একুশে বইমেলার কান্ডারী চিত্তরঞ্জন, ফিরে দেখা এক বিস্মৃত অধ্যায়

Debabrata Mondal
৩ মিনিট
একুশে বইমেলার কান্ডারী চিত্তরঞ্জন, ফিরে দেখা এক বিস্মৃত অধ্যায়

বারো মাসে তেরো পার্বণ বাঙালির। একটু ভুল বলা হলো, বারো মাসে তেরো নয় আরো একটা বেশি পার্বণ বাঙালির। বৈশাখের শুরুর দিনে সোদা মাটির গন্ধের সঙ্গে যে পার্বণের শুরু তার শেষ এই বইমেলার মধ্য দিয়ে। শীতের মিঠে কড়া রোদ্দুর অথবা শেষ বিকেলের হিমেল হাওয়াকে সঙ্গে নিয়ে বইমেলা যেন বাংলা ও বাঙালিকে দিয়ে যায় একঝলক মুক্তির বিশ্বাস। বইমেলার হাত ধরে যুক্তিবাদী মন হয়ে ওঠে আরো চিন্তাশীল। নতুন বা পুরাতন বইয়ের তত্ত্বতালাশ নিয়ে নতুন আঙ্গিকে হাজির হয় পুস্তকমেলা। অবশ্য শুধুমাত্র বাঙালি বললে ভুল বলা হবে- বইমেলার গল্প তো এখন ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। কলকাতার পুস্তকমেলা এখন আন্তর্জাতিক। ফলে বইমেলার কয়েকটা দিন মেলা চত্বর যেন হয়ে ওঠে সব দেশের সব ধর্মের মিলনক্ষেত্র, ভিড় জমে আট থেকে আশি সমস্ত বইপ্রেমী মানুষদের।

ফ্রাঙ্কফুর্ট । আলফা ওয়ার্ল্ড সিটির অন্যতম একটি শহর। ফ্রাঙ্কফুর্ট বিখ্যাত মূলত তিনটি কারণে। কি সেই কারণ?-বানিজ্য,বারবনিতা এবং বইমেলা। হ্যাঁ, বিশ্ব বইমেলা অনু্ঠিত হয় এই ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরেই। ছবির মত সুন্দর এই ফ্রাঙ্কফুর্ট শহর। মাইন নদী যেন সর্বক্ষণ আলতো চুম্বন করে চলেছে ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের তটে। না শুধু সুন্দরী নয়, ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের মুকুটে যোগ হয়েছে আরো এক নতুন পালক। কি সেই নতুন গৌরব? হ্যাঁ ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরকে বলা হয় মেলার শহর। ইন্টারন্যাশনাল মোটর শো থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট ট্রেড ফেয়ার সমস্ত কিছুর মূল কর্ণধার এই ফ্রাঙ্কফুর্ট।

সালটা ১৯৪৭। ব্রিটিশ শাসকের দর্পচূর্ণ করলো ভারত, বহুকাঙ্খিত স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করলো আপামর ভারতবাসী। তবে এই স্বাধীনতা লাভের মধ্যে দিয়েই ভাগ হয়ে গেল একটি দেশ। কাঁটাতারের বেড়া দূরে ঠেলে ছিল একসময়ের প্রিয়জনকে। তৈরী হলো ভারত ও পাকিস্তান নামে দুইটি আলাদা রাষ্ট্র। একসময়ের হরিহর আত্মা হয়ে উঠল পরস্পরের শত্রু। এরপর থেকেই কাঁটাতারের দোরগোড়ায় শোনা যেতে লাগল যুদ্ধের ঢক্কানিনাদ,অস্ত্রের ঝনঝনানিতে কেঁপে উঠল সীমান্তের মানুষগুলো। গুলি - বোমা - মৃত্যু দেখতে দেখতে বেড়ে উঠতে লাগল শৈশব।

দেশভাগের সময় বাংলার পূর্ব অংশ অন্তর্ভুক্ত হল পাকিস্তানের সঙ্গে। আর এতেই হল হিতে বিপরীত। জীবনযাত্রা থেকে সংস্কৃতি সবেতেই বাংলার পূর্বাংশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ছিল আকাশ - পাতাল পার্থক্য। এমনকী একসময় এই অঞ্চলের মানুষদের অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত করা শুরু হলো। এরপর ১৯৭০সালে সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামি লীগের জয়লাভ বাংলার পূর্বাংশের মানুষকে খুশি করতে পারেনি। ক্ষোভের আগুন জমা হচ্ছিল। ধীরে ধীরে সেই আগুনেই নতুন ঘৃতাহুতি করল ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৫ শে মার্চের গণহত্যা 'অপারেশন সার্চলাইট ' বাংলাদেশ গঠনের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করল। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ নামে এক চোয়াল চাপা লড়াই। ২৬শ মার্চ মুজিবর রহমান ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার। অবশেষে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর সহায়তায় স্বাধীনতা লাভ করল বাংলাদেশ।

রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বর্ষপূর্তিতে সোনার বাংলার বুকে শুরু হল একুশের বইমেলা। ভাঙাচোরা বাংলাদেশের বুকে যেন ডাক শোনা গেল নতুনের যার কান্ডারী হল একুশের বইমেলা। উত্তপ্ত যৌবন তখন কিছুটা শান্ত, ফিকে হয়ে এসেছে বাংলাদেশের বুকে বারুদের গন্ধও। তৎকালীন সময়ে একুশের বইমেলার হাত ধরেই যেন শুরু হল স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার কাজ, যার পুরোভাগে ছিল চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৭২ সাল নাগাদ বর্ধমান হাউসের সামনে ৩২ টি বই নিয়ে বইমেলার সূচনা করেন চিত্তরঞ্জন। এমনকি এই চিত্তরঞ্জন সাহা যোগ দিয়েছেন ফ্রাঙ্কফুর্ট এর বইমেলাতেও। ১৯৭২-৭৬ সাল পর্যন্ত চিত্তরঞ্জন সাহা বইমেলা আয়োজনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ১৯৭৮ সাল থেকে বইমেলা আয়োজনের দায়িত্ব গ্রহণ করল বাংলা। চিত্তরঞ্জন। না, চিত্তরঞ্জনের গল্প এখানেই শেষ নয়। বইমেলার পাশাপাশি ' মুক্তধারা ' নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা তৈরি করেন চিত্তরঞ্জন।

বইমেলাকে কেন্দ্র করে জানা অজানা গল্প ভিড় জমায় বইমেলার আনাচে-কানাচে। আনকোরা বইয়ের ডালি সাজিয়ে প্রতিবারই যেমন হাজির থাকেন দেশ-বিদেশের প্রকাশক তেমনি নতুন বইয়ের গন্ধ নিতে দেশের আনাচে-কানাচে থেকে বইমেলায় ছোটেন পাঠকরা, ব্যতিক্রম নন বিদেশের বইপ্রেমীরাও। সোনার বাংলার বুকে অনুষ্ঠিত এই বইমেলার আরেক গর্বের বিষয় বৈকি!

লিখেছেন
Debabrata Mondal
Debabrata Mondal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।