ফের কৃষ্ণাঙ্গ শিশুকে নিগ্রহ! ফ্লয়েডের মৃত্যুতেও বদলায়নি মার্কিন ঘৃণার রং

Sindhu Som
৪ মিনিট
ফের কৃষ্ণাঙ্গ শিশুকে নিগ্রহ! ফ্লয়েডের মৃত্যুতেও বদলায়নি মার্কিন ঘৃণার রং

ভারতে গায়ের রং নিয়ে হীনম্মন্যতা, অহংকার এতটাই রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গিয়েছে যে, এদেশে ফরসা হওয়ার ক্রিম লোকে ব্যবহার করে। আর্য ধারার সৌন্দর্যের ধারণা আর আরবি ধারার সৌন্দর্যের ধারণায় তেমন পার্থক্য নেই। ফলে দু'দিক থেকেই তথাকথিত 'অসুন্দর' এদেশের মানুষ। ভারতের প্রেক্ষিতে বর্ণবিদ্বেষ তুমুলভাবে ফিরে আসে নবজাগরণের আলোয়। ইংরেজদের এই গুণটিকে নিজের সঙ্গে মেলাতে পেরে ভারতীয় মধ্যবিত্ত সেদিন খুশি হয়েছিল। আফ্রিকা থেকে জাহাজে করে যেভাবে কালো মানুষদের তুলে আনা হয়েছিল, তা ভারতীয়দের কাছে অকল্পনীয়। জাহাজের খোলের ভেতরে হাজার হাজার মানুষকে হাতে পায়ে বেড়ি দিয়ে দাস হিসেবে অবলীলায় যে ‘সভ্যতা’ তুলে আনতে পারে, তাদের ‘সভ্যতা’-র পরিমাপ নিয়ে সংশয় থাকে বইকি! দীর্ঘদিন শোষিত হতে হতে একসময় কালো মানুষরা রুখে দাঁড়ায়। আমেরিকাকে দেশ বলে স্বীকার করে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম। আফ্রিকান-আমেরিকান পরিচিতি নির্মিত হয়। আমেরিকা স্বাধীন হয়, কালো মানুষদের অবস্থা পাল্টায় না। কালো মানুষদের সমস্যা সামনে রেখে গৃহযুদ্ধ হয়, এতেও তাদের অবস্থার উন্নতি হয় না। উদ্বাস্তু চিনাদের প্রতি ঘৃণা, আইরিশদের প্রতি ঘৃণা, ইন্ডিয়ানদের প্রতি ঘৃণা, মেক্সিকানদের প্রতি ঘৃণা– এর কোনওকিছু থেকেই স্বাধীন হতে চায়নি আমেরিকার শ্বেতাঙ্গরা দীর্ঘদিন। একের পর এক আন্দোলন হয়েছে। এদিকে সংবিধান সবাইকে সমান অধিকার দিয়েছে। কিন্তু প্রশাসন চালায় কারা? তারাও তো শ্বেতাঙ্গ সমাজেরই। সাধারণের ঘৃণা সরকার অনুমোদিত ক্ষমতায়, ইউনিফর্মে, লাঠিতে, বন্দুকে শানিত চকচকে হয়ে ওঠে। ছয়ের দশকে এই ঘৃণা যখন চরমে, তখন কৃষ্ণাঙ্গ রাজনীতির ধারাটি আরও শক্ত হচ্ছে। বিশ্বজোড়া সেই শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে পদে পদে গর্জে উঠছে তারা। শ্বেতাঙ্গের সংস্কৃতি, আধিপত্য অস্বীকার করে নিজস্বতা নির্মাণ করছে তার। লাগাতার এই অ্যাক্টিভিজম কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের কিঞ্চিৎ শ্বাস ফেলার সুযোগ দিচ্ছে। 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' আরও প্রেরণা জুগিয়েছে এই আন্দোলনকে।

কিন্তু তা কতটুকু? জর্জ ফ্লয়েডকে গলায় পা দিয়ে সেই শ্বাস কেড়ে নিয়ে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ যখন বুঝিয়ে দেয় এ তার অনুদানমাত্র, চাইলেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা তার আছে প্রকাশ্য রাস্তায়– তখন তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে আরেকবার। বিশ্বজুড়ে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন আবারও প্রাণ পায়। মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসের সেই পুলিশ স্টেশন ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়। কিন্তু ক্ষমতার উচ্চতা থেকে ‘ক্ষমা চাওয়া’ এমন এক সাবান, যা দিয়ে যাবতীয় রক্তের দাগ তুলে ফেলা যায় না। সেই ঘটনার বছরদুয়েক পরে ফের ভাইরাল হল একটি শিশুকে ছেঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা। সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের সিরাকাসের রাস্তায় ঘটে যাওয়া এমনই এক ঘটনার সাক্ষী থাকল সমস্ত বিশ্ব। কেনেথ জ্যাকসন নামে ওই অঞ্চলের এক বাসিন্দা গত রবিবার কাজে বেরিয়েছিলেন। হঠাৎ তাঁর নজরে পরে একটি বছরআটেকের কৃষ্ণাঙ্গ শিশুকে তিন-চারজন পুলিশ তার সাইকেল থেকে টেনে তুলে আনছে। চারিদিকে ডোরিটো ছড়িয়ে রয়েছে ইতস্তত। কেনেথ জানান, “সাইকেলের থেকে ওকে হেঁচড়ে নামানো হয়”, এই ঘটনা দেখেই ক্যামেরায় ঘটনাটি রেকর্ড করার সিদ্ধান্ত নেন সাঁইত্রিশ বছরের কেনেথ। প্রতিবাদে সরব হন তিনি। “আরে আরে, করছেন কী আপনারা?” ফোনে রেকর্ডিং করতে করতে আর্তনাদ করে ওঠেন ভদ্রলোক। একজন অফিসার তখন শিশুটির হাত পিছন দিকে মুচড়ে ধাক্কা দিতে দিতে তাকে গাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে সেই পুলিশ কেনেথকে ভেঙিয়ে বলেন, “জানেন না কী করছি? চোখে দেখতে পান না?” সেই সময় আরেকজন অফিসার এগিয়ে আসেন কেনেথের দিকে। তিনি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে বলেন, “চুরি করেছে তাই।" ধীরে ধীরে লোক বাড়ছিল। পাশ থেকে একজন বলেন, “বছরদশেকের বেশি বয়স না বাচ্চাটার। এভাবে কেউ ধরে?” গোটা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, হাতের ব্যাথায় বিশ্রীভাবে আর্তনাদ করছে ছেলেটি। জোর করে তাকে পুলিশের গাড়ির পিছনের আসনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

টুইটটি দেখুন:

https://twitter.com/HunndoHefner/status/1516069289362706437?t=uPbuL7vORpBNg_Op5ZCTeQ&s=19

ভিডিওটি নিয়ে সরগরম নেটদুনিয়া। অনেকেই নানা বিকল্পের সন্ধান দিচ্ছেন। রাস্তার মাঝে এইভাবে অত্যাচার না করেও নানা পন্থা নেওয়া যেত বলেই তাঁদের বিশ্বাস। এমনকী, ছেলেটির বাবা মা-কেও ডাকা যেতে পারত। ছেলেটি একটি ডোরিটোস-এর প্যাকেট চুরি করেছিল বলেই অভিযোগ। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কেনেথ নিজেই সেই দাম মিটিয়ে দিতে চাইছেন। অথচ পুলিশের বিকার নেই। জানা গিয়েছে, ছেলেটি এবং তার ভাইদের পরে বাড়িতে দিয়ে আসে পুলিশ। অভিভাবকদের জানানো হয় চুরির ব্যাপারটি। তখনও ছেলেটির বাবা ভিডিওটি দেখেননি। বরং পুলিশের আচরণ বন্ধুত্বপূর্ণ বলেই মনে হয়েছিল তাঁর। এরপরে ভাইরাল ভিডিওটি দেখেন সেই ভদ্রলোক। পুলিশের সেই আচরণ দেখে মি. উইহ্‌ যারপরনাই বিরক্ত ডিপার্টমেন্টের ওপর। “একটা বাচ্চা ছেলের সঙ্গে কীভাবে এরকম ব্যবহার করতে পারে পুলিশ?” ক্ষোভ উগরে দেন এক কৃষ্ণাঙ্গ পিতা।

মুহুর্মুহু সমালোচনায় শহরের মেয়র একটি বিবৃতি দিতে বাধ্য হন। এবং ঘটনার যাবতীয় ফুটেজ, যা বডি ক্যামেরায় বন্দি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন তিনি। মেয়র বেল ওয়ালশ এও জানান, বাচ্চাটিকে ওই পুলিশকর্মীরা আগে থেকেই চিনত। এর আগেও ছোটখাটো চুরি করেছে বাচ্চাগুলো। পুলিশ তাদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এসেছে এবারও। কোনওরকম অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। চাপের মুখে পুলিশ ডিপার্টমেন্টও জানাতে বাধ্য হয়েছে, “বাচ্চাটিকে হাতকড়ি পরানো হয়নি।” যদি সত্যি তাই হয়ে থাকে, যদি চুরির ঘটনার জন্যই আটক করা হয়ে থাকে বাচ্চাটিকে, সেক্ষেত্রেও অমন ব্যবহার করা যায় কি? শ্বেতাঙ্গ বাচ্চাদের ক্ষেত্রে, অভিজাত পরিবারের অপরাধী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এতটাই অধৈর্য হতে দেখা যায় এই পুলিশদের? শাসনের মাত্রা সম্বন্ধে প্রশাসনের জ্ঞান থাকবে না? না কি আসল ব্যাপারটা লুকিয়ে আছে কয়েকশো বছর ধরে চলে আসা অপরীকরণের মধ্যে? ফ্লয়েড হত্যার পরে পুলিশের এই ভূমিকা নিয়ে জাতিবিদ্বেষ উদযাপনের প্রশ্ন উঠবেই। বিশেষত, এক প্যাকেট ডোরিটোসের দাম যখন তিন ডলার।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।