ফুড ডেলিভারি অ্যাপের ধাক্কায় হারিয়ে যাবে অনাদি কেবিন বা গদার কচুরি?

ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছে সেই সব কেবিন। একবার ঢুঁ মারবেন নাকি? এখনও সস্তায় পেয়ে যেতে পারেন চপ-কাটলেট। তাহলে চলুন-

tiasa gupta
৪ মিনিট
ফুড ডেলিভারি অ্যাপের ধাক্কায় হারিয়ে যাবে অনাদি কেবিন বা গদার কচুরি?

রাস্তার কত সস্তা হোটেলে এই শহরের বুকে কত কেবিনে একলা বসে লাল-নীল স্বপ্নের জাল বুনেছেন প্রেমিক প্রেমিকারা। শত প্রেমের আখ্যান যেমন লেখা আছে এই শহরের বহু পুরনো রেস্টুরেন্টের বদ্ধ কেবিনগুলোতে, তেমনই লেখা আছে বিপ্লবের ইতিহাসও। কলকাতার অনেক পুরনো রেস্টুরেন্ট, কেবিন ইতিহাসের পাতার অংশ হয়ে আছে আজও। আবার এদের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে স্বাধীনতা আন্দোলনের নানা প্রবাহ। জড়িয়ে আছে সত্তরের উত্তাল সময়…।

বিপ্লবের আর এক নাম কালবেলা, থুড়ি মাধবীলতা। কালবেলার রূপে সমরেশ মজুমদার উপস্থাপন করেছেন বিপ্লব ও প্রেমের সমন্বিত এক উপন্যাস। লাইব্রেরি, বসন্ত কেবিন, কফি হাউস- সর্বত্র তাদের দেখা যেত একসঙ্গে। এখানে এক কেবিনেই লেখা হয়েছিল রুদ্ধশ্বাস কত অপেক্ষার গল্প। মাধবীলতা চিনছিল অনিমেষের শেকড়টাকে, মেলতে দিচ্ছিল তার ডালপালাগুলোকেও। তারপর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে প্রেমের আখ্যান। এটা একটা উপমামাত্র। কলকাতার বুকে কত কেবিনে বসে বিপ্লবীরা পালানোর ছক কষেছেন।

বিধান সরণি দিয়ে গেলেই চোখে পড়বে কিছু চেনা নাম। বসন্ত কেবিন, ফেভারিট কেবিন, দিলখুসা। চিকেন কাটলেট, কবিরাজি - সহ বিভিন্ন আইটেমের জন্য আজও বাঙালির অন্যতম প্রিয় ডেস্টিনেশন। প্রতিটারই বয়স ১০০ ছাড়িয়েছে। ভেতরের আসবাবগুলোয় এখনও লেগে আছে ইতিহাস। ছোট্ট ছোট্ট কাঠের কিউবিকল, সঙ্গে সস্তায় নানা খাবার—এই হল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সেই তখন থেকে পারিবারিকভাবে চালু হয়ে আসছে কেবিনগুলো। আর এই সবগুলোর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে সংস্কৃতি, সংগ্রামের ঘটনা।

যেমন বসন্ত কেবিন। ১৩০ বছর পেরনো এই দোকানটি একদা বিখ্যাত হয়েছিল শিল্পী গণেশ পাইনের জন্য। অবশ্য তার আগে থেকেই ইতিহাসের সাক্ষী থেকেছে এই কেবিন। বিপ্লবীদের গোপন ডেরার মধ্যে এটি ছিল অন্যতম। নকশাল আমলেও এই প্রসঙ্গ উঠে এসেছে বারবার। বিভিন্ন সিনেমাতেও ছুঁয়ে গেছে বসন্ত কেবিনের নাম। কেবিনগুলোয় গোপন বৈঠক, সেইসঙ্গে সস্তার ভালো খাবার; এমনটাই ছিল ট্রেডমার্ক। এরকম আরও অনেক কেবিনেই বসত বিপ্লবীদের গোপন বৈঠক। ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছে সেই সব কেবিন। একবার ঢুঁ মারবেন নাকি? এখনও সস্তায় পেয়ে যেতে পারেন চপ-কাটলেট। তাহলে চলুন-

ক্যাফে

শহরের ব্যস্ততম এবং কোলাহলপূর্ণ মোড়ে অবস্থিত, ক্যাফে নামের পুরনো এই কেবিন রেস্টুরেন্টটি অতীতের কলকাতার কথা মনে পড়িয়ে দেয়। ভবানীপুরে আশুতোষ কলেজের বিপরীতেই লম্বা লোহার গ্রিলের জানলা এবং কাঠের চেয়ার দিয়ে সাদামাঠা ভাবে সাজানো এই জায়গায় সুস্বাদু মাছ বা চিকেন কবিরাজি থেকে শুরু করে মাটন চপ পর্যন্ত সবই মিলবে। গত ৮০ বছর ধরে এটি চলছে। যদিও বর্তমান মালিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। কিন্তু বিশ্বস্ত কর্মী এবং গ্রাহকদের যত্নের জন্য ক্যাফে আজও সফল। এখানে কবি দীনেশ দাস, লেখক মহাশ্বেতা দেবীরা সময় কাটিয়ে গিয়েছেন।

অ্যালেন কিচেন

এর বয়স দীর্ঘ ১২৫ বছর। বলা হয় ভিনদেশি অ্যালেন সাহেব দেশ ছাড়ার আগে তাঁর বাঙালি বন্ধুকে এটি উপহার দিয়েছেন! কলকাতার অন্যতম নামকরা রেস্টুরেন্ট এটি। অ্যালেন কিচেনের বিখ্যাত চিংড়ির কাটলেট স্বাদে অনন্য। খাঁটি ঘি দিয়ে তৈরি চপ-কাটলেট এখানকার বিশেষত্ব।

অনাদি কেবিন

অনাদির মোগলাই পরোটার খ্যাতি দেশে-বিদেশে আজ ছড়িয়ে গিয়েছে। সারা কলকাতার মানুষ তাঁদের প্রাক-দুর্গাপূজার কেনাকাটার পর অনাদির কেবিনে ভোজ সেরে ফেরার পথ ধরেন এখনও। অনেক দিনের পুরনো রেস্টুরেন্ট হলেও এই কেবিনটি হাঁসের ডিমের মোগলাই পরোটা অনাদির সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ, তবে পরোটার সঙ্গে এখানকার আলুর তরকারিও স্বাদে গন্ধে বেশ জনপ্রিয়।

দিলখুশা কেবিন

দিলখুশা, আক্ষরিক অর্থে যা আপনার হৃদয়কে খুশি করে, কলেজ স্ট্রিটের একটি শতাব্দী প্রাচীন কেবিন ক্যাফে।

মেনু কার্ডে পুরনো খাবারের জায়গায় কিছু কিছু চাইনিজ খাবার জায়গা করে নিলেও ঐতিহ্যবাহী চিকেন কবিরাজি বা মাছের কাটলেট এখনও কলকাতার মানুষকে বারবার এখানে টেনে আনে। কলেজ স্ট্রিটে অবস্থিত এই দিলখুশা কেবিনে এক সময় বাংলার বহু কিংবদন্তী মানুষ রসনাতৃপ্তি ঘটিয়েছেন। সেই ঐতিহ্য এত বছর পরও অক্ষুণ্ণ।

দাস কেবিন

গড়িয়াহাটে অবস্থিত দাস কেবিনের ফিশ ফ্রাইয়ের খ্যাতি এখনও কলকাতার মানুষের মুখে নিয়মিত শোনা যায়। ফলে ছোট জায়গা হলেও এই রেস্টুরেন্ট কখনও খালি থাকে না। পকেটে শ’দুয়েক টাকা নিয়ে গেলেই পেট ভরে চপ-কাটলেট খেয়ে মনও ভরিয়ে আসতে পারেন আপনিও।

কলকাতায় বাইরে থেকে কাতারে কাতারে ছেলে মেয়ে এই শহরে পড়তে আসে। ফলে তাদের বাইরে তো খেতেই হবে৷ আর সবার পক্ষে অনলাইনে খাওয়াদাওয়া যে সম্ভব হয় না, তা বলাই বাহুল্য। তাহলে উপায়

কী? আসুন-

ধীরেন কেবিন

শোভাবাজারের এই দোকানটি বহু পুরানো এবং পকেট ফ্রেন্ডলি৷ চিকেন কাটলেট হোক বা ফিশ ফ্রাই, মোগলাই হোক কিংবা স্যুপ প্রত্যেকটিই অসাধারণ খেতে৷ কম দামে সেরে ফেলতে পারেন আজকের মিলটা৷ উত্তর কলকাতার একটা আলাদা ফ্লেভার পাবেন অ্যাম্বিয়েন্সে৷

গদার কচুরি

হাতিবাগান ও খান্নার কানেক্টরে অবস্থিত এই দোকানের কচুরি দারুন খেতে৷ পথচলতি যাকে জিজ্ঞাসা করবেন সেই দেখিয়ে দেবে কোথায় দোকানটি৷

ভোজনরসিক বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির একটা লম্বা ইতিহাস আছে। ঠাকুরবাড়ির রান্না এবং খাওয়ার বহর নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সব মুখোরোচক আলোচনা হয়েছে। রাস্তার যত সস্তা কেবিনে জিভে জল আনা খাবারের খবর কোন বাঙালি রাখেন না! করোনা আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে সব সংস্কৃতিতে যেমন পরিবর্তন এনেছে, তেমনই খাবারের ধরন ধারনে এসেছে বদল। ঘরে সেঁধিয়েছে অনলাইন ডেলিভারি অ্যাপ। যার দৌলতে চাইনিজ, থাই, ইটালিয়ান, এমনকী বাঙালিও নাগালে! ভাবুন তো বাঙালিকে বাংলা রান্নার স্বাদ পেতে হবে অ্যাপের সৌজন্যে, বাঙালি রেস্টুরেন্ট থেকে। চকমপ্রদ হলেও এটাই সত্যি! তাহলে কি বাঙালির রসনার নাগাল থেকে হারিয়ে যাবে দাস কেবিন, আনাদি কেবিন কিংবা গদার কচুরি? ইতিহাস বসন্ত কেবিনের ঐতিহ্য বহন করুক, তাতে দোষ কী! কিন্তু ইতিহাসের সঙ্গে আমরা কি হাত ধরাধরি করে চলতে পারি না?

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।