আন্টার্কটিকার ক্রুজে যেভাবে হানা দিল হান্টাভাইরাস
এই প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত মোট ৮টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৫-৬টি নিশ্চিত হান্টাভাইরাস সংক্রমণ। এদের মধ্যে মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ৪০%।
১ এপ্রিল ২০২৬, আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে যাত্রা শুরু করেছিল ‘এমভি হন্ডিয়াস’। লক্ষ্য ছিল অ্যান্টার্কটিকা, ফকল্যান্ড এবং সাউথ জর্জিয়ার মতো দুর্গম ও সুন্দর দ্বীপগুলি ভ্রমণ করা। জাহাজটিতে ২৩টি দেশের প্রায় ১৪৭-১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন। কিন্তু যাত্রার কিছুদিনের মধ্যেই রহস্যময় এক জ্বরের প্রকোপ শুরু হয়।
এই প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত মোট ৮টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৫-৬টি নিশ্চিত হান্টাভাইরাস সংক্রমণ। এদের মধ্যে মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ৪০%। তিনজনের মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে, প্রথম জন ৬৯ বছর বয়সি ডাচ অর্নিথোলজিস্ট লিও শিলপেরোর্ড। ১১ এপ্রিল তিনি জাহাজে মারা যান। লিওর স্ত্রী, যিনি সেন্ট হেলেনায় নেমে জোহানেসবার্গে পৌঁছনোর পর মারা যান। এবং ২ মে জাহাজে একজন জার্মান নারী পর্যটকের মৃত্যু হয়।
কেন এই হান্টাভাইরাস আলাদা?
সাধারণত হান্টাভাইরাস ইঁদুর থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। কিন্তু এমভি হন্ডিয়াসে যে স্ট্রেনটি পাওয়া গিয়েছে, তা হলো আন্ডেস ভাইরাস (Andes Virus)। দক্ষিণ আমেরিকার এই বিশেষ স্ট্রেনটির একটি ভয়াবহ বৈশিষ্ট্য রয়েছে—এটি সীমিত পরিসরে মানুষ থেকে মানুষে (Human-to-Human) ছড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উশুয়াইয়ার কোনো ইঁদুর-সমৃদ্ধ এলাকায় ভ্রমণের সময় প্রথম সংক্রমণ ঘটে এবং পরবর্তীতে জাহাজের দীর্ঘ ও ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের কারণে তা সীমিতভাবে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
হান্টাভাইরাসের লক্ষণ ও পর্যায়সমূহ
সংক্রমণের ১ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিতে পারে। মূলত দুটি রূপে দেখা দেয়:
১. পালমোনারি সিনড্রোম (HPS): যা ফুসফুসকে আক্রান্ত করে।
২. হেমোরেজিক ফিভার (HFRS): যা কিডনি ফেলিওরের কারণ হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সম্প্রতি 'হান্টাভাইরাস' নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা খবরে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য আমাদের চোখে পড়ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে একটি ক্রুজ জাহাজে এই ভাইরাসের সংক্রমণের ঘটনা অনেককে ফের আতঙ্কিত করে তুলছে। সকলেই মনেই প্রশ্ন উঠছে, এই ভাইরাসটি আসলে কী? এটি কি কোভিডের মতো আরেকটি মহামারির রূপ ধারণ করতে চলেছে?
প্রাথমিক সংকেত (১-৫ দিন):
তীব্র জ্বর (১০২°F-এর বেশি) এবং মাথা ধরা।
পিঠ, কোমর ও উরুর পেশিতে তীব্র ব্যথা।
বমি বমি ভাব, পেটে ব্যথা এবং ক্লান্তি।
প্রাথমিক লক্ষণের ৪-১০ দিন পর হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ফুসফুসে জল জমা এবং হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার ফলে রোগীর অবস্থা দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
হান্টাভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন নেই। এর একমাত্র চিকিৎসা হলো সাপোর্টিভ কেয়ার। হাসপাতালে এর চিকিৎসা হিসেবে রয়েছে অক্সিজেন থেরাপি, ভেন্টিলেশন এবং প্রয়োজনে ডায়ালাইসিস। লক্ষণ দেখা দেওয়ার প্রথম ৪-৫ দিনের মধ্যে চিকিৎসা শুরু করলে ৮০ শতাংশের বেশি রোগীকে বাঁচানো সম্ভব।
প্রতিরোধের উপায়: ইঁদুরের বংশবৃদ্ধি রোধ করা। ঘর বা গুদাম পরিষ্কারের সময় N-95 মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করা। ব্লিচিং পাউডার মিশ্রিত জল দিয়ে সম্ভাব্য দূষিত এলাকা পরিষ্কার করা।
ভারতবাসীর কি ভয় পাওয়ার কারণ আছে?
এমভি হন্ডিয়াসের ঘটনায় ভারতের জনমনে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কারণ ওই জাহাজে ২ জন ভারতীয় যাত্রীও ছিলেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয়দের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
কেন ঝুঁকি কম?
১. সীমিত বিস্তার: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, এটি কোনো মহামারি নয়। মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত এবং এটি কোভিডের মতো বায়ুবাহিত নয়। ফলে, দ্রুত ছড়ায় না।
২. সরকারি তৎপরতা: ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, NCDC এবং IDSP ইতিমধ্যেই নজরদারি বাড়িয়েছে। ক্রুজ পোর্টগুলিতে স্ক্রিনিং জোরদার করা হয়েছে।
৩. ভৌগোলিক অবস্থান: হান্টাভাইরাসের এই ‘অ্যান্ডেস স্ট্রেন’ মূলত দক্ষিণ আমেরিকায় দেখা যায়। ভারতে এর স্থানীয় সংক্রমণের কোনো নজির এখনও পাওয়া যায়নি।
প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মেশার সময় আমাদের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন থাকা যে কতটা জরুরি সেই বিষয়েই এমভি হন্ডিয়াসের ঘটনা আমাদের সতর্ক করে দেয়। বিশেষ করে যারা প্রমোদতরি বা ক্রুজ ট্যুরিজমে আগ্রহী, তাদের জন্য ইঁদুর থাকবে না এরকম পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত আবশ্যক।
যদি সম্প্রতি এমন কোনো এলাকা ভ্রমণের ইতিহাস থাকে যেখানে ইঁদুরের উপদ্রব বেশি এবং ফ্লু-র মতো লক্ষণ অনুভব করেন, তবে দেরি না করে সত্বর চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ, সচেতনতাই জীবন রক্ষার প্রধান চাবিকাঠি।






