অলৌকিক সংলাপ: শিশিরকুমার দাশের অত্যাশ্চর্য কীর্তি

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
অলৌকিক সংলাপ: শিশিরকুমার দাশের অত্যাশ্চর্য কীর্তি

ধরা যাক, আমরা পিছিয়ে গেলাম আজ থেকে তিন হাজার বছর আগেকার কোনো সময়ে। তখনও মানুষ বসবাস করত এ পৃথিবীতে – তারা কৃষিকাজ করেছে, নগরপত্তন করেছে, যুদ্ধ করেছে, অন্য মানুষকে হত্যা করেছে; আবার একইসাথে, কেউ কেউ কবিতা লিখেছে, তৈরি করেছে সুর। ধরা যাক, সেই সময়ের পৃথিবীর বিভিন্ন ভৌগলিক অবস্থান থেকে যদি নির্বাচন করা হয় কিছু চরিত্র – কেউ কেউ হয়তো রক্তমাংসের জ্যান্ত মানুষ, আবার কেউ কেউ হয়তো সেই রক্তমাংসের জ্যান্ত মানুষদের সৃষ্ট কল্পনা – তেমনই কিছু চরিত্র যদি নিয়তির পরিহাসে পরষ্পরের মুখোমুখি হয়? যদি মহাভারতের অন্ধ সম্রাট ধৃতরাষ্ট্রের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুরু করেন সফোক্লিস সৃষ্ট গ্রিক ট্র্যাজেডির বিখ্যাততম চরিত্র রাজা ওয়েদিপাউস, আর তাঁদের কথোপকথনে যুক্ত হন সেই একই লেখকের সৃষ্টি অন্ধ-ত্রিকালজ্ঞ তেইরেসিয়াস? যদি প্রাচীন ভারতের প্রবাদপ্রতিম নাট্যকার কালিদাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তৎকালীন গ্রিসের তাত্ত্বিক-দার্শনিক অ্যারিস্টটলের? যদি গ্রিক এপিক ইলিয়াডের অন্যতম প্রধান চরিত্র প্যারিস, যার উদ্দাম প্রেম এবং হেলেনকে নিয়ে ট্রয় থেকে পালিয়ে আসার কাহিনি দিয়ে সুত্রপাত দীর্ঘ মহাযুদ্ধের, তার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হয়ে যায় দেবরাজ ইন্দ্রের, কেমন কথোপকথন জন্ম নেবে সে সাক্ষাৎ থেকে?

বাস্তবে এ সাক্ষাৎ হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু বস্তুজগতের বাস্তবতায় মানুষ আর কতদিনই বা নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখতে পেরেছে? কল্পনার বাস্তবতা চিরকালই বস্তুজগৎ ছাড়িয়ে ডানা মেলেছে অসীম শূন্যতায়। শিশিরকুমার দাস তাঁর অলৌকিক সংলাপ বইয়ে নথিভুক্ত করেছেন এমনই দশটি কাল্পনিক সংলাপ যেখানে একাকার হয়ে মিশে গেছে গ্রিস থেকে ভারতবর্ষ, হেলেন থেকে সীতা, ঊর্বশী থেকে অ্যাফ্রোদিতে। প্রাচীনকালের মহাকাব্য চিরকালই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সাহিত্যের ছাত্রছাত্রী মাত্রেই তার সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। কিন্তু অ্যাকাদেমিক পরিসরের বাইরে, মুখে মুখে জনশ্রুতির মধ্যে মিশে থাকা বিরাটাকার এই কাহিনিদের সচরাচর খুব বেশি লেখক তাঁদের সৃষ্টিশীল কাজের আওতায় নিয়ে আসেন না। শিশিরকুমার দাস সেই বিরলতম লেখকদের মধ্যে অন্যতম, যিনি আজীবন অ্যাকাদেমিক পরিসরে নিরলস পরিশ্রম করেও একের পর এক সৃষ্টিশীল সাহিত্যকীর্তি রচনা করে গেছেন, লিখেছেন কবিতা। একদিকে যেমন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পত্তন এবং ঊনিশ শতকের বাংলা নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ লিখেছেন তিনি, তেমনই গ্রিক থেকে সরাসরি অনুবাদ করেছেন অ্যারিস্টটলের পোয়েটিক্স, সাফোর কবিতা। পাণ্ডিত্যের এমন বৈচিত্রপূর্ণ প্রসারণের মধ্যেই অলৌকিক সংলাপ একটি আশ্চর্য সৃষ্টি, যেখানে মিশে গিয়েছে তাঁর অগাধ জ্ঞানের ভাণ্ডার এবং সেই ভাণ্ডার থেকে তুলে আনা কবির মনন।

যেমন ধরা যাক কালিদাস আর অ্যারিস্টটলের সংলাপটি, যা দিয়ে এই বই শুরু হয়। কোনো নাটকের উৎসব হচ্ছে, যেখানে কালিদাসের শকুন্তলা অভিনয় চলছে, আর অ্যারিস্টটল সেই উৎসবের বিচারক – এমন প্রেক্ষিতে কথাবার্তা শুরু দু'জনের। দুই মহীরূহের এই কাল্পনিক সংলাপে শিশিরবাবু খানিক গল্পের ছলেই দেখিয়ে দেন গ্রিক এবং ভারতীয় নাটকের কাঠামোর মূল পার্থক্যটি – যেটুকু হয়তো করা যেতে পারত কোনোপ্র গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ দিয়েও, যা আমরা সচরাচর পড়েই থাকি। কিন্তু শিশিরবাবুর মুন্সিয়ানা এখানেই – এই সূত্রটুকু তাঁর যাত্রার সূচনামাত্র, এর পরে তিনি পাড়ি দেবেন অসীমত্বে। নাটকের নন্দনে শুরু যে আলোচনা, সেই আলোচনা মোড় নেবে জীবনের দর্শনে, অ্যারিস্টটল কালিদাসকে জিজ্ঞেস করবেন, প্রেম কাকে বলে তুমি জানো কালিদাস? আর কালিদাসের উত্তর চকিতে নিয়ে যাবে সাফোর কবিতার কাছে, “পাহাড়ের গায়ে অরণ্যের ঝড় যেমন করে ঝাঁপিয়ে পড়ে”, অ্যারিস্টটল চমকে সাফোর কবিতার কথা মনে করেই বলবেন, প্রেমের মতোই, “মানুষের কঠিন সমস্যা কী ভাবে তাঁকে যুক্তি, নীতি, কর্তব্যের পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, কী ভাবে মানুষ সহজকে পরিত্যাগ করে কঠিনের বুকের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে”। আর কালিদাসের উত্তর হয়তো মনে করিয়ে দেবে জীবনানন্দকে, “দেখেছি, কিন্তু বুঝেছি জীবন আরও বড়।… মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু তার পরেও জীবন থেকে যায়”।

প্রাচীনকালের এই চরিত্রদের শিশিরবাবু এমন জাদুতে পরিবেশনা করেন, মুহূর্তে যেন ছিন্ন হয়ে যায় দেশ-কাল-ভূগোলের গণ্ডী, মনে হয় তাঁরা কথা বলছেন এই সমসময়ের মানুষের যন্ত্রণা, দুঃখ, আনন্দ, কষ্ট নিয়ে। কালিদাসের অনুভব, হেলেন, অ্যাফ্রোদিতে, ইন্দ্র, প্যারিস, ধৃতরাষ্ট্রের অনুভব স্পর্শ করে হাজার হাজার বছর পরবর্তী মানুষকেও, তাদের জীবনের জটিল আবর্তে তারা ছুঁয়ে যেতে পারেন অতীতের এই বাস্তব বা কল্পনার মানুষদের। অলৌকিক সংলাপ বইটির এই নিতান্ত লৌকিক কাব্যিক স্পর্শই তার প্রধানতম সার্থকতা।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।