চাপড় ঘণ্ট থেকে মোচার ডালনা, পটলের দোলমা থেকে ওলের আচার, কুসমি শিখছে...

Amrita Bhattacharya
৪ মিনিট
চাপড় ঘণ্ট থেকে মোচার ডালনা, পটলের দোলমা থেকে ওলের আচার, কুসমি শিখছে...

পথের দু'পাশ বরাবর ঘেঁটু ফুলের জঙ্গল। জঙ্গলই বটে। এমন করে বেড়ে উঠেছে যে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। গাছ ভরে কুঁড়ি এসেছে, ওদের বনজ গন্ধে মাতাল করে দেবার দেরী নেই বেশি। এমন ফাগুন দিনে মানুষ কী করে? করে তো কত কিছুই, সেসবের কী আর হিসেব আছে! যাদের রান্নাঘরের চৌহদ্দি পেরিয়ে বুনজ কুসুমগন্ধে মাতাল হওয়ার ফুরসৎ নেই তারা তখন বসে বসে এক মনে উনোনের উত্তাপ পোহায়। দেশ ঘরে কি আর ঘেঁটু ফুল নিয়ে উতলা হওয়া মানায়! মানুষ তো এমন গাছগাছালির মধ্যেই বেড়ে উঠছে, বুড়ো হচ্ছে, ফুরিয়ে যাচ্ছে। ফাগুনের দিন তাই ওর আলো ওর হাওয়া ওর রেণু ঝরানো দুপুর নিয়ে জানলার বাইরে, মজা পুকুরের পাড়ে পাক খেয়ে বেড়ায়। ঘরের মানুষকে সে পথে বের করতে চাইলেই আর পারছে কই বলো! তার যে সিছটির কাজ পড়ে আছে সে খবর রাখো, দখিন হাওয়া? সে কাজের কথা আর কী বলি তোমায়!

এই তো আমাদের কুসমি এখন বসে বসে পাকা কামরাঙা কাটছে, তারার মতো ওর চাক চাক কামরাঙা কালো লবন দে জাড়িয়ে রাখতে রাখতে ওর স্বদ কোরক ভিজে উঠছে নিজের খেয়ালেই। এসব হলে প্পর ও একবার বেরিয়ে পড়তে চাইবে বই কী! আর ঠিক তক্ষুণি মায়ের গলা শুনতে পাবে কুসমি। কুসমি বেগুন কটা কেটে গিয়ে যা মা। কী আর করে আমাদের বাসন্তী কন্যে! কন্যে তখন বসে বসে নিম বেগুনের জোগাড় এগিয়ে দেয় মায়ের হাতের গোড়ায়। মা’র কি ইচ্ছে করে না, ওই বেগুনি কাঞ্চনের তলে বসে আকাশ দেখতে! তা নইলে কেমন করে মা গড়গড়িয়ে বলেই চলে চলে… জানিস কুসমি, নিমবেগুন খেতে হয় এমন সময়ে। আর কদিন পর যুক্তিফুল উঠলে তোকে সুক্তো রেঁধে খাওয়াবো। ধুর, যুক্তিফুলের সুক্তো খেতে বয়েই গেছে কুসমির। অমন থোকা থোকা ফুল দেখলেই কুসমির ইচ্ছে করে বেণীতে অমন ফুল জড়িয়ে ওলটকম্বল গাছের তলে বসে গপ্পো করতে। তবে, কুসমি বেশ টের পাচ্ছে, মা এত সহজে এখন ছাড়বে না। মা এখন বকবক করে মাথা খাবে, হাজারটা আলতুফালতু কথা বলবে। সেসব কথায় ঘুরে ফিরে রান্না আর হেঁশেল পেরিয়ে সাত পাঁক ঘুরে আবার এই রান্নাঘরেই এসে ফুরোবে।

মায়ের ভারী অদ্ভুত ধারণা, এসব না শিখলে নাকি নিন্দে করবে লোকে। ওসব কথায় কান দিতে বয়ে গেছে কুসমির। আসুক তো কেউ, কুসমির মতো করে কুল ছেঁচে দেখাক তো! পারবে কেউ অমন আলগা হাতে নুন লঙ্কা দে তেঁতুল ছড়া জাড়িয়ে নিতে? কুসমি বলে, জানি তো মা, মাছের ঝাল আর কাঁচা তেঁতুলের অম্বল তো শিখেছি! সেদিন তুমি ছিলে না, বাবাকে আমি কুর্তি কলাই বেটে দিইনি বুঝি! এসব শুনলে কুসমি ঠিক জানেন, মা হেসে সারা হবে। মায়ের ইচ্ছে, যত উদ্ভট রান্না শিখে মানুষকে তাক লাগিয়ে দিক কুসমি। চাপড় ঘণ্ট থেকে মোচার ডালনা, পটলের দোলমা থেকে ওলের আচার যতকিছু মায়ের পছন্দ সেসব শেখানোর কী যে ব্যাকুলতা! সত্যি কুসমি এসব বুঝতে পারে না। রুটি নাকি গোল হতেই হবে। আরেবাবা একটু ব্যাঁকা হলেই বা অসুবিধা কী! সেই তো ছিড়েই খাবে। কুসমির বেলা রুটি মা তাই বাবাকে দিতে চায় না। অথচ বাবা হয়তো খুশিই হতো, কে জানে! মায়ের মনের ভেতরটায় ঢুকে একবার চোরা কুঠুরির দরজা গুলো খুলে দিতে ইচ্ছে করে কুসমির। রান্না তো পারেই কুসমি, তাই বলে সব কি শিখতেই হবে? এই এক্ষুনি!

লালটুর মা কি এমন করে সারাদিন! কুসমি তাই মুখ ভার করে সজনে ফুল বাছে। আলু কড়াইশুঁটি দে সজনে ফুলের চচ্চড়ি রাঁধবে মা, মাখো মাখো করে কালিবাউসের রসা রাঁধবে এরপর। তাতেও মায়ের মন ভরবে না, মা তখন বলবে, যা তো কুসমি, শিম কখান তুলে আন। শিম তোলা হলে ধনেপাতা বাটা দে শিম হবে। রাঁধতে রাঁধতে মায়ের বকবক চলবেই, চলবে। বলবে, তোর বাবা একপদে খেতে পারে না রে।

কুসমি জানে, বাবা মোটেও এমন না। মায়ের ভিতরে আস্ত একখানা নারীজম্ম থমকে আছে। সেই জন্মে কেবল নিপুণ গোল রুটি বেলতে হয়, চন্দনের মতো মোলাম করে বাটনা বাটতে হয়, বড়ি দিতে হয় হাতের টানে বড়িদের নাক তুলে তুলে। রুটি খানিক গোল না হলে কীই বা যায় আসে! সবাই কি আর চন্দনের মতো জিরে বাটতে পারে? লালটু, পলটু কেউ কি পারে? পারে না। এসব কথা মাকে বলা শক্ত। কুসমি জানে, লালটু পলটুর চন্দনের মতো জিরে বাটা না শিখলেও ক্ষতি নেই। এমন করে আসলে ওর মা ভাবে। ভাবতে ভালোও বাসে নিশ্চয়ই। কুসমি কিন্তু এমন করে ভাববে না। কুসমি এমন ফাগুনের ভোরে শিরশিরানি না কাটতেই দোলাই গায়ে ওই দূরে সর্ষের মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আহিরিকলাইয়ের বেড়ার পাশটিতে বসে টিয়াপাখি দেখতে যায় একেকদিন। ঝাঁকে ঝাকে সবুজ টিয়ারা কেমন একমনে শুঁটি খায়, সেসব দেখতে ওর ভারী মজা লাগে। খানিক খানিক খাওয়া হলে, ওরা কেমন আশমানি রঙে ধানি সবুজ ডানা ডুবিয়ে উড়ে যায় ওই দূরে! কুসমিরও ইচ্ছে করে অমন করে উড়ে যেতে। সেসব তো আর হবার নয়, কুসমি তাই খানিক পলাশ ফুল কুড়োয়, দু’একটা পিচিকিরি ফুলের কুঁড়ি পেলে সযত্নে তুলে নেয়।

ইস্ লালটু আর পলটুর মতো ওর জামায় যদি পকেট থাকত। রুটি বেলা মেয়েদের বুঝি পকেটের প্রয়োজন নেই! যারা জামা বানায় তারা যেন কেমন! তারা কি মায়ের মতো করে ভাবে? এসব ভাবতে ভাবতে বাড়ির পথে এসে পরে কুসমি। আজ সকাল সকাল গরম মুড়ি ভাজছে মা। গরম মুড়ি দে পাটালি গুড় খেতে ভারী মজা। মায়ের হাতে কুচিকাঠি কেমন ঘুরে ঘুরে পাক খাচ্ছে। কুসমিও একদিন শিখবে এসব। নিশ্চয়ই শিখবে। গরম মুড়ি খেতে কে না ভালোবাসে বলো! কেবল অন্যকে খাওয়াতে হবে বলেই কি মানুষ থোড় ছেঁচকি রাঁধতে শেখে? নিজের জন্য শিখতে নেই বুঝি!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।