতিক হোক- বিভিন্ন ধরনের নিশান ব্যবহার করেছেন প্রায় প্রত্যেকেই। আঞ্চলিক অধিকর্তা থেকে রাজা-উজির, সবার নিজস্ব নিশান ছিল। কিন্তু একক জাতিসত্তা না থাকায় ছিল না কোনো জাতীয় পতাকা। ১৯০৯ সালে টাইমস পত্রিকায় লিখেছিলেন লর্ড অ্যাম্পটহিল, ভারতের কোনও ভারতীয় পতাকা নেই। জাতীয় পতাকা গড়েই ওঠেনি এদেশে। দেখে তিনি খানিক আশ্চর্যই হয়েছিলেন। অবশ্য এই বিস্ময়বোধ যে অনেকখানি নেতিবাচক, তা বোঝাই যায়। মূলত ভারতকে হেয় করার চেষ্টা থেকেই লেখা প্রতিবেদনটি। কিন্তু এই অভাববোধ জাতীয়তাবাদীরাও অনুভব করছিলেন। সেটা স্বাভাবিক। জাতীয়তাবাদ ব্যাপারটাই মূলগতভাবে অভাববোধ থেকে দানা বাঁধে। এ-গলি ও-গলি আলোচনা চলছিল। চলছিল চেষ্টাচরিত্রও।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হাওড়ার টালিছাওয়া ঘর থেকে সোনা জেতা: অচিন্ত্য শিউলি মনে করাচ্ছেন গোবর গুহ, ভীম ভবানীদের

২০২২ সালের কমনওয়েলথ গেমস্-এ ইতিহাস গড়েছেন বাংলার ছেলে অচিন্ত্য। ভারোত্তোলনে ৭৩ কেজি বিভাগে সোনা এনেছেন। স্ন্যাচ ও ক্লিন অ্যান্ড জার্ক মিলিয়ে ৩১৩ কিলো ওজন তুলে রেকর্ড গড়েছেন তিনি।

১৯১৬ নাগাদ এই ভাবনাচিন্তা, আলোড়নকে নিজের কাজে মূর্ত করে তুললেন পিঙ্গলি। কথার থেকে বেশি হাতে-কলমে কাজে বিশ্বাস ছিল তাঁর। তিরিশটি নকশা এঁকে একটি বই ছাপলেন। মুহূর্তে বইয়ের নকশাগুলি আলোচনার লক্ষ‍্যবস্তু হয়ে দাঁড়াল। বারংবার ঘুরিয়েফিরিয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলল দীর্ঘদিন। ১৯২১ নাগাদ সেই আলোচনা মোটামুটি একটা রূপ পেল। গান্ধীজির নির্দেশে পিঙ্গলি আঁকলেন ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকার নকশা। নাম হলো স্বরাজ পতাকা। গেরুয়া এবং সবুজ হয়ে উঠল ভারতের সবথেকে বড় দুই ধর্মীয় কৌম হিন্দু এবং মুসলিমদের প্রতীক। মাঝে সাদা। তার ঠিক মাঝখানটিতে বসানো হলো চরকা। স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক। এই প্রথম ভারতের স্বরাজ আন্দোলন একটি নিজস্ব পতাকা পেল। অনুপ্রেরিত হয়ে উঠল মধ্যবিত্তর জাতীয়তাবাদ, মূর্ত রূপে উপাসনার পথ আরও প্রশস্ত হলো তাদের।

আজ থেকে প্রায় দেড় শতক আগে অন্ধ্রপ্রদেশের মাছিলিপতনমের কাছে ভাটলাপেনুমারুতে জন্ম পিঙ্গলির। চাষবাস করতেন। করতেন শিক্ষকতাও। জাপানি এবং উর্দু বলতে পারতেন জলের মতো। কম বয়সে ব্রিটিশ আর্মির হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় লড়াই করেছেন। সেসময় তাঁর জীবনে দু'টি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। প্রথমত, ইউনিয়ন জ্যাক এবং ব্রিটিশ সেনাদের সম্পর্কটি খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ পান ভদ্রলোক। ফলে জাতীয় পতাকার ব্যাপারটা তাঁর মাথায় আসে। দ্বিতীয়ত, আফ্রিকাতেই গান্ধীজির সঙ্গে আলাপ হয় তরুণ পিঙ্গলির। সেই আলাপের সূত্রেই গান্ধীজি নিজের হাতে পতাকার নকশা বেছে দেন তাঁকে। শুরু হয় এক নতুন যুগ।

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডর পর, শহিদ স্মরণে প্রথম স্বরাজ পতাকা উত্তোলন করা হলো। সালটা ১৯২৩। ধীরে ধীরে এই নিশানের সঙ্গে পরিচিত হলো ভারত। প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ। সাধারণের কাছে সেসময় একটিমাত্র পতাকাকে জাতীয় পতাকা হিসেবে তুলে ধরা খুব একটা সহজ ছিল না। ছিল না উন্নত প্রযুক্তি। হাতে-কলমে পতাকা বিতরণ, নানা মিছিল-মিটিং-এ পতাকা ব্যবহার করে পরিচিতি তৈরি করতে হতো। তাও বহুলাংশে আপামর নিম্নবর্গ এই পতাকা চিনতেন না, একাত্মও হতে পারেননি সব ক্ষেত্রে। যাই হোক, প্রবল টালমাটাল অবস্থায় ১৯৪৭-এ ভারত স্বাধীন হলো। স্বরাজ পতাকায় কিছু পরিবর্তন আনা হলো। সাধারণত মানুষের ধারণা গান্ধী এবং নেহরু-ই এই পরিবর্তন করেছিলেন। আদতে নকশায় অদলবদলের বুদ্ধি পিঙ্গলির একান্ত নিজস্ব। চরকা সরিয়ে সেই জায়গায় অশোকচক্রের প্রবর্তন করেন তিনিই। ১৫ আগস্ট উত্তোলিত হলো সেই নিশান। লক্ষ লক্ষ ভারতবাসী গর্বের সঙ্গে দেখল নিজেদের জাতীয় পতাকা।

এই বিরাট কাজ নীরবে করে গিয়েছিলেন গান্ধীবাদী মানুষটি। জাতীয় পতাকার কোনও কৃতিত্বই নিতে চাননি‌। ফলে শেষ জীবন তাঁর খুব একটা সুখের হয়নি। অপরিসীম দারিদ্রের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। কেউ তাঁকে চিনত না। জাতি গঠনের অন্যতম বুনিয়াদ যিনি গড়ে দিলেন, অচিরেই তাঁকে বিস্মৃত হলো সেই জাতিই। বিজয়বড়ায় একটি কুঁড়েঘরে থাকতেন পিঙ্গলি। ধুঁকতে ধুঁকতে সম্পূর্ণ বিস্মৃত অবস্থায় সেখানেই মারা যান ১৯৬৩ নাগাদ। কেউ খেয়াল করল না। ২০০৯ সালে এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর নামে একটি ডাকটিকিট চালু করে সরকার। মানুষ আজও তাঁকে চেনে না। অন্ধ্র আর্ট অ্যাকাডেমির সভাপতি জি নারায়ণ রাও দুঃখ করেছিলেন, কোনও সরকারই মানুষটাকে প্রাপ্য সম্মান দিল না। কেবল বিজয়বড়া স্টেশনে ভারতীয় রেল তাঁর একটি মূর্তি গড়ে দিয়েছে‌, এইমাত্র। অগাস্ট স্বাধীনতার মাস। সেই মাসেই জন্মেছিলেন পিঙ্গলি ভেঙ্কাইয়া। ২ আগস্ট তাঁর জন্মদিনে তাঁর অবদানকে কুর্নিশ জানানো যাক।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।