হান্টাভাইরাস: আবার মহামারি? কতটা বিপজ্জনক?

সম্প্রতি 'হান্টাভাইরাস' নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা খবরে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য আমাদের চোখে পড়ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে একটি ক্রুজ জাহাজে এই ভাইরাসের সংক্রমণের ঘটনা অনেককে ফের আতঙ্কিত করে তুলছে। সকলেই মনেই প্রশ্ন উঠছে, এই ভাইরাসটি আসলে কী? এটি কি কোভিডের মতো আরেকটি মহামারির রূপ ধারণ করতে চলেছে?

inscript
৩ মিনিট
হান্টাভাইরাস: আবার মহামারি? কতটা বিপজ্জনক?

২০১৯ সালের মার্চ থেকে প্রায় দুই মাস দেশবাসী ঘরবন্দি। সকলেই আতঙ্কিত, পাছে বাড়ির কেউ 'কোভিড-১৯' নামক ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়ে! বাড়িতে ছোট বাচ্চা রয়েছে, বয়স্করা রয়েছেন। তাদের উপর কোপ পড়লে তো আর রক্ষে নেই! তাই দোকানে মাস্ক, স্যানিটাইজারের বহর। সেই ভয়াবহ স্মৃতি আমরা এখনও ভুলিনি। তাই যখনই নতুন কোনো ভাইরাসের খবর আসে, আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে— "আবার কি কোনো মহামারি আসছে?" এখন আবার নতুন এক ভাইরাসের নাম খুব কানে আসছে, 'হান্টাভাইরাস'। মে ২০২৬-এ একটি ক্রুজ জাহাজে কয়েকজনের আক্রান্ত হওয়ার খবর থেকেই এই আলোচনার সূত্রপাত মূলত।

হান্টাভাইরাস আসলে নতুন কোনো শত্রু নয়, এটি বহু বছর ধরেই পৃথিবীতে আছে। কোভিডের সঙ্গে এর কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এটি যেমন ভয়ংকর, তেমনই আবার এর ছড়ানোর ধরনটাও একটু ভিন্ন।

সম্প্রতি 'হান্টাভাইরাস' নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা খবরে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য আমাদের চোখে পড়ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে একটি ক্রুজ জাহাজে এই ভাইরাসের সংক্রমণের ঘটনা অনেককে ফের আতঙ্কিত করে তুলছে। সকলেই মনেই প্রশ্ন উঠছে, এই ভাইরাসটি আসলে কী? এটি কি কোভিডের মতো আরেকটি মহামারির রূপ ধারণ করতে চলেছে?

হান্টাভাইরাস কী এবং কীভাবে ছড়ায়?

হান্টাভাইরাস নতুন কোনো ভাইরাস নয়। এটি একদল ভাইরাসের সমষ্টি যা মূলত ইঁদুর বা এই জাতীয় প্রাণীদের মাধ্যমে ছড়ায়।

  • কীভাবে ছড়ায়: ইঁদুরের মল, প্রস্রাব বা লালা শুকিয়ে যখন ধুলোবালি বা বাতাসের সঙ্গে মিশে যায়, আর সেই বাতাস যখন আমরা নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করি, তখন এই ভাইরাস শরীরে ঢোকে।

  • মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ: এটি কোভিডের মতো হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসে সহজে ছড়ায় না। তবে 'আন্দিজ ভাইরাস' (Andes virus) নামক একটি নির্দিষ্ট স্ট্রেইন খুব ঘনিষ্ঠ মেলামেশার মাধ্যমে (যেমন একই ঘরে থাকা বা শারীরিক সংস্পর্শ) একজনের থেকে অন্যজনে ছড়াতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের জন্য এই ঝুঁকি খুবই কম।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হাম সংকটে বাংলাদেশ: সতর্কতা জারি WHO-এর

Bangladesh: বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার। হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত, প্রতিদিন বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা, টিকা সংকট ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতায় কি পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা কি যথেষ্ট, নাকি আরও বড় পদক্ষেপ প্রয়োজন? এই সংকট থেকে বের হওয়ার উপায় কী হতে পারে?

লক্ষণ কী কী?

এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর লক্ষণ দেখা দিতে ১ থেকে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। শুরুর দিকে সাধারণ ফ্লু বা জ্বরের মতো মনে হয়। প্রচণ্ড জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, বমি ভাব এবং ক্লান্তি দেখা দেয়। প্রকোপ বাড়তে থাকলে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং ফুসফুসে জল জমে যেতে পারে, একে বলা হয় HPS। আবার কিছু ক্ষেত্রে কিডনির সমস্যা বা রক্তক্ষরণও হতে পারে, একে বলা হয় HFRS।

সাম্প্রতিক সেই জাহাজকাণ্ড (মে ২০২৬)

২০২৬ সালের মে মাসে 'MV Hondius' নামক একটি ক্রুজ জাহাজে এই ভাইরাসের একটি ছোট প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা শুরু করা একটি জাহাজে ৮ জন আক্রান্ত হন এবং ৩ জন মারা যান। এটি ছিল মূলত 'আন্দিজ ভাইরাস'। যেহেতু এই ভাইরাসটি ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে ছড়াতে পারে, তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তবে জাহাজের বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যে এটি ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

আর্জেন্টিনার হান্টা আক্রান্ত জাহাজ

কোভিড বনাম হান্টাভাইরাস: কোনটি বেশি বিপদজনক?

পরিসংখ্যান দেখলে হান্টাভাইরাসকে বেশ ভয়ংকর মনে হতে পারে। কারণ কোভিডে মৃত্যুহার ছিল ১-৩%, কিন্তু কয়েক ধরনের হান্টাভাইরাসের মৃত্যুহার ৩৫% থেকে ৫০% পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ, আক্রান্ত হলে জীবনহানির ঝুঁকি অনেক বেশি। কিন্তু হান্টাভাইরাস কোভিডের মতো সংক্রামক নয়। কোভিড খুব দ্রুত একজন থেকে হাজার জনে ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু হান্টাভাইরাস কেবল ইঁদুরের সংস্পর্শে বা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মেলামেশা ছাড়া ছড়ায় না। তাই এর প্রভাবে কোভিডের মতো বিশ্বব্যাপী মহামারি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন কীভাবে?

যেহেতু এই ভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট টিকা বা ওষুধ নেই, তাই সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।

  • ঘরবাড়ি এবং আশেপাশে ইঁদুরের উপদ্রব কমান।

  • ইঁদুর থাকতে পারে এমন নোংরা ঘর বা স্টোর রুম পরিষ্কার করার সময় সরাসরি হাত দেবেন না। প্রয়োজনে মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করুন।

  • ইঁদুরের বিষ্ঠা বা প্রস্রাব আছে এমন জায়গায় ঝাড়ু দেওয়ার বদলে ব্লিচিং পাউডার বা জীবাণুনাশক মিশিয়ে জল ব্যবহার করুন, যাতে ধুলো না ওড়ে।

ভারত বা বাংলাদেশের মানুষের জন্য বর্তমানে হান্টাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমাদের অঞ্চলে এর প্রকোপ নেই বললেই চলে। তবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং ইঁদুর থেকে দূরে থাকা সব সময়ের জন্যই একটি ভালো অভ্যাস। কারণ- Prevention is always better than cure.

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।