বারুইপুর কাণ্ড: ২৮ ঘন্টা পার, ঘটনাপ্রবাহ এক নজরে
Baruipur case: বারুইপুরে ১১ বছরের নাবালিকার মৃত্যু ঘিরে কীভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠল গোটা এলাকা? কীভাবে উদ্ধার হল বস্তাবন্দি দেহ, কেন জারি করা হল BNSS-এর ১৬৩ ধারা, কতজন গ্রেফতার হয়েছেন এবং SIT তদন্তে এখনও পর্যন্ত কী কী তথ্য সামনে এসেছে?
দক্ষিণ ২৪ পরগণার বারুইপুরে এক এগারো বছরের নাবালিকার মৃত্যু ঘিরে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছে। যৌন নির্যাতন ও খুনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে বিক্ষোভ, গণপিটুনি, পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক তরজায় পরিস্থিতি দ্রুত অশান্ত হয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসন বারুইপুর, সোনারপুর এবং নরেন্দ্রপুর থানার অধীন এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS)-এর ১৬৩ ধারা জারি করেছে। এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। চলছে কড়া নজরদারি।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার তদন্তে ইতোমধ্যেই দু'জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বারুইপুর পুলিশ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, শনিবার (৫ জুলাই) বান্ধবীর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ষষ্ঠ শ্রেণির ওই ছাত্রী। তারপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। মেয়েকে না পেয়ে পরিবারের লোকেরা থানায় যায়। জানায় যে তাদের মেয়ে নিখোঁজ। কিন্তু অভিযোগ, দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও পুলিশ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এরপর স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা শুরু করেন।
রবিবার (৬ জুলাই) সকালে স্থানীয় একটি পুকুর থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হয় নাবালিকার দেহ। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা এলাকায় ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। স্থানীয় মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। দীর্ঘক্ষণ মৃতদেহ রাস্তায় রেখে প্রতিবাদ চলে। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার এবং কঠোর শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে বারুইপুর।
বিক্ষোভের মধ্যেই খুনের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক ব্যক্তিকে ধরে গণপিটুনি দেয় উত্তেজিত জনতা। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Aruna Shanbaug Rape Case: হাসপাতালের তৎকালীন ডিন, ডঃ দেশপান্ডে ওই জুনিয়র ডাক্তারকে বাঁচতে 'পায়ুপথে ধর্ষণ' বা সোডোমি-র বিষয়টি উল্লেখ করেননি।
পুলিশ জানিয়েছে, নাবালিকার যৌন নির্যাতন ও খুনের মামলার পাশাপাশি গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনায় এবং সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তকারীরা সব দিক খতিয়ে দেখছেন বলে প্রশাসনের দাবি।
ঘটনার জেরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় বারুইপুরের মহকুমাশাসক ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করেন। এই নির্দেশ বারুইপুর, সোনারপুর এবং নরেন্দ্রপুর থানার অন্তর্গত এলাকায় কার্যকর হয়েছে। প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ। কোনো ধরনের অস্ত্র বহন করা যাবে না এবং লাউডস্পিকার ব্যবহারের উপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ বহাল থাকবে।
এলাকাজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সংবেদনশীল এলাকায় চলছে টহলদারি। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, কোনোরকম অশান্তি বা আইনভঙ্গের ঘটনা বরদাস্ত করা হবে না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনের নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয়দের একাংশ পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, নিখোঁজ হওয়ার পরপরই যথাযথ তৎপরতা দেখানো হলে হয়তো তদন্ত আরও দ্রুত এগোতে পারত। আবার এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, স্থানীয়দের উদ্যোগেই সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয় এবং সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই অভিযোগগুলির বিষয়ে পুলিশ এখনও বিস্তারিত কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
এদিকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর। শাসক ও বিরোধী—উভয় পক্ষই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একে অপরের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। বিরোধী শিবিরের একাংশের দাবি, অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজনের রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে এবং সেই কারণেই প্রথম দিকে পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। এমনও অভিযোগ উঠছে, বিজেপি নেতা শান্তনু মন্ডল চারজন অভিযুক্তকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনেন। অন্যদিকে শাসক দল এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, একটি সংবেদনশীল ফৌজদারি ঘটনাকে রাজনৈতিক রং দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সংগঠন নারী নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে অভিযুক্তদের রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগের পক্ষে এখনও পর্যন্ত তদন্তকারী সংস্থা বা প্রশাসনের তরফে কোনো সরকারি বা স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এই সমস্ত অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ বর্তমানে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের নারী নিরাপত্তার প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। স্থানীয় মানুষের দাবি, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে মহিলা ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। তাঁদের বক্তব্য, এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
নাবালিকার মৃত্যুর বিচার এবং প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে এখনও ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকা। তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং এই ঘটনার সমস্ত দিক কত দ্রুত প্রকাশ্যে আসে, এখন সেদিকেই নজর রাজ্যবাসীর।
বর্তমানে বারুইপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। প্রশাসন মানুষের কাছে শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছে। একই সঙ্গে তদন্তকারীদের দাবি, সমস্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ করা হবে।






