টিকা নেই, নেই ওষুধ, আফ্রিকা থেকে ইবোলা আসছে ভারতে?
বিশেষজ্ঞ দল ইবোলা আক্রান্ত রোগীদের উপর তিনটি সম্ভাব্য ওষুধ পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন।
করোনার কথা দেশবাসী এখনও ভোলেনি। তাই যেকোনো ভাইরাসের কথা শুনলেই এখনও আতঙ্কিত হয় সকলে। সম্প্রতি ইবোলা ভাইরাসের চর্চা চারিদিকে। আফ্রিকার বুকে নতুন করে ডানা মেলছে ইবোলা ভাইরাসের একটি মারাত্মক ও বিরল স্ট্রেইন—‘বুন্দিবুগিও’ (Bundibugyo ebolavirus)। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো (DRC) এবং প্রতিবেশী দেশ উগান্ডায় এই ভাইরাসের সংক্রমণ হু হু করে বাড়তে থাকায় বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিচার করে গত ১৭ মে (২০২৬) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই প্রাদুর্ভাবকে 'Public Health Emergency of International Concern' (PHEIC) বা আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে। কঙ্গোর ইতিহাসে এটি ১৭তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব হলেও, নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা টিকা না থাকায় এই 'বুন্দিবুগিও' স্ট্রেইনটি বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
আফ্রিকার এই গভীর সংকটের আঁচ কি এ দেশেও এসে পড়তে পারে? ভারতবাসীর কি ইবোলা নিয়ে চিন্তা করার সত্যিই কোনো কারণ আছে?
মে ২০২৬-এর পরিসংখ্যান
চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশের মংবওয়ালু, রুয়ামপাড়া ও বুনিয়ার মতো খনিপ্রধান স্বাস্থ্য অঞ্চলগুলিতে (Health Zone) প্রথম এই সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর খুব দ্রুত তা নর্থ কিভু ও সাউথ কিভু প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। কঙ্গো সীমান্ত পেরিয়ে সংক্রামিত যাত্রীদের মাধ্যমে রোগটি থাবা বসিয়েছে উগান্ডাতেও। এমনকী উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় বেশ কয়েকজনের সংক্রমণের খবর পাওয়া গিয়েছে, তাই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
মে মাসের শেষ সপ্তাহের (২৭-২৮ মে, ২০২৬) আনুমানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো (DRC): ১০০ জনের বেশি নিশ্চিতভাবে ইবোলা আক্রান্ত, ১০০০ জনের বেশি মানুষ ইবোলা সংক্রমিত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে (Suspected) এবং মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ২০০ ছাড়িয়েছে।
উগান্ডা: ৭ জন নিশ্চিত আক্রান্তের মধ্যে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মৃত্যুর হার: এই বুন্দিবুগিও স্ট্রেইনের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার অত্যন্ত আশঙ্কাজনক—প্রায় ৩০% থেকে ৫০%।
বুন্দিবুগিও ভাইরাস কী?
এটি ইবোলা ভাইরাসের 'অর্থোইবোলাভাইরাস' (Orthoebolavirus) পরিবারের একটি বিশেষ প্রজাতি। তবে এটি আফ্রিকার সবচেয়ে সাধারণ বা ভয়াবহ রূপ হিসেবে পরিচিত 'জায়ারে ইবোলা' (Zaire ebolavirus) নয়। ২০০৭-০৮ সালে উগান্ডায় প্রথমবার এই বুন্দিবুগিও ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল, যার পর ২০১২ সালে কঙ্গোতেও এটি হানা দেয়। দীর্ঘ এক দশক পর ২০২৬-এ এসে এটি আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিল।
প্রধান লক্ষণসমূহ: এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোগীর শরীরে অত্যন্ত দ্রুত ও মারাত্মক সব উপসর্গ দেখা দেয়:
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এই প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত মোট ৮টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৫-৬টি নিশ্চিত হান্টাভাইরাস সংক্রমণ। এদের মধ্যে মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ৪০%।
হঠাৎ তীব্র জ্বর, শরীর ও পেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা, এবং চরম দুর্বলতা।
অনবরত বমি ও ডায়রিয়া।
সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তপাত (যেমন নাক, মুখ বা মলদ্বার দিয়ে রক্ত ক্ষরণ)।
অঙ্গ বিকল (Organ Failure) হয়ে যাওয়ার কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) পদক্ষেপ
বুন্দিবুগিও ভাইরাসজনিত রোগ (BVD) প্রতিরোধ বা চিকিৎসার জন্য বিশেষভাবে অনুমোদিত কোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত ওষুধ বা ভ্যাকসিন এখন বাজারে নেই। এই শূন্যতা পূরণের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের ‘R&D ব্লুপ্রিন্ট টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ’ এবং টিকাদান সংক্রান্ত প্রধান উপদেষ্টা দল (SAGE)-এর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছে। মাঠপর্যায়ে গবেষণার জন্য তারা কয়েকটি সম্ভাব্য ওষুধ ও ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল (পরীক্ষামূলক প্রয়োগ) দ্রুত শুরু করার সুপারিশ করেছে।
পশ্চিম আফ্রিকায় দ্রুত ছড়াচ্ছে ইবোলা
১. আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার পথ (Therapeutics):
বিশেষজ্ঞ দল ইবোলা আক্রান্ত রোগীদের উপর তিনটি সম্ভাব্য ওষুধ পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন:
MBP134 ও Maftivimab®: এগুলি হলো ল্যাবরেটরিতে তৈরি বিশেষ 'মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি', যা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে।
Remdesivir (রেমেডিসিভির): এটি একটি পরিচিত অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ।
বিজ্ঞানীদের মতে, একটি মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি এবং রেমেডিসিভির একসঙ্গে মিশিয়ে 'কম্বিনেশন থেরাপি' দিলে তা আরও বেশি কার্যকর হতে পারে, যা ট্রায়ালে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
২. সংস্পর্শে আসাদের রোগ ঠেকানো (Prevention):
আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে যারা এসেছেন, তাদের সংক্রমণ রুখতে 'ওবেলডেসিভির' (Obeldesivir) নামের একটি অ্যান্টিভাইরাল ট্যাবলেটকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করছে নিখুঁত 'কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং'-এর উপর, যা কঙ্গোর যুদ্ধবিধ্বস্ত বা অশান্ত এলাকাগুলিতে বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সম্প্রতি 'হান্টাভাইরাস' নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা খবরে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য আমাদের চোখে পড়ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে একটি ক্রুজ জাহাজে এই ভাইরাসের সংক্রমণের ঘটনা অনেককে ফের আতঙ্কিত করে তুলছে। সকলেই মনেই প্রশ্ন উঠছে, এই ভাইরাসটি আসলে কী? এটি কি কোভিডের মতো আরেকটি মহামারির রূপ ধারণ করতে চলেছে?
৩. ভ্যাকসিনের খোঁজ ও সম্ভাবনা:
rVSV Bundibugyo ভ্যাকসিন: 'ইন্টারন্যাশনাল এইডস ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভ' (IAVI) দ্বারা তৈরি এই এক ডোজের (Single-dose) টিকাটি সবচেয়ে আশাপ্রদ। তবে মানুষের উপর ট্রায়াল শুরু করার মতো পর্যায়ে আসতে এর আরও ৭ থেকে ৯ মাস সময় লাগবে।
ChAdOx1 Bundibugyo ভ্যাকসিন: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট (SII) যৌথভাবে এটি তৈরি করছে। আগামী ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যেই এটি ট্রায়ালের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। এর এক ডোজের পদ্ধতি সাধারণ কন্ট্যাক্টদের জন্য এবং দুই ডোজের পদ্ধতি চরম ঝুঁকিতে থাকা সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীদের দেওয়া হতে পারে।
বিদ্যমান ভ্যাকসিনের ভূমিকা: বাজারে ইবোলার একমাত্র অনুমোদিত ভ্যাকসিন 'এরভেবো' (Ervebo) মূলত জায়ারে স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে কাজ করে। বুন্দিবুগিও-র বিরুদ্ধে এর ক্রস-প্রোটেকশন বা সুরক্ষা ক্ষমতা একেবারেই স্পষ্ট নয়। তাই WHO স্পষ্ট জানিয়েছে, সুনির্দিষ্ট গবেষণা ছাড়া এটি ব্যবহার করা যাবে না।
বর্তমান প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও মাঠপর্যায়ের চ্যালেঞ্জ
টিকা বা ওষুধ না পাওয়া পর্যন্ত ইবোলা দমনে গত কয়েক দশকের চেনা হাতিয়ারগুলিকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে নিবিড় নজরদারি, দ্রুত ল্যাব টেস্ট ও রোগ নির্ণয়, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং, আক্রান্তদের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা, সামাজিক সচেতনতা এবং মৃতদেহের নিরাপদ-সম্মানজনক সৎকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঙ্গো ও উগান্ডা সীমান্ত আপাতত ৪ সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাশাপাশি আফ্রিকা সিডিসি (Africa CDC) ও 'মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স' (MSF)-এর মতো সংস্থাগুলি কাজ করছে। তবে দুর্গম খনি এলাকা ও স্থানীয় সশস্ত্র সংঘাতের কারণে মাঠপর্যায়ে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
পশ্চিমবঙ্গের আতঙ্কের কি কোনো কারণ আছে?
একেবারেই নয়। ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গে ইবোলা ভাইরাসের কোনো সংক্রমণ নেই। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
সারা দেশে এখন পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত ইবোলা আক্রান্তের খবর পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি বেঙ্গালুরুতে উগান্ডা ফেরত এক নারীর শরীরে সন্দেহভাজন উপসর্গ দেখা দেওয়ায় তাঁকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছিল, তবে পুনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি (NIV)-তে তাঁর টেস্ট রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে।
কেন ভারতে ঝুঁকি কম?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের মতে, আফ্রিকার বাইরে ইবোলার ঝুঁকি অত্যন্ত কম। ইবোলা কোনো বায়ুবাহিত (Airborne) রোগ নয়। করোনা বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো এটি বাতাসে ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল (যেমন রক্ত, লালা, বমি, মল বা ডায়রিয়া) এর সরাসরি সংস্পর্শে না এলে এই রোগ ছড়ায় না। সাধারণ সামাজিক দূরত্বের যোগাযোগে এই ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ নেই। তাছাড়া আফ্রিকা থেকে ভারতে সরাসরি বিমান চলাচল খুবই সীমিত।
সরকারি প্রস্তুতি
কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই ও বেঙ্গালুরুসহ দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলিতে থার্মাল স্ক্রিনিং ও ট্রাভেল হিস্ট্রি পরীক্ষা জোরদার করা হয়েছে। কঙ্গো, উগান্ডা বা দক্ষিণ সুদান থেকে আসা যাত্রীদের উপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। রাজ্যগুলিকে আইসোলেশন ওয়ার্ড, পিপিই কিট এবং ল্যাব প্রস্তুতি বাড়াতে বলা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য জরুরি পরামর্শ ও সতর্কতা
যেহেতু এই ভাইরাসের কোনো অনুমোদিত টিকা ভারতে বা বিশ্বে এখনও সাধারণের জন্য উপলব্ধ নয়, তাই সতর্কতাই একমাত্র পথ:
কঙ্গো বা উগান্ডার মতো উপদ্রুত আফ্রিকান দেশগুলিতে এই মুহূর্তে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলুন।
বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস থাকলে এবং দেশে ফেরার পর জ্বর, তীব্র গা-ব্যথা বা বমির মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং আপনার ট্রাভেল হিস্ট্রি স্পষ্টভাবে জানান।
সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ভুয়ো খবরে কান দেবেন না বা আতঙ্ক ছড়াবেন না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬-এর মূল ভাবনা হলো "Together for health. Stand with science" (স্বাস্থ্যের জন্য একসঙ্গে, বিজ্ঞানের পাশে)। বিজ্ঞান ও সঠিক সচেতনতাই পারে যেকোনো মহামারি রুখতে।






