'মূর্তি'মান- বিষাদ ও আনন্দ

Ninnisha Talukdar
৪ মিনিট
'মূর্তি'মান- বিষাদ ও আনন্দ

বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলে, বিশেষ করে যারা উত্তরবঙ্গ ঘোরেনি, তারা বেড়াতে যেতে চাইলে দলবল নিয়ে গরুমারা জঙ্গল দেখাতে নিয়ে যেতাম, সেই ছোটবেলা থেকেই। এত বড় হলাম, ব্যাপারটা তবু বদলাল না একটুও।

জঙ্গল শেষ করে রাস্তা দু'ভাগ হয়ে যায়। ডানদিকে বাঁক ঘুরে চাকা গড়িয়ে গিয়ে থামে যেখানে সেইটা ভারি অদ্ভুত একখানা জায়গা! একখানা ব্রিজ, কয়েকখানা ঝুপড়ি দোকান, কয়েকখানা বাড়ি—সরকারি বা বেসরকারি বাংলো, কয়েকখানা কাঠের বাড়ি। ইতিউতি পাথর, কাঠ ডাঁই করে রাখা, মাঝখানে চকচকে কালো মাখনের মত রাস্তা বেরিয়ে গিয়েছে আরও এক আদিম অরণ্যের দিনরাত্রির সঙ্গে। আর, এই সবকিছু যাকে নিয়ে, যার জন্য— আদর, অভিমান, আভিজাত্য সব মেলানো ঝিলমিল করে বয়ে আসা মূর্তি নদী। খানিকটা রোদ্দুর, খানিকটা মেঘ, একটু একটু পাহাড় বসে থাকে দূরে আর চারপাশে সবুজের গালিচা—কোথাও প্যাস্টেল, কোথাও ওয়াটার কালার, মাখামাখি সবুজ। আকাশে নীলের ব্যাপারটাও কিছুটা তেমনই।

আমার কেন জানি মনে হয় জীবনে একবারটি হলেও মূর্তি নদীর কাছে আসা উচিত! এমন বেয়াড়া কথা ভেবেই আমি লোকজনকে, যারা আসেনি এখানে, নিয়ে আসতে চাই— আরেক কাঠি ওপরে গিয়ে আমি নিজেই বহুবার চলে যাই দেখতে যে, এমন ঠাকুমার ঝুলির মত নদীটা বয়ে যায় কোথায় কোথায়...

বেড়াতে আসা লোকজন জুতো খুলে রেখে হেঁটে যায় নুড়িপাথরের ওপর...পাথুরে খানিকটা পথ ফেলে পায়ের ওপর ঠাণ্ডা পাহাড়ি নদীর জল! আহ! আরাম! আঁজলা ভরে খানিকটা চোখে মুখে, খানিকটা মনের ভেতর...

নিচ থেকে দাঁড়িয়ে দেখি, ব্রিজের উপর সাইকেল নিয়ে ওই জলের মতই তিরতির ছুটে যাওয়া স্থানীয় কিশোর-যুবা। এই নদীর উৎস কালিম্পং পাহাড়, সেখান থেকে পথঘাট পেরিয়ে এইখানে তিনি অনন্য। এই মূর্তি নদীর পলিতেই গরুমারা জাতীয় উদ্যানের অনেকটা জমি তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিকভাবে। আবার এই নদীই ভাগ করেছে চাপড়ামারি আর গরুমারা জঙ্গলকে। নদীকে নিয়েই মূর্তি গ্রাম। ব্রিজ পেরোনো জঙ্গল দিয়ে গেলে খুনিয়া মোড়। পৌঁছনো যায় সামসিং, লালিগুড়াস, রকি আইল্যান্ড। একের পর এক চোখ জুড়োনো জায়গা। যেখানেই যাও, পাশে পাশে যেন জীবনের মতো করে বন্ধুর মতো করে কখনও ধীরে কখনও তরতর করে বয়ে চলেছে মূর্তি। বনপাহাড়ি পথ পেরিয়ে কয়েক জায়গায় মূর্তি নদীর দাপটে তৈরি হয়েছে গিরিখাত, যেমন লালিগুড়াস। সমতল থেকে ঘোরানো রাস্তায় অনেকটা নিচে নেমে দেখা মেলে নদীর। উপর থেকে নিচের দিকে তাকালে যতটা ভয়ঙ্কর সুন্দর মনে হয়, নিচ থেকে উপরে দেখলেও ততটাই অদ্ভুত! পাথর বিছোনো জলের কথা আগেই বললাম, এখানে বলে রাখি আশেপাশের সব নদীর মধ্যে বোধকরি এই নদীই সবচেয়ে বেশি পাথর বহন করেছে তার গতিপথে। আশেপাশের নদী বলতে লিস, ঘিস, চেল, নেওড়া, মাল...আর, মূর্তি গিয়ে মিশেছে জলঢাকায়।

নদীর পাশটায় সার বেঁধে দোকান। বছর দশেক আগের মূর্তির সঙ্গে অবশ্য আজকের মিল নেই। ওইসব দোকানে তখন দশ টাকায় পাওয়া যেত কুড়িখানা মোমো, চাট্টিখানি কথা নয়! আজকাল অবিশ্যি খুব বেশি না হলেও মোমোর দাম খানিকটা বেড়েছে বইকি! কিন্তু, তাতে পর্যটকদের খুব কিছু যায় আসে না। বেড়াতে বেড়াতে পেটে ছুঁচোদের রেস শুরু হলে আদিবাসী মহিলাদের হাসিমুখে এগিয়ে দেওয়া শালপাতায় রসুন লঙ্কার চাটনি মাখানো মোমো খেলে তৃপ্তির হাসি থাকবেই তা লেখাই সঙ্গত! সামান্য বড় ছেলেমেয়েরা বন থেকে নিয়ে আসে লেবু, ফুল। খানিক দরদাম, খানিক আনন্দ, খানিক কৌতূহল, খানিক শহুরে লোকের কাণ্ডকারখানা দেখে হেসে গড়িয়ে পড়া... ওদিকে গাড়ির ভিড় বাড়ে, বাইকে উড়ে আসে কপোত-কপোতী, গাড়িভর্তি সপরিবার ট্যুরিস্ট পার্টি... সাহস করে, জলের মেজাজ-মর্জি বুঝে কেউ-বা জুতোজোড়া হাতে করে পেরিয়ে যায় নদী, ওপারেও সেই পাথর বাঁধানো ধাপ। অসংখ্য ছবি, সেলফিতে মুহুর্তবন্দি হয়ে থাকে প্রতিটি কথা, প্রতিটি আনন্দ...

এর মাঝে দোতারা বাজিয়ে কেউ হয়তো গেয়ে দেয় ভাওয়াইয়া গান,

"বটবৃক্ষের ছায়া যেমন রে

মোর বন্ধুর মায়া তেমন রে…"

তারপর, সূর্য ডোবার পালা... পাহাড়-জঙ্গলের ওপারে সূর্য ডুবতে থাকার অদ্ভূত সুন্দর একখানা ছবি কতদিন পর্যন্ত মনে লেগে থাকবে হিসেব রাখা দায়! সন্ধ্যা নামতে নামতেই বন দফতরের নিষেধ মেনে নদীর ওপরের ব্রিজ বন্ধ। কারণ একটাই- হাতির ভয়! তা যে কী এক হিমহিম আতঙ্ক, শহরে বসে বোঝা মুশকিল! সকালের রং বদলে কালচে হয়ে আসা মূর্তি নদীর জল, পাথরের ঠাণ্ডা গায়ে লেগে লেগে বয়ে যাচ্ছে কোন মহাকালের অনন্ত পথে... ওপারে অন্ধকারে ডুবে থাকা বন! সমস্ত জায়গাটায় এক কালরাত্রির ঘোর। কোথায় কী কী ঘটে চলেছে, তা কেবল মূর্তিই জানে। আর জানে, তার জল।

আরেকটি ছবি হতে পারে জ্যোৎস্না ঠনঠন করা রাতে!

যেন ফেলে দেওয়া খাবারের প্যাকেট থেকে, প্রতিটা হেরে যাওয়া মানুষের অল্প অল্প ফিসফিসানির ভিতর থেকে, একা হাতির অন্ধকারে জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলে বড় কোনও গাছের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার মধ্য থেকে, চাঁদ নেমে আসে সন্তর্পণে। জলের ওপর বিছিয়ে দেয় ওড়না, ছলকে ওঠে জল। সেই কোন পাহাড় থেকে সমতল হয়ে আরেক নদীতে মিশে যাওয়া মুর্তি নদী তখন সদ্য যৌবনে পা রাখা মনটির মত! বয়ে চলেছে সমস্ত সুখ, আবেশ, সৌন্দর্য সঙ্গে নিয়ে। চরাচর ভেসে যাচ্ছে সেই নরম আলোয়। মন থেকে ঠিক ওই সময়টাতেই ধুয়ে মুছে যায় সমস্ত কালিমা, সমস্ত শোক, সমস্ত না পারার ভয়। সেই সময়টুকু বুঝি শুধু সেই নদী আর আমার! সেই সময়টুকু নদী এবং তোমারও। স্রোতে ভেসে ভেসে যায় কথা, কথা তারপর সেই স্রোতের মধ্যে দিয়েই ফিরে ফিরে আসে। সেই সমস্ত নীরবতা, চুপ করে থাকা, অস্থির জীবনে স্বচ্ছতোয়া হয়ে বয়ে চলা নদীর চেয়ে বড় সত্যি আর কিছু নেই—তখন এই ঘোরটুকুই লেগে থাকে সবখানে। ও পাশে মায়াবী অরণ্য, এ পাশে নদীর মোহ। সময় থমকে যায়। ধু ধু শূন্যতার ভিতর নিঃসঙ্গ শালিকপাখির মতো দাঁড়িয়ে থাকি...

জীবনকালের সমস্ত থেমে থাকাকে তুচ্ছ করে, সবকিছুর সাক্ষী হয়ে মূর্তি নদী পেরিয়ে আসে অতীত, বর্তমান। কত চেনা সুখ, দুঃখ, ব্যথা, আনন্দের পাওয়া আর না পাওয়াকে নিয়ে বনপাহাড়ি ছুঁয়ে, ম্যাজিক ছিটিয়ে চলে যায় একের পর এক পাহাড়ি গ্রামে, আমরা কোথাও তার গালভরা নাম দিয়ে বলি ভিউপয়েন্ট কিম্বা ট্যুরিস্ট স্পট! তার এসবে বয়েই গেছে! কখনও মনে হয়, জলের আত্মাই যেন গেয়ে উঠল- আর তারপর, পাথরের ভিতরের দিয়ে, গাছের ভিতর দিয়ে, হুইসল মেরে চলে যাওয়া শেষ ট্রেনের শব্দের ভিতর দিয়ে এসে সেই জলের গান স্পর্শ করল আমাকেও।

"মোর বন্ধু গান গায় মাথা তুলি না চায়

মুই নারী যাও জলের ঘাটে

থমকি থমকি হাটোং চোখে ইশারা করোং

তবু বন্ধু না দেখেন মোরে…"

এলোমেলো হয়ে যায় সবকিছু। আমাদের অসংখ্য চাওয়ার এবং ততোধিক না পাওয়ার কত কথা থেকে যায়— খানিকটা তার নদী বোঝে, খানিকটা জলেই ভেসে যায়!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।