চিরনম্র অথচ প্রত্যাখ্যানে ঋজু, সন্ধ্যা-হারা বাংলাগান....

Sindhu Som
৩ মিনিট
চিরনম্র অথচ প্রত্যাখ্যানে ঋজু, সন্ধ্যা-হারা বাংলাগান....

সুরসম্রাজ্ঞীর শোক মিটতে না মিটতেই চলে গেলেন গীতশ্রী। ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২, চোখের জলে লেখা থাকবে দিনটি। বেশ কিছুদিন ধরেই ভুগছিলেন গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। বাথরুমে পড়েও যান তিনি। ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ে। ভর্তি করা হয়েছিল আইসিইউতেও। ধীরে ধীরে অবস্থা স্থিতিশীল হলেও কিন্তু শেষরক্ষা হল না। আপামর বাঙালিকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। গত ২৩শে জানুয়ারি বাথরুমে পরে যাওয়ার পর থেকেই চলছিল যমে মানুষে টানাটানি। দীর্ঘ তেইশ দিনের লড়াইয়ের পর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের অব্যবহিত পূর্বে পদ্মশ্রী ফিরিয়ে নজির সৃষ্টি করেছিলেন সন্ধ্যা। চিরমৃদুভাষী, নম্র, প্রত্যাখ্যানে ঋজু বাঙালির একান্ত আপন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গোটা জীবনের ছবিটায় একবার চোখ বুলানো যাক।

অবিভক্ত বাংলায় ১৯৩১ সালে জন্ম সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের। বাবা ছিলেন রেলের কর্মকর্তা নরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, মা হেমপ্রভা দেবী। ছয় ভাইবোনের সবথেকে ছোট সন্ধ্যা। ১৯১১ সাল থেকেই তাঁর পরিবার বাস করে আসছিল ঢাকুরিয়াতে। পণ্ডিত সন্তোষ কুমার বসু, অধ্যাপক এ টি ক্যানন এবং চিন্ময় লাহিড়ীর কাছে গান শিখেছিলেন তিনি। যদিও হিন্দুস্থানি ক্লাসিক্যাল শেখার গুরু ছিলেন পণ্ডিত বড়ে গুলাম আলি খান। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র উস্তাদ মুনাওয়ার আলি খান। মূলত মুনওয়ার আলি খানের তালিমেই ধীরে ধীরে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পারদর্শী হয়ে উঠছিলেন সন্ধ্যা। এই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম স্বতস্ফূর্ত ভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর সমস্ত প্লে ব্যাক এবং আধুনিক গানেও।

১৯৪৮ সালে হিন্দি গানের প্লে ব্যাকের মাধ্যমেই গানের জগতে প্রথম পদার্পণ সন্ধ্যার। রবিন চ্যাটার্জির সঙ্গীত পরিচালনায় ‘সব্যসাচী’ ‘আয়ি মেরে জীবন কি সাঁঝ সুহানি’ এবং ‘দিল ভি উদাস উদাস চমন ভি উদাস’ –গান দুটি গান। ১৯৫০ সালে ‘পেহলা আদমি’ সিনেমায় আর সি বরাইয়ের সঙ্গীত পরিচালনায় করেন চারটি গান। ১৯৫১তে শচীন কত্তার সুরে ‘সাজা’ ছবিতে দুটি, এবং অনিল বিশ্বাসের সুরে ‘তারানা’ ছবিতে একটি গান। কিন্তু পরের বছর হঠাৎ ব্যক্তিগত কারণে মুম্বই থেকে কলকাতায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। যদিও হিন্দি ছবিতে প্লে ব্যাক করা থামননি তিনি। একে একে ১৭টি হিন্দি ছবিতে গান গেয়েছেন।

বাংলা প্লে ব্যাকের জগতে সন্ধ্যার প্রবেশ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরেই। হেমন্ত তখন মুম্বই ও কলকাতা–উভয় শহরেই বেশ নাম করা শিল্পী। বিশেষত ‘শাপমোচন’-এর পর থেকে উত্তমের গলার সঙ্গে হেমন্ত ছাড়া আর কোনও গলায় মনে ধরত না বাঙালির মনে। পাশাপাশি সুচিত্রা সেনের লিপে একের পর এক বিখ্যাত বহুশ্রুত সমস্ত সন্ধ্যার গান। “ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা”, “তুমি না হয় রহিতে কাছে”, “গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু” থেকে হেমন্তের সঙ্গে ডুয়েটে “নীর ছোট ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়” থেকে “তুমি আমার চিরদিনের সুর” –উত্তমের পর্বত প্রমাণ সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়েরও নাম অনেক খানি। হেমন্তর কথা, সুরে গেয়েছেন, “এই পথ যদি না শেষ হয়” থেকে “তুমি যে আমার’-এর মতো হিট বাংলা ছায়াছবির গান।

১৯৬৬তে গীতিকার শ্যামল গুপ্তকে বিয়ে করেন সন্ধ্যা। শ্যামলের লেখা কথায় বহু গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। গেয়েছেন রবিন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে গেয়েছেন “এ শুধু গানের দিন”, “জানিনা ফুরাবে কবে এই পথ চাওয়া” ইত্যাদি বিখ্যাত গান। সলিল চৌধুরির সঙ্গেও সন্ধ্যার জুটি রীতিমতো হিট। “উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা”র মতো অবিস্মরণীয় গান তৈরি হয়েছে।

‘সন্ধ্যা দীপের শিখা’র জন্য ১৯৬৫-তে পাচ্ছেন সেরা প্লে-ব্যাক গায়িকার সম্মান। এছাড়াও ‘জয়-জয়ন্তী’ ছবিতে “আমাদের ছুটি ছুটি” এবং ‘নিশিপদ্ম’ ছবিতে “ওরে সকল সোনা মলিন হল” গাওয়ার জন্য ১৯৭১ সালে পাচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ নেপথ্য গায়িকা হিসাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ১৯৯৯ সালে ভারত নির্মাণ পুরস্কারে ভূষীত করা হয় তাঁকে। ২০১১তে বঙ্গ বিভূষণ সম্মানে সম্মানিত করা হয় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেওয়া লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর প্রতি সহমর্মিতায় যোগ দিয়েছিলেন ভারতীয় বাঙালি শিল্পীদের গণ আন্দোলনে। অর্থও সংরহ করেন তাঁদের জন্য। বাংলাদেশের সঙ্গীত শিল্পী সমর দাস যখন বাংলাদেশে স্বাধীন বেতার কেন্দ্র স্থাপন করলেন, তাঁকে সাহায্য করার জন্য কয়েকটি দেশাত্মবোধক গানও রেকর্ড করেন সন্ধ্যা। জেলবন্দি শেখ মুজিবর রহমানের মুক্তি উপলক্ষে গেয়েছিলেন ‘বঙ্গবন্ধু তুমি ফিরে এলে’ গানটি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হল। স্বাধীন বাংলার প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারি পালন উপলক্ষ্যে ঢার পল্টন ময়দানে একটি উন্মুক্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নতুন বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম বিদেশি হিসেবে গান করেন সন্ধ্যা।

এ বছরই তাঁকে পদ্মশ্রী দিতে চেয়েছিল ভারত সরকার। কিন্তু এত সাফল্য মণ্ডিত এত বড় সঙ্গীত জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে এত সামান্য পুরস্কার নিতে সম্মানে বেঁধেছিল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের। সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন সে পুরস্কার। একরাশ অভিমান নিয়ে, অযোগ্য পুরস্কারের অপমান নিয়ে চলে গেলেন আজ। তাঁর জন্য বাঙালির গীতশ্রীই যথেষ্ট। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে, তাঁর জীবন ও সৃষ্টিকে মাপা যায় না মামুলি রাষ্ট্রের স্বীকৃতিতে। বাঙালি শ্রোতার হৃদয়ে তিনি অমর হয়ে থাকবেন রাষ্ট্র তাঁকে চিনুক, আর নাই চিনুক।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।